সিয়াম- খুবই চঞ্চল একটা ছেলে। সারাদিন কিভাবে কত ভাবে মানুষকে পেইন দেয়া যায় সেই চিন্তায়ই থাকে সে। তার শয়তানির একটা নমুনা দেয়া যাক।
এক শবে বরাতের রাতে সে তার বন্ধুদের সাথে গোল মিটিং এ বসলো। তারা বন্ধুরা তো কখনো ভালো কিছু করে না, তাদেরও তো মানুষের উপকারে কিছু করা উচিত। কি ভালো কাজ করা যায় সেটা বের করার জন্যই আজকের মিটিং। অবশেষে ঠিক হল তারা নিজেরা তো ইবাদাত করে পুণ্য অর্জন করবে এটা খুব একটা সোজা কিছু নয়। বরং কিছু মানুষকে যদি খারাপ কাজ করায় বাধা দেয়া যায় তবে কিছু পুণ্য অর্জন হয়। এখন খুজে বের করতে হবে মানুষ কি কি খারাপ কাজ করে যেসবে এই ছোট বয়সে তারা বাঁধা দিতে পারে। অনেক খুজে পেতে অবশেষে বের হল, এই যে এত মানুষ জন টিভি দেখে, তাতে করে তো তাদের অনেক পাপ হয়। যদি তাদের পাপের বোঝা কিছুটা সিয়ামরা কমিয়ে দেয় তাহলেই তো সিয়ামদের অনেক পূণ্য হবে। তো কিভাবে কমানো যায় মানুষজনের টিভি দেখা? খুবই সহজ- সবার বাসার ডিসের লাইন যদি কেটে দেওয়া যায় তাহলেই কাজ হয়ে যায়। ভাবতেই শুধু দেরী হয়েছিল কিছুটা করতে নয়। তাও সেই ডিশের তার এমন ভাবে মাঝে থেকে কেটে নেওয়া হয়েছিল যে ওই তার এমনিতে জোড়া লাগানো সম্ভব ছিলনা।
তো এই হচ্ছে আমাদের সিয়াম। তার মাথায় সবসময়ই কিছু নাহয় কিছু ঘুড়তে থাকে। আজকাল তার নতুন টার্গেট তাদের স্কুলে ভর্তি হওয়া নতুন মেয়েটি- বৃষ্টি। তার বাবা এখানে বেশ বড়সড় সরকারী কর্মচারী। নতুন এসেছেন এখানে। সেই সূত্রে বৃষ্টির নতুন স্কুলে ভর্তি হওয়া। কারো সাথেই তেমন কথা বার্তা বলে না বৃষ্টি। সব সময় আলাদা আলাদা থাকে। ঠিক ক্লাস শুরুর আগে আগে আসে, ক্লাস শেষেই চলে যায়। বাপ বড় চাকরী করে বলে কি ভাব নিয়ে বসে থাকতে হয় নাকি? এই স্কুলের বাকি ছাত্র-ছাত্রীরা কি কোথাও থেকে ভেসে এসেছে নাকি? বিরক্ত লাগে মেয়েটাকে। এই মেয়ের ভাব কমাতে হবে। আর সেজন্যই একে পেইন দেওয়া এখন সিয়ামের দায়িত্ব ও কর্তব্যের পর্যায়ে পড়ে।
আজকাল প্রায়ই টিফিনের বক্স খুলে সেটা খালি পায় বৃষ্টি। সে এই স্কুলে একদমই নতুন। গত ২০-২৫ দিনে ক্লাসের ২-৩ জন মেয়ে বাদে কারো সাথে কথা হয় নি তার। তার সাথে যে এমন করছে সে যে কেন এমন করছে সেটাই বুঝে উঠতে পারছে না বৃষ্টি। অবশ্য সে জানে এটা কে করছে। সিয়াম নামের ছেলেটার যে কি সমস্যা সৃষ্টিকর্তাই জানেন। যখন বক্স খুলে বৃষ্টি দেখে কিছু নাই, তারপরেই শুনে এদের হাসি। চাইলে সে গিয়ে টিচারদের কাছে নালিশ করে আসতে পারে। কিন্তু বৃষ্টির নিজের টিফিন খেতে ইচ্ছে করে না বলে অন্য কেউ খেয়ে নেওয়ায় তার কোন সমস্যা নাই। বাবা যদিও বৃষ্টিকে প্রতিদিন পই পই করে বলে দেন অবশ্যই টিফিন খেতে হবে, দরকার হলে ওষুধ ভেবে খেতে হবে, তবুও খেতে হবে। বাবা কেন এমন বলেন বৃষ্টি বুঝে। দিন দিন বৃষ্টির শরীর অনেক দূর্বল হয়ে যাচ্ছে, সবাই তাকে নিয়ে অনেক চিন্তিত। ডাক্তাররা তার তেমন কোন রোগও ধরতে পারছেন না। কিন্তু যত দিন যাচ্ছে বৃষ্টির অবস্থার ততই অবনতি হচ্ছে।
বৃষ্টি বুঝে পায় না সিয়াম ছেলেটা কি মজা পায় তাকে বিব্রত করে। সেদিন যখন অংক ক্লাসে জ্যামিতি বোঝানোর আগে স্যার জিজ্ঞেস করলেন “বৃত্ত কাকে বলে?” সিয়াম উঠে দাঁড়িয়ে বৃত্তের সংজ্ঞা দিয়ে বললো সোজা ভাষায় বললে বৃষ্টির কপালে যে টিপ টা সেটাই একটা বৃত্ত। সাথে সাথে ক্লাসের সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। বৃষ্টির কপালে ঠিক টিপ পড়ার জায়গাটায় একটা ছোট্ট তিল আছে। সেই তিল নিয়েই এই কাহিনী।
কাউকে বিরক্ত করলে সে যদি কোন রিএকশান না দেখায় তবে কি আর তাকে বিরক্ত করতে ভালো লাগে? তখন আরো মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। সিয়ামের অবস্থা এখন তাই। এই যে প্রতিদিন সে আর তার বন্ধুরা মিলে বৃষ্টির টিফিন সাবাড় করছে, তাতে মেয়েটার কোন ভ্রূক্ষেপ নাই। মেজাজট প্রচন্ড খারাপ হয়ে আছে সিয়ামের। আজ সে কয়েকটা তেলাপোকা ধরে এনেছে। এটা মেয়েদের ক্ষেত্রে সবসময় কাজ করে। এটা মেয়েদেরকে পেইন দেওয়ার জন্য অপ্রতিদ্বন্দ্বী। চিৎকার চেচামেচি করে, লাফঝাপ দিয়ে সব মাথায় তুলে ফেলে সে যেই মেয়েই হোক না কেন। সিয়াম ঠিক করেছে এই তেলাপোকা এমন ভাবে রাখতে হবে যেন ইসলামিয়াত ক্লাসে সে মাথাচারা দেয়। এই স্যার মেয়েদের পড়াশুনার বিরোধী এবং মেয়েদের দোষ খোজার জন্য সব সময় দুই পায়ে খাড়া থাকেন। এসময় যদি বৃষ্টি মেয়েটাকে নাচানো যায়...
আজ টিফিন টাইমে বক্সে খাবার অক্ষত পেল বৃষ্টি। সে সময় সিয়াম এসে তার পাশে বসে বললো “স্যরি, আসলে আমরা একটু মজা করছিলাম। নতুন সব স্টুডেন্টদের সাথেই করা হয়।” বৃষ্টি কিছু না বলে মাথা নাড়লো। হায়রে কথা বললে যেন তার মান সম্মান চলে যাবে। এইসব মেয়ে যে কোথা থেকে আসে... মনে মনে বললো সিয়াম। তারপর হুট করে সিয়াম তার ব্যাগটা এনে বৃষ্টির পাশে বসে গেলো।
আজ সিয়ামের ব্যাবহারে বেশ অবাক হল বৃষ্টি। তার পর মনে হল হয়তো নতুন ছিল বলেই তার সাথে একটু মজা করা হয়েছে। কিন্তু ইসলামিয়াত ক্লাস এ বৃষ্টি তার ব্যাগ থেকে যখন বই আর খাতা বের করতে যাবে, ব্যাগের ভেতর পুরো স্থির হয়ে গেল তার দুই চোখ। এই প্রাণীটাকে আগে সে বেশ ভয় পেত। দেখে চিৎকার চেচামেচি জুড়ে দিত। আজ দেখে কেন জানি একটুও ভয় পেল না। খুব কান্না পেল বৃষ্টির। হুট করে এতদিন পরে তার মনে হলো সে এখন চিৎকার চেচামেচি করলে কেউ তাকে জড়িয়ে ধরে সাহস দেবার নাই। কেউ তেলাপোকা গুলো ওর সামনে থেকে সরিয়ে দেবার নাই। আজ এতগুলো দিন পর বৃষ্টির চোখে পানি দেখা দিলো, ক্লাসের মাঝে চিৎকার করে কেদে উঠলো বৃষ্টি। আজ বৃষ্টির মনে হল কেউ তার কান্না থামাতে পারবে না। ক্লাসের সবাই অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো।
বৃষ্টির বাবা এসে পরে মেয়েকে নিয়ে গেলেন। তখন জানা গেল, বৃষ্টি তার মা- বাবার একমাত্র মেয়ে ছিল। অসম্ভব প্রানচঞ্ছল এক মেয়ে ছিল বৃষ্টি। সবসময় লাফালাফি। মায়ের অসম্ভব আদরের মেয়ে ছিল সে। বাবাকে অফিসের কাজে ব্যাস্ত থাকতে হত সবসময়। মা-ই ছিলেন বৃষ্টির পৃথিবী, বৃষ্টির সবচেয়ে ভালো বন্ধু। মাস তিনেক আগে এক রোড একসিডেন্টে মারা যান বৃষ্টির মা। মায়ের মৃত্যু বৃষ্টিকে আমূল বদলে দিয়েছে। এক ফোটা পানি পড়েনি মেয়েটার চোখ থেকে। খুব চুপচাপ হয়ে গেছে সে। কার সাথেই কোন কথা বলে না সে এখন, একা একা থাকে সবসময়। তারপর থেকেই তার শরীর খারাপ হতে শুরু করেছে কোন কারন ছাড়া। ডাক্তাররা বলেছিলেন এভাবে চলতে থাকলে মারাও যেতে পারে বৃষ্টি। মা মারা যাওয়ার তিন মাস পর আজ প্রথমবার বৃষ্টির চোখে বৃষ্টি নামলো। অনেক অপেক্ষার বৃষ্টি...
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুলাই, ২০১১ সকাল ১০:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


