somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণ করা যাচ্ছে না কেন? এই দায় কার???

১৪ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সকাল ৯:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

স্বাধীনতার ৫০ বছরেও আমরা সারাদেশে একাত্তরের বধ্যভূমি ও গণকবরের সংখ্যা সুনির্দিষ্ট করতে পারিনি। এমনকি আমরা একাত্তরের গণশহীদদের নামের তালিকা পর্যন্ত তৈরি করতে পারিনি। অথচ আমাদের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক আস্ত একটি মন্ত্রণালয় রয়েছে! ২০০৯ সালে সারাদেশে একাত্তরের বধ্যভূমি, গণকবর ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো চিন্থিত ও সংরক্ষণ করার জন্য উচ্চ আদালত রায় দিয়েছিলেন। তারপরও চলে গেছে এক যুগ কিন্তু এই কাজের সত্যিকারের অগ্রসর কতদূর?

সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত সারাদেশে মোট ২০৯টি বধ্যভূমি ও গণকবরের সন্ধান পাওয়ার কথা জানা যায়। এর মধ্যে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ শনাক্ত করেছে ১৯৩টি বধ্যভূমি। বেসরকারি সংস্থা ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং-এর মতে সারাদেশে প্রায় পাঁচ হাজার বধ্যভূমি রয়েছে। এর মধ্যে শনাক্ত করা গেছে মাত্র ৯৪২টি। অথচ সংরক্ষণ করা হয়েছে মাত্র ৩৫টি।

এছাড়া দেশের অন্তত ৮৮টি নদী ও ৬৫টি ব্রিজ-কালভার্ট শনাক্ত করা হয়েছে যেখানে শত শত বাঙালিকে একাত্তরে নির্বিচারে হত্যা করা হয়েছে। খোদ রাজধানী ঢাকার ৭০টি বধ্যভূমির মধ্যে শুধু মিরপুরেই রয়েছে ২৩টি। অথচ এই ২৩টি বধ্যভূমির মধ্যে সংরক্ষণ করা হয়েছে মাত্র ৩টি। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের বধ্যভূমির তালিকায় ঢাকা ও তার আশপাশের এলাকায় অন্তত ৩৯টি বধ্যভূমির নাম থাকলেও এই বধ্যভূমিগুলোও অরক্ষিত রয়েছে।

সরকারি হিসেবে চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৬১টি বধ্যভূমির নাম থাকলেও স্মৃতিচিহ্ন রয়েছে মাত্র দু'টিতে। বাকি ৫৯টি বধ্যভূমিতে স্মৃতিফলক পর্যন্ত নেই। একমাত্র পূর্ব পাহাড়তলী ও হালিশহরের মধ্যম নাথপাড়ায় দুটি বধ্যভূমিতে স্মৃতিফলক রয়েছে। চট্টগ্রাম মহানগরীর ৬১টি বধ্যভূমির মধ্যে পাহাড়তলীতেই সবচেয়ে বেশি বধ্যভূমি। এখানেই রয়েছে ১৫টি বধ্যভূমি। এছাড়া লালখান বাজারে ৬টি, হালিশহরে ৫টি, গোসাইলডাঙ্গায় ৫টি, আন্দরকিল্লায় ৪টি, বাকলিয়ায় ৩টি, রহমতগঞ্জ, কাট্টলী, পতেঙ্গা, বন্দর এলাকা, কাটগড়, মুরাদপুর, নাসিরাবাদ, পূর্ব মাদারবাড়ী ও পাঁচলাইশে দুটি করে এবং চন্দনপুরা, জয়পাহাড়, চান্দগাঁও, ষোলশহর ও রামপুরায় একটি করে বধ্যভূমি রয়েছে।

একই চিত্র দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা অন্যান্য বধ্যভূমি, গণকবর ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলোর। অযত্ন, অবহেলা ও অবৈধ দখলের কারণে বাংলাদেশের একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বধ্যভূমি, গণকবরগুলো নিশ্চিহ্ন হতে চলছে। সর্বশেষ ২০১৯ সালে দেশের ২৮১টি বধ্যভূমি সংরক্ষণে ৪৪২ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করেছিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি বা একনেক। যার মেয়াদ ২০২১ সালের জুন মাসে শেষ হয়েছে।

এই সময়ের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় মাত্র একটি বধ্যভূমি সংরক্ষণ ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের কাজ শেষ করেছে। বাকি ২৮০টির মধ্যে ৩টি বধ্যভূমির নির্মাণ কাজ শেষের পথে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের যে কোনো ধরনের ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণ করা এবং নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানানো প্রত্যেক বাংলাদেশি নাগরিকের একটি পবিত্র কর্তব্য।

অথচ স্বাধীনতার ৫০ বছরেও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, একাত্তরের বধ্যভূমি, গণকবর, গণশহীদদের নামের তালিকা ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো শনাক্ত, রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণে আমরা উদাসীন। আর এই কাজগুলো সবসময় নানান কিসিমের অযুহাত দিয়ে উপেক্ষা করা হয়েছে। আমরা মুখে মুখে বক্তৃতা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে বড়াই করি। অথচ মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক স্থান ও মুক্তিযুদ্ধে গণশহীদদের নামের তালিকা প্রনয়ণের ক্ষেত্রে আমরা চরমভাবে উদাসীন, যা সত্যিই দুঃখজনক।

শুরু থেকেই এবিষয়ে নানান কিসিমের অভিযোগ, ব্যাপক দুর্নীতি, কর্তৃপক্ষের দায়িত্বে চরম অবহেলা এবং ঠিকাদারদের অসংখ্য অনিয়মসহ নানা ধরনের ফিরিস্তির খবর পাওয়া যায়। অথচ অবহেলিত এসব একাত্তরের বধ্যভূমি, গণকবর ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো যদি যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা যায়, কেবলমাত্র তখনই আমরা নতুন প্রজন্মকে মহান মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস চর্চায় সচেতন করতে পারব।

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্মৃতিকে যদি আমরা বাঁচিয়ে রাখতে চাই, তাহলে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলোকেও শনাক্ত, সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের এসব ঐতিহাসিক স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে জীবন্ত রাখতে হলে সারাদেশের বধ্যভূমি, গণকবর, গণশহীদদের নামের তালিকা ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত সকল স্থানকে সংরক্ষণ করতে হবে।

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের এসব ঐতিহাসিক স্মৃতি শনাক্ত ও সংরক্ষণের দায়িত্ব সরকারের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধে নিহত ব্যক্তির পরিবার ও সকলস্তরের নাগরিকদের মাধ্যমে উদ্যোগ নিতে হবে। এজন্য গবেষণা করা এবং তা যথাযথভাবে খুঁজে বের করার জন্য সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও দরকার। আর রাষ্ট্রীয়ভাবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন না হলে কোনোদিন তা আর সম্ভব হবে না।

প্রতি বছর কেবল ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালন করার সময় সংবাদমাধ্যমে লোকদেখানো আহাজারি করে কোনো ফল পাওয়া যাবে না। মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ঐতিহাসিক স্মৃতিগুলো নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য দেশের সকল বধ্যভূমি, গণকবর, গণশহীদদের নামের তালিকা ও স্থানকে শনাক্ত, সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নাই।

শহীদ বৃদ্ধিজীবী দিবসে একাত্তরে নিহত সকল বাঙালির স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানিয়ে এই বিষয়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগের বাস্তবায়ন দেখতে চাই। শুধুমাত্র কথায় নয় কাজের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের সকল ঐতিহাসিক ঘটনার আর্কাইভ দেখতে চাই।
---------------------
১৪ ডিসেম্বর ২০২১
ঢাকা



সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০২১ সকাল ৯:২০
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশে কি ইনফ্লেশান শুরু হয়েছে?

লিখেছেন সোনাগাজী, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ সকাল ১০:০৩



আমি দেশ থেকে দুরে আছি, দেশের কি অবস্হা, ইনফ্লেশান কি শুরু হয়েছে? কোভিড ও ইউক্রেন যুদ্ধ মিলে ইউরোপ, আমেরিকাকে ভয়ংকর ইনফ্লেশানের মাঝে ঠেলে দিয়েছে; বাংলাদেশে ইহা এখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছদ্মবেশী রম্য!!!

লিখেছেন ভুয়া মফিজ, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ সকাল ১০:৩৪



আমার ফেসবুকে একটা নামমাত্র একাউন্ট আছে। সেখানে যাওয়া হয় না বলতে গেলে। তবে ইউটিউবে সময় পেলেই ঢু মারি, বিভিন্ন রকমের ভিডিও দেখি। ভিডিওগুলোর মন্তব্যে নজর বুলানো আমার একটা অভ্যাস। সেখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঘোওওল....মাখন.....মাঠায়ায়ায়া.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ দুপুর ২:৪৬

ঘোওওল....মাখন.....মাঠায়ায়ায়া.....

আমার ছোট বেলায় আমাদের এলাকায় ২/৩ জন লোক বয়সে প্রায় বৃদ্ধ, ঘোল-মাখন বিক্রি করতেন ফেরি করে। তাঁদের পরনে থাকত ময়লা ধুতি মালকোঁচা দেওয়া কিম্বা ময়লা সাদা লুংগী পড়া। খালি পা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাঠের আলোচনায় ব্লগারদের বই!

লিখেছেন মনিরা সুলতানা, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ বিকাল ৫:২৬

আমার আত্মজরা আমার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মাঝে যে বৈশিষ্ট্য নিয়ে মাঝেমাঝে হতাশা প্রকাশ করে! সেটা হচ্ছে আমার খুব অল্পে তুষ্ট হয়ে যাওয়া ( আলাদা ভাবে উল্লেখ করেছে অবশ্যই তাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

'সহবাসের জন্য আবেদন'...

লিখেছেন নান্দনিক নন্দিনী, ২৭ শে সেপ্টেম্বর, ২০২২ রাত ১০:১৯



রোকেয়া হলে আবাসিক ছাত্রী হিসেবে দীর্ঘ ৭বছর কেটেছে। হলের নানা গল্পের একটা আজ বলি। হলের প্রতিটি কক্ষে ৪টা বেড থাকলেও থাকতে হতো ৫জনকে। মানে রুমের সব থেকে জুনিয়র দুইজনকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×