একটি খ্যারের ঘর, সামনে একটি ছাউনি দিয়ে তৈরী রান্নাঘর,
উনুনে খড়ি দিয়ে আমাদের জন্য রান্না করছে আমার মা।
মাটি দিয়ে লেপা আমাদের ঘর ও বারান্দা,
ঘরের পাশেই ছিল একটি লেবুর গাছ,
বারান্দায় বিছানো মাদুরে বসে
সারাদিন আমি খেলা করতাম;
আমার মা রান্না ঘর থেকে আমাকে দেখতো।
মনে পড়ে-,
আমাদের ঘরে ফ্যান ছিলনা, তবুও গরম লাগতো না ;
বাড়ীতে লাগানো বিভিন্ন গাছের ছায়া
আর বাড়ীর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীর মতো ছোট লেকটি থেকে
হিম শীতল বাতাস বইতো
প্রকৃতি উষ্ণ হলে, মায়ের হাতের তাল পাতার পাখার বাতাস
প্রাণ জুড়িয়ে দিত।
মনে পড়ে-,
আমাদের ছোট্র ঘরে একটি চৌকি ছিল,
তার উপর বিছানো ছিল একটি শীতল পাটি,
ঘরের এক কোণে জ্বালানো থাকতো হারিকেন;
রাত্রিতে জ্যোস্নার আলো জানালা ভেদ করে বিছানায় এসে পড়তো;
বাবা ব্যস্ত থাকায় বাড়ী ফিরতে দেরী হতো;
মায়ের কোলে মাথা রাখলে
মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিত,
ঘুম পাড়ানীর গল্প শুনতে শুনতে
ঘুমের স্বপ্নরাজ্যে হারিয়ে যেতাম।
মনে পড়ে-,
সকালে ঘুম থেকে উঠবোনা বলে কত বাহানা;
শরীর খারাপ, ভালো লাগছেনা ,
একুট পড়ে উঠবো মা , বলে আবার ঘুম;
মা কিন্তু পিছু ছাড়েনি,
আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে
মধুর কন্ঠে বলতো
বাবু উঠো, এতো ঘুমুলে হবে পড়তে বসতে হবে না।
মনে পড়ে-,
আমি যখন পাঠশালায় ভর্তি হলাম
তখন তার চিন্তার অন্ত রইলো না
কখন আমি বাড়ী ফিরবো সেই চিন্তায়
খিরকি ধরে দাড়িয়ে থাকতো
আমার আসার অপেক্ষায়।
মন পড়ে-,
একবার আমার বসন্ত রোগ হলো;
সারা শরীরে গুটি গুটি ভিতরে জমানো পানি,
পাড়ার সবাই আমাদের বাড়ীতে আসা বন্ধ করে দিল;
সেই সময় আমার মা আমাকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে থাকতো;
অভয় দিতো আল্লাহ সব ঠিক করে দিবেন।
মনে পড়ে-,
আমি যখন ১০৪ ডিগ্রী জ্বড়ে আবোল তাবোল বকছি,
জ্বরে সারা গা পুড়ে যাচ্ছে,
তখন আমার মা, সারা রাত জেগে আমার মাথায় পানি ঢেলেছে।
সকালে যখন তাঁর পবিত্র মুখ খানা দেখি,
ক্লান্তির কোন ছাপ আমি খুজে পাইনি ;
শুধু মনে হলো, আমাকে নিয়ে সে একটু চিন্তিত।
মনে পড়ে-,
মায়ের হাতের ভুনা খিচুরী, কষা মাংস,
আর আলু ভর্তা, আমার প্রিয় খাবার।
একটু বৃষ্টি হলেই মা বলতো, খাবি নাকি।
কথা শুনে জিবহে জল আসা আর বাকী রইলো না।
মনে পড়ে-,
আমি যখন পরীক্ষা দিতে যায়,
মায়ের পা ছুয়ে সালাম করতাম,
মা বুকে জড়িয়ে নিতো,
মাথায় হাত বুলিয়ে দোয়া করতো,
বলতো, আল্লাহকে স্মরণ করো
ইনশাল্লাহ তুমি সফলকাম হবে।
মনে পড়ে-,
প্রতিটি পরীক্ষায় আমার কৃতিত্বের সংবাদে
আমার মা আনন্দে কেঁদে ফেলতো।
পড়াশুনার খরচ যোগাতে বাবার সাথে
আমার মা সারা রাত জেগে
কাপড় সেলাই করতো।
মনে পড়ে-,
আমার সব দাবী আবদার ছিল মায়ের কাছে।
স্কুলেতে যাবার সময়
বারোভাজা আর আইসক্রিম খাবার জন্য ,
পঞ্চাশ পয়সা নিতাম মায়ের কাছ থেকে।
বাড়ী থেকে আমার স্কুল ছিল প্রায় ৩ মাইল দুরে,
পায়ে হেটে সহপাঠীর সাথে স্কুলে যেতাম;
একদিন আমার সহপাঠী শুরু করলো সাইকেলে করে স্কুলে যাওয়া ,
আমি হয়ে গেলাম একা।
স্কুল থেকে ফিরে মাকে বললাম, সাইকেল কিনে না দিলে
যাবো না আর স্কুলে।
বাবা বাড়ী ফিরলে মা বললেন, এই নাও আমার সোনার হার
বাজারে বিক্রি করে কিনে দাও সাইকেল বাবুকে।
মনে পড়ে-,
আমি যখন বড় হলাম, বাসায় ফিরতে রাত্রি হতো
সবাই ঘুমালেও , তুমি আমার অপেক্ষায়
চাতক পাখির মতো পথের পানে চেয়ে থাকতে।
তোমাকে কতদিন বলেছি,
তোমার দাড়িয়ে থাকার দরকার নেই, তুমি শোননি।
মা, তোমাকে খুব মনে পড়ে
তুমি আমাকে শিখেয়েছো কিভাবে কথা বলতে হয়;
শিখিয়েছে কিভাবে পথ চলতে হয়;
শিখিয়েছে কিভাবে বড়দের সম্মান করতে হয়,
কিভাবে ছোটদের স্নেহ করতে হয়;
তুমি শিখিয়েছে,
কিভাবে একজন আদর্শবান নাগরিক হিসেবে সমাজে গড়ে উঠা যায়।
মা, তোমার নির্দেশিত পথে হেটে চলেছি এতটা পথ;
তোমার স্নেহের ছায়ায়,
মমতাভরা ভালবাসায় আমি বড় হয়েছি,
তুমি আজ এতটা পথ দুরে ,
ইচ্ছা হলেই তোমাকে দেখতে পায়না;
তোমার মমতা মাখা পবিত্র হাতের স্পর্শ পায়না;
ভুল হলে ধমক দিয়ে কেউ আর বুকে টেনে নেয়না;
আমার মা , তোমাকে আজ খুব বেশী মনে পড়ে;
তোমার জন্য আমার অনেক অনেক ভালবাসা।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মে, ২০১০ রাত ১১:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


