তখনো অন্ধকার পুরোপুরি কাটেনি। পূবের আকাশ হালকা আলোর রেখায় ধীরে ধীরে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হচ্ছে। নিঝুম গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষগুলো এখনো ঘুম থেকে জাগেনি। সকালের পাখিরা ঘুম জড়নো কন্ঠে ডেকে যাচ্ছে অবিরত। সবুজ গ্রামটার মুখে কি এক মুগ্ধকরা সতেজতা।
আমার ঘুম কেন যেন হঠাৎ করেই ভেঙ্গে গেল। ছোট্র মাটির ঘরের গুলগুলির মত জানালাটা খোলা-ই থাকে সারা রাত। সেই জানালা দিয়ে তাকালাম বাইরের দিকে। রাত কতটা ঠিক ঠাহর করা যাচ্ছিল না। একটু এপাশ ওপাশ করে ও আর ঘুমাতে পারলাম না। বিছানা ছেড়ে বাইরে এসে দাড়ালাম। দূরের মসজিদ থেকে ভেসে আসছে আযান। আমি ঘুম জড়ানো চোখে হাটতে হাটতে এসে দাড়ালাম আমাদের বাড়ির সামনের প্রসস্ত খোলা মাঠটার প্রান্তে। ভোরের কোমল বাতাস আমার অনুভূতিতে অন্যরকম একটা পরশ দিয়ে গেল।
মাঠটার ঠিক সামনে দিয়ে চলে গেছে আমাদের গ্রামের প্রধান সরকটা। আমি হাটতে শুরু করলাম সেই সরক দিয়ে। পথে দু'একজন মুসল্লির সাতে দেখা হল। তাদের কেউ-ই আমাকে খুব একটা চেনেন বলে মনে হল না। না চেনার-ই কথা। একে বারে গ্রামের ছেলে হলেও লেখাপড়ার ছুতোয় সেই ৯ বছর বয়স থেকেই গ্রাম ছাড়া। তবু নিজেকে আমার একনিষ্ঠ গেয়ো বলেই মনে হয়। কারণ, অনেক দিনের শহর বাস আমার মন থেকে গ্রামের আবহটা মুছে দিতে পারেনি এতটুকুন ও। শহরের মাঝে থেকে ও আমি আমার মনে ছোট্র একটা গ্রামকে লালন করে চলেছি প্রতি নিয়ত।
হাটতে হাটতে বেশ অনেকটা পথই চলে এলাম। আমি তখন একটা ছোট্র কালভার্ট-এ দাড়িয়ে। সামনে-পিছে আদিগন্ত বিস্তৃত সবুজ ধানক্ষেত। সরকটা দুই পাশের দু'টো গ্রামকে যুক্ত করে রেখেছে। সকালের আলোর রেখা ফুটতে এখনো বেশ খানিকটা দেরি। ধানের সবুজ গাছগুলোর উপর দিয়ে বয়ে আসা সকালের ভিজে বাতাস ফুসফুসের ভেতর প্রবেশ করে আমার হৃদয়টাকেও যেন ভিজিয়ে দিচ্ছিল। ভেজা মনের সেই সুখ আজো আমার মনে সজীব হয়ে আছে।
আমার টেবিলের সামনে একটা বিশাল কাচের জানালা। খোলা হয় কদাচিৎ। পাচ তালার এই রুমটা থেকে জানালার কাচ গলে সামনে দৃষ্টি রাখলেই দেখা যায় ঢেউ খেলানো পাহাড়ের সাড়ি আর তার ছোট্র উপত্যকা দিয়ে চলে যাওয়া মসৃণ সরক। সেই সরক দিয়ে মিনিট পাচেক হাটলে একটা ছোট্র কালভার্ট পড়ে। সেই কালভার্টে দাড়িয়ে মাঝে মাঝে আমি বিকালের সূর্যডুবা দেখি। পাহাড়ী বাতাস গায়ে মাখি। সবুজ পাহাড়ের সিগ্ধতা অনুভক করি। কিন্তু আমার ফেলে আসা সেই ছোট্র গ্রামের ছোট্র কালভার্টে দাড়িয়ে যে সবুজকে উপভোগ করতাম, সেই অনুভুতি পাই না। বাতাসে সেই চীরচেনা গন্ধ পাই না। ফুসফুস ভরে বাতাস নিলেও কেমন যেন এটা শুন্যতা থেকে যায়। তাই কেবলই ইচ্ছে করে আবার চলে যাই সেই ছোট্র গ্রামে।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জুলাই, ২০০৮ সকাল ৯:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


