সাধারণত অধিকাংশ ট্যুর হয়ে থাকে পূর্ব-পরিকল্পিত কিংবা কিছুটা প্রস্তুতি নেয়া থাকেই। এতে ট্যুরে গিয়ে নানা রকম ফ্যাসাদের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায় আর ট্যুর-ও হয় আনন্দদায়ক। এটাই সাধারণ রীতি।
কিন্তু সমস্যাটা হচ্ছে এই রীতি ভঙ্গ করার যে আনন্দ সেটা সহজে মিস করতে চায় না এই বয়সটা :#> । আর এই কারণেই হয়ত পরিকল্পনা-অনুমতি সব কিছুর তোয়াক্কা না করেই যে ট্যুরগুলো হয় সেগুলো অনেকটা বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকে। আমাদের ৩ জনের একটা গ্যাং আছে যাদের কাজ হচ্ছে এইরকম ট্যুর করা। আমরা এর নাম দিয়েছি “মাথা নষ্ট ম্যান ট্যুর” বা সংক্ষেপে এমএনএম (MnM) ট্যুর

। এই ট্যুরগুলো সাধারণত ১-২ দিনের জন্য হয়। আমরা ৩ জন সাধারণত সারা সপ্তাহের কাজ-পড়াশোনা-গ্যাঞ্জাম এর হাত থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য সপ্তাহান্তে আড্ডা দিতে এক হই। আর এই আড্ডাগুলোই হচ্ছে এই ট্যুরের জন্মভূমি

। আড্ডা দিতে দিতে হঠাত করে যে কোন একজনের মাথায় চেপে বসে এই বুদ্ধি আর যেই বলা সেই কাজ। আড্ডাস্থান থেকেই তৎক্ষণাত বাস টার্মিনাল/রেলস্টেশন/লঞ্চঘাটে গিয়ে হাজির হই আমরা। কাছাকাছি সময়ে ছেড়ে যাবে এমন যা পাই তাতেই টিকেট কেটে চড়ে বসি আমরা ৩ জন। এই যাত্রার স্থানগুলো/যানবাহন ঠিক হয় এমনভাবে যেখানে আমরা যাইনি বা যে যানবাহনে আমাদের কেউ ১-২ জন চড়েনি এমনভাবে যাতে প্রথমবার যাওয়ার/চড়ার অভিজ্ঞতাটা হয়ে যায়। পকেটে হয়ত টাকা তেমন একটা থাকে না কিন্তু আমাদের ৩ জনের মধ্যে একজনের ডেবিট কার্ডের বদৌলতে তখনকার জন্য টাকা ম্যানেজ হয়ে যায় যেটা ট্যুর শেষে আমরা ৩ জনে সমান সমান ভাবে হিসাব মিলিয়ে নেই

। আর ট্যুর যেহেতু ১-২ দিনের বেশি হয় না তাই খরচটাও অত লাগামছাড়া হয় না। যানবাহনের ভাড়া; ২-৩ বেলার খাবার; পানি এতেই সীমাবদ্ধ থাকে খরচ।
এই ট্যুরের একটা ভয়ানক ব্যাপার আছে। :-& আমাদের ৩ জনের বাসাতেই ব্যাপক কড়াকড়ি। অনুমতি ছাড়া ঢাকার বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা (আমাদের বাবা-মার ধারণা আমরা একলা কোথাও গেলেই কোন না কোন দুর্ঘটনা ঘটবে)

। এইরকম ফার্মের মুরগির জীবনে আমরা ৩ জনেই হাঁপিয়ে উঠলেই বুঝতে পারি অতি শীঘ্র-ই একটা এমএনএম ট্যুর দিতেই হবে। আমরা ট্যুরে যাওয়ার প্ল্যান করার পর বাসায় জানাই একটু দেরী করে। যখন বাস/লঞ্চ/ট্রেন ছেড়ে দেয় তখন। মোটামুটি ঢাকার ত্রি সীমানা ছাড়ানোর পর-ই :> । অনেকেই বলবেন এইগুলো ভালো না। পরিবারকে এভাবে চিন্তায় ফেলে যাওয়া ঠিক না। কিন্তু আপনার প্রতি আপনার পরিবারের ওভার-প্রটেকশন যখন আপনার দম-বন্ধ করে ফেলবে তখন ফেরারি হতে বাধ্য আপনি।

আমরা ট্যুরে রওনা হলে পর বাসায় জানানোর পর যখন অনেকগুলো ঝাড়ি/গালি খেয়ে আপসেট হয়ে যাই তখন ৩ জন বসি আড্ডা দিতে আর পিছনের ফেলে আসা অনেক কথার আড্ডায় একসময় ভুলেই যাই সব। ছোটকাল থেকে অত্যন্ত সতর্কতার মধ্যে বড় হওয়ার কারণে আমাদের বাবা-মা ভাবে আমরা হয়ত এখনো বড়-ই হইনি কিংবা নিজেদের খেয়াল রাখার মত হেডম আমাদের হয় নাই

। কিন্তু যে পাখিকে উড়তে দেয়া হয়নি জন্মের পর থেকেই সে তার সহজাত প্রবৃত্তিতে উড়তে চাবেই। যাইহোক। যাত্রা শুরু করার পর ৩ জনের আড্ডা চলতে থেকে বিরতিহীনভাবে। মাঝে মাঝে ৭-৮ ঘন্টার পুরো জার্নি জুড়ে থাকে আড্ডা। আমরা এইভাবে বলি, “আজকে সিলেট আসছি আড্ডা দিতে” বা “আজকে ভাবলাম লঞ্চে বসে আড্ডা দেই”

। একদিকে আমাদের আড্ডাস্থলের পরিবর্তন আর সেই সাথে একটা ট্যুর হইয়ে যায়।
এমএনএম ট্যুরের মধ্যে সবচেয়ে মজার দিক হচ্ছে আমাদের খাওয়া-দাওয়া। :!> একেতো পকেটে পয়সা কম কিন্তু জার্নি এর পর যে ক্ষুধা লাগে সেটার লাগাম টেনে ধরে রাখা সত্যি কষ্টের। তাই হয়ত ১-২ বেলার খাবার খুব ভালো হয় আর বাকিগুলো শুকনো খাবার দিয়ে চলে যায়। এতে অবশ্য আমাদের কোন অভিযোগ নেই। শুক্র-শনি এই দুইদিন ৩ জনের-ই কাজ-কর্ম/ পড়াশোনার একটা ছুটি থাকে দেখে আমরা সেটা নিয়ে ভাবি না। আর কোন কাজ পড়ে গেলেও সেটাকে বাইপাসের একটা উপায় বের করে ফেলি আমরা। যেখানে যাচ্ছি সেখানে পৌঁছানোর পর আমাদের প্রথম কাজ হয় ঢাকা ফেরার জন্য যানবাহন ঠিক করে ফেলা। কারণ কোথাও থাকতে যাওয়ার জন্য যে হ্যাঁপা/খরচ সেটা আমাদের ট্যুরের মজা নষ্ট করে। অবশ্য মাঝে মাঝে হয়ত বড়জোড় এক রাতের জন্য কোথাও থাকার একটা ব্যবস্থা করে ফেলি আমরা। আর এর মধ্যেই আমাদের পুরো শহর/দর্শনীয় জায়গাগুলো ঘুরে দেখে ফেলি আমরা। একটা ব্যাটারীচালিত অটো (ঢাকার বাইরের শহরগুলোতে অনেক পাবেন) নিয়ে বের হয়ে যাই আমরা। ঘুরতে যেয়ে আমরা অটোচালককে আমাদের গাইড বানিয়ে ফেলি। সাথে কোন ক্যামেরা থাকার কোন প্রশ্ন আসে না কারণ এটা আনপ্ল্যান্ড ট্যুর। অবশ্য মোবাইলের ক্যামেরায় কিছু ছবি তোলা হলেও এখানে ছবি তোলার চেয়ে ঘোরা আর আড্ডাটাই জরুরী তাই অনেকেই এই ট্যুরগুলোর ছবি দেখতে চাইলে কিছুই থাকে না দেখানোর মত।
আমাদের ৩ জনের ইচ্ছা মোটামুটি বাংলাদেশের সবগুলো জেলা আমরা এভাবে ঘুরে দেখে ফেলবো।

যেহেতু বিদেশে ঘুরতে যাওয়ার মত অর্থনৈতিক মেরুদন্ড আমাদের অতটা শক্ত-পোক্ত না তাই সেটা নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। আগে দেশকে দেখবো সেটাই বড় কথা। এই ট্যুরগুলোতে হয়ত নানারকম বিপদ/গ্যাঞ্জামের সমূহ সম্ভাবনা থাকে তবুও এইরকম এডভেঞ্চারের যে মজা সেটার কাছে সব ভয় পরাজিত।
আমাদের প্রজন্মের এই “ফার্মের মুরগি” এর মত জীবন যাপনের প্রতি প্রতিবাদ স্বরূপ এই এমএনএম ট্যুর। আমাদের বাবা-মা-আত্মীয় স্বজনের বোঝা উচিত আমরা যথেষ্ট বড় হইছি

। যারা এখনো এইরকম খাঁচা-বন্দী জীবন-যাপন করছেন তারা ভেবে দেখতে পারেন এইরকম ট্যুরের কথা। অবশ্য অতিরিক্ত পরিমাণ ফুর্তি বা এডভেঞ্চার করতে গেলে নিজের রিস্কে

। অনেকে আবার আজকাল “ভাদাইম্যা” বলে গালি দেয়

। দিক। নিজের দেশের আনাচ-কানাচ দেখে আসার জন্য “ভাদাইম্যা” হতে রাজী আমি

। আমি জানি এইরকম আরো অনেকেই নানান সময়ে ট্যুর দেন। শেয়ার করে ফেলেন এইখানে। এইসব বৈচিত্রময় ট্যুরের মজাদার অংশগুলো পড়ে অনেকেই হিংসা করবেন। তাই দেরী না করে দেখেন এই সপ্তাহের শেষে কই যাওয়া যায়। প্ল্যান করলেও করতে পারেন কিন্তু মনে রাখবেন আচমকা ট্যুরে প্ল্যান করতে বসলেই হাজারটা সমস্যা সামনে আসবে। তাই মোটামুটি সেফ এমন কোন জার্নি বেছে নেন আর সেইরকম একটা ট্যুর গ্যাং বানিয়ে ফেলেন। হয়ত আপনাদের নেক্সট ট্যুরে আমাদের সাথেই দেখা হয়ে যাবে।

:!>
“A wise traveler never despises his own country.”
– Carlo Goldoni