আজ ৭ আগস্ট ২০১৫ শুক্রবার, রাজধানী ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় নিলয় নীল (২৭) নামে আরেক ব্লগার খুন হয়েছেন। খিলগাঁও গোড়ান এলাকায় বাসায় ঢুকে দুর্বৃত্তরা তাকে গলা কেটে হত্যা করেছে। নিলয় গোড়ানের ওই বাসার পঞ্চম তলায় থাকতেন। ভাড়াটিয়া পরিচয়ে প্রবেশ করে দুর্বৃত্তরা তাকে হত্যা করেছে বলে প্রাথমিক ভাবে জানা গেছে। খিলগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া বলেন, আমরা খবর পেয়ে নিলয় চৌধুরি নামে ওই যুবকের গলাকাটা লাশ উদ্ধার করেছি। লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।
খিলগাঁও থানার ওসি মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, খিলগাঁও গোড়ানের একটি বাড়ির পাঁচতলার বাসায় স্ত্রী ও বোনকে নিয়ে থাকতেন নিলয়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে এক যুবক বাসা ভাড়া নেওয়ার কথা বলে ওই বাড়িতে ঢুকে পড়ে। ওই যুবক ফোন করে আরও দুজনকে ওই বাসায় নিয়ে আসেন। ওই তিন যুবক ধারালো অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নিলয়ের স্ত্রী ও বোনকে একটি ঘরে আটকে রাখেন। এরপর নিলয়কে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে চলে যান। ঘটনাস্থলেই নিলয় মারা যান। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে।
নিলয় নীল ব্লগে ও ফেসবুকে ধর্মীয় গোড়ামির বিরুদ্ধে লেখালেখি করতেন। তিনি যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে সরব ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী কাউন্সিলেরও সদস্য। ধারণা করা হচ্ছে মৌলবাদী গোষ্ঠী তাকে হত্যা করতে পারে।
ফেব্রুয়ারিতে মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়কে হত্যার পর, মার্চ মাসে ঢাকায় ব্লগার ওয়াশিকুর রহমান বাবু ও মে মাসে সিলেটে ব্লগার অনন্ত দাস বিজয়কে খুন করে দুর্বৃত্তরা। সবগুলো খুনের মোটিভ একই। একটি খুনেরও এখনো বিচার হয়নি। বাবুকে খুন করার পর হত্যাকারীদের দু'জনকে এক সাহসী বৃহন্নলা হাতেনাতে ধরে দেন পুলিশকে। সেই বিচারেরও কোনো অগ্রগতি আর শোনা যায় না। তারপর সিলেটে অনন্ত বিজয়কে খুন করল। সেই খুনেরও কোনো অগ্রগতি নেই। এখন পর্যন্ত যেটা সত্য সেটা হল, একের পর এক ব্লগার হত্যাকে সরকার বাহাদুর একদম আমলে নিচ্ছে না।
এক অভিজিৎ রায় হত্যাকে নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যত প্রতিবাদ হয়েছে, যত লেখালেখি হয়েছে, বিচারের দাবিতে যত মানববন্ধন, সভা-সমাবেশ হয়েছে, তাতেই সরকার বাহাদুর কোনো পাত্তা দেয়নি। সরকারের এই ধরি মাছ না ছুই পানি টাইপের এমন আস্কারার আড়ালে দুর্বৃত্তরা একে একে ব্লগারদের হত্যা করে চলছেন। সরকার বাহাদুর ব্লগার হত্যায় এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পর্যন্ত দেয়নি। তাহলে কী ব্লগার হত্যায় সরকারেরও নিরব সমর্থন রয়েছে? নাকি মুক্তবুদ্ধি চর্চার সঙ্গে সরকারের অনেক দোষের সাংঘর্ষিক সম্পর্ক হওয়ায় একের পর এক ব্লগার হত্যায় সরকার বাহাদুর মনে মনে খুশি? নইলে একটা হত্যাকাণ্ডেরও বিচার হচ্ছে না কেন? খুনিরা ধরা পড়ছে না কেন?
বাংলাদেশে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বলতে আসলে কী আছে? কারো জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। সরকার নিরাপত্তা দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছে। একের পর এক একই কায়দায় ঘোষণা দিয়ে ব্লগার হত্যা করা হচ্ছে। সরকারের কাছে একটি গ্রুপ ৮৪ জন ব্লগারের একটা তালিকাও জমা দিয়েছে। কী হচ্ছে আমার বাংলাদেশে?
আমরা নিলয় নীল হত্যাকাণ্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি। পাশাপাশি সরকারের কাছে অনুরোধ করছি, খুনিদের দ্রুততার সঙ্গে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক সাজার ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশ এখন খুনিদের অভয়ারণ্যে পরিনত হয়েছে। এখানে শিশুদের বিকৃতভাবে হত্যা করা হচ্ছে। নারীদের ধর্ষনের পর হত্যা করা হচ্ছে। আর লেখকদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করা হচ্ছে। এক একটি হত্যার মোটিভে একটা সাংঘাতিক মিল আছে।
কোথায় যাচ্ছে বাংলাদেশ? বাংলাদেশের যারা শাসক, এক একটি খুনের পর তারা নতুন ঘটনা ঘটার আগ পর্যন্ত এক ধরনের এড়িয়ে চলার কৌশল গ্রহন করেছে। কিন্তু মানুষের জীবনের নিরাপত্তা দিতে সরকার ব্যর্থ হচ্ছে। মিডিয়া, সাধারণ মানুষ একটি ঘটনার পর কিছুদিন সরব থাকছে। নতুন ঘটনা ঘটলে সবাই পুরাতন ঘটনা ভুলে যাচ্ছে। সরকার সেই সুযোগে আগে ঘটা ঘটনাগুলোর দায় এড়িয়ে যাচ্ছে কৌশলে। বাংলাদেশের শাসকরা দায় এড়ানোর এক কঠিন মন্ত্রে যেন দীক্ষা নিয়েছে। যতই খুন খারাবি হোক, সরকারের যেন তাতে কোনো দায় নেই। সরকার বাহাদুরের ভাবখানা ঠিক এমন।
লেখক হত্যার তালিকায় এরপর কে সেই আশংকা এখন মুক্তবুদ্ধি চর্চার লেখকদের মধ্যে আতংক আকারে বিরাজ করছে। অথচ কেবল দলীয় পোষ্য বা চামচা কবি লেখকরা এসব লেখক হত্যার পর কোনো প্রতিবাদ বা উচ্চবাচ্য পর্যন্ত করছে না। দলীয় এসব কবি-লেখকরা যেন বাংলাদেশের এমন সব ঘটনার কথা শোনে না বা জানলেও না জানার ভান করছেন। এমন একটা এড়িয়ে যাবার কৌশল নিয়ে এরাও অবাধে দলীয় চামচাগিরি করে যাচ্ছে। সেই সুযোগে আবার নতুন নতুন লেখক খুন হচ্ছে। এমন কী দলীয় ফোরামেও এসব চামচা কবি-লেখকরা এসব হত্যাকাণ্ডের কোনো ধরনের প্রতিবাদ করেছে বলে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে শোনা যায় নি।
কবি-লেখক গোষ্ঠীর কেউ খুন হলে এই গোত্রের সবারই খারাপ লাগার কথা। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, বাংলাদেশে শাসক দলের যারা চামচা কবি-লেখক, তাদের এসব হত্যাকাণ্ডে আজ পর্যন্ত কোনো প্রতিবাদের ঘটনা দেখা যায় নি। অথচ সংবেদনশীল যে কোনো কবি-লেখকেরই এসব সগোত্রীয় লেখকের হত্যাকাণ্ডের জন্য অন্তরে বিষবাষ্প জমা হবার কথা। মনে ভারী কষ্ট পাবার কথা। কিন্তু দলীয় কবি-লেখকদের সংবেদনশীলতা ওই মাত্রার সক্রিয় নয়। সগোত্রের কারো হত্যাকাণ্ডে তারাও সরকার বাহাদুরের মত চুপচাপ থাকার কৌশল গ্রহন করেছে।
আপনি শুধু একবার দৃশ্যটি কল্পনা করুন, দিন দুপুরে প্রকাশ্য দিবালোকে আপনার বাসায় ঢুকে স্ত্রী ও বোনকে আটকে রেখে আপনাকে দুর্বৃত্তরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে বীরের মত চলে যাচ্ছে। এ কোন মরার রাষ্ট্রে আমার জন্ম হয়েছে? এ কোন বর্বর রাষ্ট্রে আমরা মুক্তবুদ্ধি চর্চার মানস করেছি? এ কোন দুর্বৃত্ত দল যারা একই কায়দায় লেখকদের একের পর এক খুন করছে।
যাকে খুন করা হচ্ছে, প্রতিটা ক্ষেত্রে তাকে আগের থেকেই হুমকি দেওয়া হচ্ছে, তাকে অনুসরন করা হচ্ছে, আর সবশেষে দিনের আলতে প্রকাশ্যে খুন করে খুনিরা বীরের মত পালিয়ে যাচ্ছে। আর এখন পর্যন্ত এসব খুনের একটিরও বিচার কাজের কোনো অগ্রগতি নেই। সরকার বাহাদুর এসব খুনের ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে কোনো বক্তব্যও দিচ্ছে না। তাহলে বাংলাদেশে একের পর এক লেখক হত্যা চলুক, সরকার কী এই কথাই সুস্পষ্ট ভাবে না বলে কৌশলে বলে দিয়েছে???
..................................
৭ আগস্ট ২০১৫
ঢাকা

সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই আগস্ট, ২০১৫ সকাল ৯:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


