কিছু দিন আগে বিভিন্ন অভিযোগে আটক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা মুক্তি পেলেন জেল থেকে। এতে সকল ছাত্র-শিক্ষক স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরা আরো একটি অনাকাংখিত জটিলতা এবং জীবন থেকে হারিয়ে যাওয়ার আশংকাজনক আরো কয়েকটি মাস ফিরে পেলেন। কারা মুক্ত ছাত্র-শিক্ষকরা বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাদের বিজয়ের কথা জানিয়ে। শহীদ মিনারের বেদীতে দাড়িয়ে শপথ নিয়েছেন যেকোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাবেন বলে। আমরা সাধারণ মানুষ তাদের কথায় আশান্বিত হয়েছি। আমাদের শিক্ষকরা হলেন জাতির বিবেক। তারা যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাদের এ ধরণের আপোষহীণ মনোভাব দেখান, তবে আমরা আশান্বিত হই। এই ব্লগেও কিছু শিক্ষক এবং প্রতিবাদী ছত্র-ছাত্রী আছে বলে আমার বিশ্বাস। না থাকলেও অসুবিধা নেই। সাধারণ ব্লগারদের মাধ্যমে আমার কথাগুলো সংশ্লিষ্টদের কাছে পৌছে যাবে বলে আমি আশা করি।
এবার আসি মূল কথায়। সদ্য কারামুক্ত ছাত্র-শিক্ষক এবং সকল প্রতিবাদী ছাত্র-শিক্ষকদের শহীদদের বেদীতে দাড়িয়ে নেয়া শপথের কথার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই আমার এই কথা বলা।
আমি জাপানে আছি গত দু'বছর থেকে। আমার স্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে গত অক্টোবরেই তার আসার কথা ছিল জাপানে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই অনাকাংখিত ঘটনার জন্য তার ফাইনাল পরীক্ষা পিছিয়ে যায়। অবশেষে তার পরীক্ষা শুরু হয়েছে কিছুদিন আগে এবং ফেব্রুয়ারীর প্রথম দিকে শেষ হবে, ইনশাল্লাহ (যদি আর কোন অঘটন না ঘটে)। যেহেতু সে পরীক্ষা শেষ করেই চলে আসছে, সেহেতু আমার স্ত্রী তার বাবাকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল একটা দরখাস্ত করার জন্য যাতে তার অনুপস্থিতিতে সার্টিফিকেট সহ অন্যান্য সকল কাগজপত্র আমার শ্বশুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ওঠাতে পারে। আর সেখানেই ঘটল একটা অনাকাংখিত ঘটনা।
আমার স্ত্রী সম্ভবত শামসুন্নাহার হলে এলোটেড। সেখানে যখন সে আমার শ্বশুরকে নিয়ে গেলেন দরখাস্ত করার জন্য, কাজ শেষ করে সেখানকার কর্রব্যরত কর্মকর্তা চা-বিস্কুট খাওয়ার জন্য টাকা চেয়ে বসলেন। বাংলাদেশে যারা দুর্নিতি করে, তারা সাধারণতঃ চা-বিস্কুট খাওয়ার কথা বলেই টাকা নেয়। আর চাদাবাজরা নেয় মিষ্টি খাওয়ার কথা বলে। আমার স্ত্রী সোজাটাইপ মেয়ে। সে কোন প্রতিবাদ না করে (হয়তো করার সুযোগও ছিলনা। কারণ, টাকা না দিলে হয়তো পরে অন্যকোন ভাবে আটকে দেবে।) অল্পকিছু টাকা এগিয়ে দিল। আমি অবশ্য প্রতিবাদ না করার জন্য আমার স্ত্রীর উপর আমার উষ্মা প্রকাশ করেছি। সামান্য টাকা দেখে সেই কর্মকর্তা নাকি বিস্বয় নিয়ে বলেছিল, এত অল্প টাকা?!
টাকাটা অল্প ছিল ঠিকই, তবে তার অপরাধ মোটেও অল্প নয়। সে সোজা সাপটা একটা ঘোষখোর। ঘোষখোর সে ছোট হোক আর বড় হোক, তাদের মধ্যে আমি কোন পার্থক্য দেখিনা। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে এত প্রতিবাদী কন্ঠস্বর আছে, যারা শহীদদের বেদীতে দাড়িয়ে শপথ নেয় সকল অন্যায়ের প্রতিবাদ করার, তাদের নাকের ডগায় কি ভাবে এসব অন্যায় ঘটে, আমার বুঝে আসেনা। হয়তো অনেকেই বলবে, এসব ঘটে গোপনে। আমি বলব, মোটেও গোপনে ঘটেনা। ব্যাপাগুলো ওপেন সিক্রেট। আমাদের প্রতিবাদী ছাত্র-শিক্ষকরা ঘটনাগুলো ওভারলোক করে। কেন করে? আমার কাছে এপ্রশ্নের কোন সদোত্তর জানা নেই। আর তাই মনে হয়, আমারা যারা শিক্ষক সমাজকে জাতির বিবেক বলে ভাবতে ভালবাসি, যারা শিক্ষকদেরকে আমাদের শ্রেষ্ঠ সম্মানটুকু দেই, সেই শিক্ষক সমাজ এবং প্রতিবাদী ছাত্ররা যখন শহীদের বেদীতে দাড়িয়ে সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার শপথ নেয়, তখন তাদেরকে আমার প্রতারক বলে মনে হয়। তাদের সেই শপথ আমার দেশের শহীদদের অসম্মান করে বলেই আমার বিশ্বাস।
আমার জানামতে এরকম ছোট-বড় অন্যায় হর হামেশাই হচ্ছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। কিন্তু তার প্রতিকার করার জন্য আজ পর্যন্ত প্রতিবাদী ছাত্র-শিক্ষকদের একটি দিনের জন্য কালো ব্যাজ ধারণ করতে দেখিনি, শুনিওনি । একটি দিনের জন্য ক্লাশ বর্জন করতেও দেখিনি। মানব বন্ধন করতে বা অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে দাড়িয়ে প্রতিবাদ জানাতেও না। এসব অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে কোন প্রতিবাদী ছাত্র-শিক্ষক তাদের ক্যাম্পাসে কালো পতাকা উড়ায়নি আজ পর্যন্ত। এদেরকে প্রতারক ছাড়া আর কি ভাবতে পারি, বলুন।
আমার স্ত্রী-র বর্ণনায় ঘটনা এখানেই শেষ নয়। সে কয়েকটা রিকমেন্ডেশান লেটারের জন্য তার ইনষ্টিটিউটের অফিসে দরখাস্ত করেছে। রিকমেন্ডেশান লেটারেগুলো দেয়ার আগেই তার কাছে প্রতিটির জন্য ২০ টাকা লাগবে বলে জানিয়ে দিয়েছে অফিস ষ্টাফ। রিকমেন্ডেশান লেটারের জন্য টাকা লাগে এই প্রথম শুনলাম। এপেয়ার্ড সার্টিফিকেটের জন্যও চা-বিস্কুটের টাকা লাগবে বলে আগে থেকেই বলে রেখেছে। এসব শুনার পর আমি কি বলব ভেবে পেলাম না। শুধু মাঝে মাঝে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধায় গড়ে ওঠা বিশাল প্রাসাদের ভিত্তিটা প্রবল ঝাকুনি খায়।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জানুয়ারি, ২০০৮ সকাল ১০:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


