হঠাৎ করেই মিসেস রহমানের ঘুম ভেঙ্গে গেল। একটু একটু কাঁপছেন তিনি...... কানের কাছে এখনো লাখ লাখ মানুষের "দিতে পারো... দিতে পারো... ..." আওয়াজ....। স্বপ্ন দেখছিলেন তিনি.....। সামনের দেয়ালের সোনায় বাঁধানো ঘড়িটিতে খেয়াল করে দেখলেন 4টা বেজে 10 মিনিট.....। তেষ্টা পেয়েছে খুব কিন্ত কাউকে ডাকতে ইচ্ছে করছে না। নিজেই নরম, ছিমছাম বিছানা থেকে নেমে এগিয়ে গেলেন পাশের টেবিলে...। পুরো আড়াই গ্লাস পানি খেয়ে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলেন জানালার ধারে...। নাহঃ হাঁটুর ব্যাথাটা ভালো হয়নি, হাটতে গেলে এখনো চিনচিন করে উঠে....। আরাম কেদারায় গা এলিয়ে দিলেন...। নিজের ভেতরে কেমন একটা পরিবর্তন উপলব্ধি করছেন তিনি...। ধরতে পারছেন না, কিন্ত স্পষ্ট বুঝতে পারছেন...।
শীত চলে গেলেও ভোরের দিকে সি্নগ্ধ ঠান্ডা পড়ে বছরের এই সময়টা। তার উপর শীতাতপ নিয়ন্ত্রন যন্ত্রের কল্যানে একটু বেশীই ঠান্ডা লাগছে মিসেস রহমানের....। পাশের কাঁথাটা টেনে নিয়ে গায়ে জড়ালেন....। স্বপ্নের আবেশটা বার বার নাড়া দিয়ে যাচ্ছে তাঁকে... বুঝতে পারছেন না এটা কেবলই স্বপ্ন নাকি আসলে দু:স্বপ্ন.... ....
অনেক রাত অবধি মিটিং শেষ করে বিছানায় দেহ সঁপে দেবার ঠিক পরমুহুর্তেই গভীর ঘুমে ডুবে গিয়েছিলেন তিনি....। ঘুমের মধ্যে খেয়াল করলেন তিনি দাড়িয়ে আছেন তার লাল বাসভবনের বারান্দায়, সামনে অগনিত মানুষ....। হাজার হাজার..... লাখ লাখ। জীবনে তিনি অনেক বিশাল সমাবেশ, মহা সমাবেশ করেছেন , কিন্ত এতো মানুষ এক সাথে দেখেন নি.....। ঢাকা শহরের ঘর-বাড়ি যেন কোথায় উবে গেছে, যতো দুর দৃষ্টি যায় কেবল মানুষ আর মানুষ...। কারো মুখে কোন শব্দ নেই, অভিব্যক্তিতে কোন হিংসা নেই, কোনো ক্ষোভ নেই..... শুধু একেকজনের চোখে একেক প্রশ্ন.... আর সেই অপলক চোখের দিকে তাকিয়ে একে একে সব প্রশ্ন পড়ে যাচ্ছেন তিনি....
হঠাৎ একটা ছোট্ট ফুটফুটে বালিকার মুখের উপর তার দৃষ্টি থেমে গেল। আশ্চর্য হয়ে গেলেন তার চোখে কোনো প্রশ্ন নেই, আছে কিছু একটা বলার আকুতি... কোমল ঠোঁট দুটো হালকা নড়ছে....। তিনি মেয়েটিকে হাতের ইশারায় কাছে ডাকলেন, মেয়েটি নি:সংকোচে কাছে এসে দাড়াল..... তিনি কিছু একটা জিজ্ঞাসা করতে যাবেন ঠিক তখনি পুতুলের মতো মেয়েটি মুখ নেড়ে উঠলো....
: তোমরা আমাকে অহংকার করার মতো একটা দেশ দিতে পারো....?
শেষ কবে কেঁদেছেন মনে নেই মিসেস রহমানের, কিন্ত এই মায়াবী মুখের মেয়েটির কথায় নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলেন না। ভরা চোখে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে যেইনা কিছু একটা বলতে যাবেন, অমনি..... গগন বিদারী আওয়াজ.....।
: অহংকার করার মতো একটা দেশ দিতে পারো...... দিতে পারো..... দিতে পারো......।
ভাবতে ভাবতে তিনি আরাম কেদারায় আবারো তন্দ্রামগ্ন হলেন...। এবার তিনি নিজেকে দেখতে পেলেন টাকশালে.... কোষাগার উপচে পড়ছে যেনো, কোষাধ্যক্ষকে জিজ্ঞেস করতেই জবাব দিল
: সব কালো টাকার মালিকেরা সরকারী কোষাগারে তাদের টাকা জমা দিয়েছেন।
অস্ত্রাগারে গিয়ে দেখেন সব আধুনিক আস্ত্রের স্তুপ....। জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলেন দেশের সব অবৈধ অস্ত্রধারীরা তাদের অস্ত্রজমা দিয়েছে.... ঘোড়াশালে গিয়ে দেখেন লাখ লাখ টাকায় কেনা অবহেলায় নষ্ট হতে যাওয়া বিদেশী গাড়ীগুলো ঝকঝক তকতক করছে.......।।
ফজরের আযানে মিসেস রহমানের তন্দ্রা ভাবটা কেটে যায়....... ব্যস্ত হয়ে উঠেন তিনি...। নাহঃ আর সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না...। তারাতারি নামাজ শেষ করে বেরিয়ে যান রাজপথে.... একা.... কোন নিরাপত্তা রক্ষী ছাড়াই.....। মানিক মিয়া এভিনিউ-র পাশে সংসদের দক্ষিন প্লাজায় এসে দেখতে পান বিরোধী দলীয় নেতা....। শান্ত ভঙ্গিতে দাড়িয়ে আছেন...।
: আপা কেমন আছেন?
: জ্বী ভাবি ভালো, আমি আসলে আপনার এখানেই যাবো ভাবছিলাম....।
: আমি ও তো আপনার এখানে যাবো বলেই বের হলাম...। একটা স্বপ্ন, জানেন আপা......
: কি বলেন ভাবী, আমি ও একটা স্বপ্ন দেখলাম....। সেই থেকে আমার কানে বেজে চলেছে ......"দিতে পারো..... দিতে পারো......"
: আপা চলেন আজকের দিনে "জাতির জনকের" দোয়া নিয়ে নতুন করে শুরু করি আমাদের পথ চলা...।
: শুধু জাতির জনক না ভাবী, যে মহান ঘোষকের কণ্ঠে সারা জাতি একসাথে "স্বাধীনতার ঘোষনা" শুনলো তার মাজারেও যাবো....।
দুইজন হাত ধরে কথা বলছিলেন এর মধ্যে দেখেন দুই দলের সাংসদরা এসে জড়ো হয়েছেন, কারো মুখে কোন কথা নেই.... শুধু স্বপ্রশ্ন দৃষ্টি....। সাদা পাঞ্জাবী পরিহিত, শশ্রুমন্ডিত এক সাংসদ সামনে এসে হাতজোড় করে বল্লেন.......
: আপা আমায় ক্ষমা করে দি.....।। বাংলা মায়ের স্তন্য দুগ্ধে লালিত হয়ে সেই মায়ের ই বুক ক্ষত বিক্ষত করেছি বিষাক্ত দাঁতের কামড়ে.....।।
: বিরোধী নেতা বল্লেন ভাই উঠে দাড়ান...। এই দেশ আমাদের সকলের, আমরা সবাই সমান দায়ী গত 35 বছরের জন্য....। আর দেরী নয়, আজ থেকে নতুন করে শুরু হবে আমাদের পথ চলা.... কবল ই সামনের দিকে.....।
সবাই ধানমন্ডির বিশেষ বাড়িটির দিকে পা বাড়িয়েছেন....। ঠিক এমন সময় দেখতে পেলেন এক ভদ্্রলোক, মাথার চুলে জেল করা..... হন্তদন্ত হয়ে ছুঁটে এসে বল্লো, "বিলীভ মি, আই বিকাম এ গুড ম্যান ফ্রম নাউ অন....। ইউ অল ক্যান কীপ বিশ্বাস অন মী....।"---- সবাই হো হো করে হেঁসে উঠে আবার রওনা দিলেন..... হাতে হাত ধরে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে.....সব ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে....।
সবার মিলন দেখে "বাংলা মা" তার শত ছিন্ন অাঁচল দিয়ে চোখ মুচছেন..... মাগো..... লক্ষী মা আমার..... তুমি আর কেঁদোনা.....। আজ যে তোমার সুদিন..........তোমার সন্তানেরা তাদের ভুল বুঝতে পেরেছে.....এখন তো আর কাঁদার সময় নেই তোমার... তোমার সন্তানেরা আজকের নতুন সূর্যোদয়ের সাথে তোমার জন্য নিয়ে এসেছে ঝলমলে একটি দিন..... এই সোনালী আলো তো আর ফুরোবার নয় মা......।।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



