আমি সাধারণত সকালে কিছুই খাই না, তাই বলে ফাও ফাও খাওয়া ছাড়ি ক্যামনে? কিন্ত খামু কী, অনেক গরিমসী করে শেষে মি. বেকারেই দিলাম হানা। আমার আগেই কন্ডিশন ছিল, না খেয়ে একপা ও নড়বো না। বাধ্য হয়েই ফুলি বিবি গোটা চারেক "বুটার ক্রসো", দুইটা "কোয়ার্ক টাশে", চারটা "বেরলিনার" নিয়ে হাজির হল বেথোফেন স্কয়ারে।
সকালের সি্নগ্ধ রোদে, বেথোফেনের পায়ের নিচে বাঁধানো বেদীতে বসে আমি ফুলির আনা সামগ্রী তে একটা করে কামড় দেই, আর ফুলির লম্বা বক্তৃতা শ্রবন করি...। আসলে শ্রবন করি বল্লে ভুল হবে। কারণ, আমি এক কান দিয়ে ঢুকাই আরেক কান দিয়ে বের করি, এই মতে বিশ্বাসী না। বরং, কানের আশে পাশে নরটনের সিকিউরিটি দিয়ে রাখি, যাতে কোন কিছুই কান পর্যন্ত আসতে না পারে।
আমি খাই, ফুলি চিল্লায়...।
খাওয়ার পরে ফুলি বল্লো-
: খাইলাতো, এইবার চলো।
আমি যেনো আকাশ থেকে পড়লাম,
: কই যামু?
: কই যামু মানে?
আমি একটা গ্লুকোজ হাসি দিয়ে বল্লাম,
: বড়ই ঘুম ঘুম পাইতাছে। একটা কফি (ক্যাপুচিনো) হইলে মন্দ হয় না।
ফুলি যেন এ্যাটম বোমের মতো ব্রাস্ট হতে গিয়েও হলো না। তবে বেচারীর জন্য আমার একটু মায়াই হলো। কফির দামটা আমিই দিলাম...।
ঘন্টা খানেক হেনতেন ঘুরে এবার ফুট দেবার পালা। ফুলি বিবিকে U- Bahn স্টেশনের দিকে এগিয়ে দিতে গিয়েই খেলাম মিলেনিয়ামের সেরা ধরা।
বেটিনা প্যানক্রাজ ওরফে বেটি। পরিচয়টা বেশ ভালোই ছিল। সবদিক থেকে খুব কিউট একটা মেয়ে। নিজেকে খাঁটি খ্রীষ্টান বলে দাবী করে। আমি একদিন "এলোমেলো" কিছু কথা বলেছিলাম ওকে, ওরই বাসায় brunch এর দাওয়াত খেতে গিয়ে।
কথা শেষ হলে দেখি খুব শক্ত করে হাতের মুঠোয় ক্রশ টা ধরে আছে। যোগাযোগ হতো প্রায়ই, একদিন কার সাথে আমাকে দেখে হঠাৎ নিরুদ্দেশ। নাই টেলিফোন, নাই এস.এম.এস, নাই ডাকপিয়ন....।
ইদানিং বহু কষ্টে যোগাযোগ পূনসর্্থাপিত। এই অবস্থায় ফুলি বেগমের সাথে আমাকে দেখলে আর রক্ষে নাই...। কিন্ত যাই কই! এক পা করে পিছন যাই, ফুলি বলে, পায়ে কি মেন্দি দিয়া হাঁট নাকি?
আমি মনে মনে গান ধরি, "আইজ মাইনকা চিপায় পরছিরে শ্যাম"।
যাক, ব্যাপারটা বেশ ভালো ভাবেই টেকল করলাম। সাপ পিটাইতে পিটাইতে হালুয়া বের করে ফেল্লাম কিন্ত লাঠি অটুট। মনে মনে বল্লাম, আই এম অ্যা গড ড্যাম টাংকিবাজ
গুন গুন করতে করতে অলরেডি স্টেশানে, ট্রামের জন্য অপেক্ষায় আছি। দেখি আরো একজন, উপরওয়ালা যখন দেন ছাপ্পর ফেড়ে দেন। আমি বলি, হায়রে অভাগা, সারা মাসে এদের সাথে দেখা হয় না, আর আজকে কেন সবাইকে একই সাথে আমার বান্দর মুখ দর্শন করাতে বিধাতার এই খেলা? মনে মনে খেদোক্তি করি, ছিঃ বিধাতা, এই ছিল তোমার মনে?
প্রিসিলা আমাকে দেখেই তার প্রস্ত মুখে "হাই" বলে দৌড়ে এসে গাল ঘষাঘষি...। আমারতো আর মন্দ লাগে না। কিন্ত ফুলি সাথে আছে যে! পাছে কি না কি মনে করে বসে। ট্রাম চলে আসাতে বিরাস বদনে, ফুলির প্রস্থান, আমাকে খানিক স্বস্তি দিল বটে, কিন্ত তার মিনিট খানেক পরেই প্রিসিলার নির্গমন।
বিধাতা যেমন ছাপ্পর ফেড়ে দিয়েছিল, কতগুলো অঘটন শেষে আবার সব কেড়ে নিয়েও গেল। আমার ভেতরে তখন সুনসান মরুভূমি। অনাবৃষ্টিতে ভুগছি... বিলাস করবো কী নিয়ে!
পরাজয়ে ডরেনা বীর, আমি কেন কাৎরাই? দিলাম স্মৃতিতে ডুব। সবার স্মৃতিই বেদনা, আমারটা মনে হয় উলটা, বেদনা খুঁজে পাইনা। যাই হোক, খুব বেশী খুঁজতে হলো না, পেয়ে গেলাম একটা ঘটনা...।
বৈশাখের কোন একটা দিন।।.... তুমুল বৃষ্টি। আমাদের স্কুলের ফুটবল খেলা, অন্য স্কুলের সাথে। ছুটি পাইনি, কেবল খেলোয়াড় আর সংশ্লিষ্টরা ছুটি পেয়েছে। সারাদিন ঘেনর ঘেনর করলাম হেড স্যারের সহকারীর সাথে।
: স্যার দেন না, সমর্থনের তো দরকার আছে। বড় ভাইরা খেলবে, আমরা হাত তালি দেব না, লম্বা চোখা বলটাকে "গোল গোল" বলে চেঁচাবো না, এটা কী হয়?
স্যারের কড়া প্রত্যাখান, কাভি নেহি। যা ভাগ, এখান থেকে।
ক্লাশে কি আর মন বসে? তুমুল বৃষ্টি... পিছনে বসে বসে একটা কবিতা লিখে ফেল্লাম-
"অসংখ্য নৌকা নদীতে ভাসে" , এর পরে তো আর কিছু যোগ করতে পারিণা। অবশ্য যে কবিতাটা (!) লিখলাম সেটাও এক বন্ধুর রাফ খাতা থেকে চুরি করা
হঠাৎ ই দুষ্টু বুদ্ধি, বই খাতা এক কেবলা কান্ত ভাল ছাত্রকে বুঝিয়ে দিয়ে পিছনের দরজা দিয়ে কমান্ডো স্টাইলে বেরিয়া গেলাম ক্লাশ থেকে।.... দৌড়, সোজা হক মিয়ার আলু পুরির দোকান। পরবর্তি দশ মিনিটে আরো 4টা কুলাঙার এসে হাজির, আমার দেখানো স্টাইল ফলো করে। ঠোঙা ভর্তি পুরি নিয়ে রাস্তায় বৃষ্টিতে ভিজি, হাপুস হুপুস করে আলু পুরি খাই আর হাসতে হাসতে একেকজন পারিণা গড়িয়ে পড়ি, হুদা হুদিই।
মাঠে গিয়ে এক ছাতা ওয়ালার পাশে পজিশন নিলাম আমরা পঞ্চ-পান্ডব। উদ্দেশ্য.... একটু পরেই কিলীয়ার হবে
খেলা চলছে, কিসের খেলা কিসের কী? এমন বৃষ্টিতে খেলা হয় নাকি? মনে হচ্ছে টম এন্ড জেরী দেখছি... ফুটবল আর খেলোয়ারদের আচরণ দেখে সাহতে হাসতে খুন আমরা পাঁচ জন.... হুদা হুদিই।
হঠাৎ করে একজন বলে,
:ভাইজান, আপনের ছাতাটা সরাণ দেখি, গায়ে বৃষ্টির পানি পড়ে।
ছাতাওয়ালা ভাইজান একটু অদ্ভুত চোখে তাকালেন অলরেডী ভিজে যাওয়া গোল্লাটার দিকে। গোল্লা তার রসগোল্লা টাইপ মুখটা বেকিয়ে বল্লো,
: কী ভাই, ভিজে গেলামতো, ছাতাটা সরাণ।
এবার পাঁচজন ঘিরে ধরেছি ভদ্্রলোক কে। ভদ্্রলোক যে এখান থেকে অন্যত্র যাবেন, তারও জো নেই। পঞ্চ-বদমাস সমস্বরে ভাই ছোটদের প্রতি দয়া করেণ, ভিজিয়ে দিচ্ছেন তো। ছাতাটা বন্ধ করেণ না, আপনি এমন হৃদয়হীন কেনো, ভাইয়া...।
চারদিকের লোকজন তখন খেলা রেখে এদিকে তাকিয়ে। মিটি মিটি হাসছে পাবলিক। এহেন উপদ্্রবে টিকতে না পেরে ভদ্্রলোক শেষে ছাতা বন্ধ করলেন। আমরা ভিজলাম, ওনাকেও ভিজালাম...। আবার এর মধ্যে একজন জিজ্ঞেস ও করে,
: কি ভাইয়া, বৃষ্টিতে খেলা দেখতে মজা না?
বেচারা ভাইয়া মাথা নাড়ে...।
এই ঘটনার ঠিক বছর কয়েক পরের কথা। দু:সম্পর্কের এক ফুপুর বাড়িতে বেড়াতে গেছি। বিকেলে ফুফাতো ভাই আমাকে নিয়ে হাঁটছে। হঠাৎ এক বিশিষ্ট ভদ্্র লোকের সাথে দেখা। ফুফাতো ভাই পরিচয় করিয়ে দিল,
: ইনি আমিন ভাই, এগ্রিভার্সিটিতে পড়ছে।
: আমিন ভাই, এটা আমার মামাতো ভাই...।
আমিন ভাইকে দেখে কেমন জানি খটকা লাগলো আমার। কোথায় জানি দেখেছি মনে হল! আমিন ভাই জিজ্ঞেস করলেন-
: তোমাদের ক্লাশের নাজকে চেনো?
আমি বলি মাটি দুইভাগ হয়না কেনো এখনো? হাত পা কাঁপতে শুরু করে...
আমিন ভাই আবারো বল্লেন,
:বৃষ্টিতে ভিজে খেলা দেখার মজাই আলাদা কী বল?
হাসতে থাকেন আমিন ভাই।
পরদিন ঘটনাটা আমার তৎকালীন প্রেয়সী (হবে হবে), নাজকে বলতেই ও তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো।
: ওই আকামটা তাইলে তুমি করছিলা? ভাইজান পুরা ছয়দিন জ্বরে ভুগছে...। তুমি শেষমেষ বান্দরামী করলা আমার ভাইয়ের লগে?... বেয়াদব। তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নাই....।
গেলোগা নাজ বিবি। আমি এতোক্ষনে ভাবি, আমিন ভাই কোন নাজের কথা বলতেছিল....। আমি বাদাম খাই আর উপরের দিকে তাকাইয়া বলি,
: খুব মজা পাইছো, না?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


