ডারউইনের সূত্রমতে, বিবর্তনের কল্যাণে বানর, শিম্পাঞ্জি, বেবুনরা মানুষে রূপান্তরিত হয়েছে। তবে বিবর্তন কুকুরের লেজকে সোজা করতে পারেনি। একটি গল্প শুনে নিই। এক লোক খোলা রাস্তায় অনেকক্ষণ দৌড়ানোর পর একটি কুকুরকে ধরে ফেলল। আশপাশের লোকজন তো অবাক। লোকটিকে ঘিরে ভিড় আরও বাড়ল। লোকটি কুকুরটির লেজ ধরে সেখানে একটি লোহার পাইপ ঢুকিয়ে ফেলল। এক বৃদ্ধ এগিয়ে এসে লোকটিকে বললেন, বাবা তুমি কি জান না যে পৃথিবীর সব আয়োজন দিয়ে চেষ্টা করলেও কুকুরের লেজ কখনোই সোজা হবে না? লোকটি উত্তর দিল, আমি এত বোকা নাকি? আমি তো কুকুরের লেজ সোজা করার চেষ্টা করছি না; বরং লোহার পাইপটিকে বাঁকানোর চেষ্টা করছি!
'৭১ থেকে এ পর্যন্ত কিছু কিছু বানর, শিম্পাঞ্জি, বেবুন সোজা হয়নি। তাদের একজন চট্টগ্রামবাসী চৌকাসা। প্রথমেই তার কিছু বয়ান শুনে নিই।
এক. আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক ট্রাইব্যুনাল তার বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডসহ দেশ ও মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পেয়েছেন। এ বিষয়ে তার কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেছেন, শুক্রবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নামাজ-কালাম না পড়ে তদন্ত দলের সদস্যরা কুণ্ডেশ্বরীর শুরা কারখানায় শুরা পান করতে গেছেন। এটি ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের আবেগে খুব লেগেছে! তিনি আরও বলেছেন, আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ বিষয়ক ট্রাইব্যুনাল ও আইন তিনি মানেন না। চতুর্থ সংশোধনীর জন্য যেমন তার বাবাকে দায়িত্ব নিতে হয়েছিল, তেমনি এই কথিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও দায়-দায়িত্ব নিতে হবে। হায়! কত বড় ধৃষ্টতা এই বেবুনের! শেখ হাসিনাকে ইঙ্গিত করে তিনি আরও বলেছেন, যারা আমার ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতো ওই নয় মাসে ইন্ডিয়া যাননি, মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট গ্রহণ করেননি, তারা সবাই মানবতাবিরোধী ঝুঁকিতে আছে। তবে প্রাসঙ্গিক বলে একাত্তরে তার কর্মকাণ্ডের মাত্র দু-একটি বিবরণ তুলে ধরি।
ঘটনাকাল ১৯৭১-এর ১৩ এপ্রিল। রাউজানের গহিরা কুণ্ডেশ্বরী গ্রামে অন্যান্য দিনের মতো কাজ করছিলেন কুণ্ডেশ্বরী ঔষধালয়ের প্রতিষ্ঠাতা নূতন চন্দ্র সিংহ। এ সময় হামলে পড়ে পাক হানাদাররা। প্রাণ বাঁচাতে মন্দিরে আশ্রয় নেন নূতন চন্দ্র সিংহ। পাক হানাদাররা তাকে মারতে চায়নি। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিটির ইন্ধনে তারা গুলি করে মারে প্রার্থনারত নূতন চন্দ্রকে। মৃত্যু নিশ্চিত করতে পাক হানাদারদের একজনের কাছ থেকে রাইফেল নিয়ে পুনরায় গুলি করেন এই অভিযুক্ত।
একই দিন অর্থাৎ '৭১-এর ১৩ এপ্রিল রাউজানের জগৎমল্লপাড়া ও ঊনসত্তরপাড়ায় দু-দুটি গণহত্যা চালায় পাকবাহিনী। জগৎমল্লপাড়ায় ৩৪ জনকে এবং ঊনসত্তরপাড়ায় ৭০ জনকে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করা হয়। দুটি হত্যাকাণ্ডেরই নেতৃত্বে ছিলেন বেবুন প্রজাতির এ ব্যক্তি। একাত্তরেই খুনে সেঞ্চুরি করেছিলেন এই বেবুন। আবারও তার বয়ানে ফিরে যাই।
দুই. খালেদা জিয়া তাকে একবার দল থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। মেয়র সাদেক হোসেন খোকার সঙ্গে তার টক্কর লেগেছিল। তখন তিনি বলেছিলেন, আগে দেখতাম কুকুরে লেজ নাড়ায়। এখন দেখি লেজে কুকুর নাড়ায়। খোকাকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, কোথাকার কোন প্রমোদ বালক ছিনতাই করতে গিয়ে গালে ছুরির আঘাত পেয়েছিল। সেটা ঢাকতেই এখন দাড়ি রাখে বালকটি।
তিন. ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত ক্ষমতাসীন জোট সরকারের সমর্থনে ওআইসির মহাসচিব হতে চেয়েছিলেন এই চৌকাসা। সারাদেশে প্রতিবাদের ঝড় উঠেছিল। মহাসচিব হতে না পেরে বিদেশ থেকে দেশে ফেরার পর এয়ারপোর্টে তিনি শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে যে অশল্গীল মন্তব্য করেছিলেন তা মুদ্রণযোগ্য নয়। এরপর থেকে তার নাম হয়ে গিয়েছিল 'সোনা বিশেষজ্ঞ' বা 'গোল্ড এক্সপার্ট'।
চার. স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ব্যাপারটি মানতেই চান না চৌকাসা। একবার তাই বলেই ফেললেন, এরপর স্বাধীনতার ডাক পেলেই হলো। কে ডাকছে, গাছতলা, পাহাড় না বঙ্গোপসাগর কোন কোনা দিয়ে ডাকছে, সেটা আর দেখব না। ফ্যামিলিসহ ঝাঁপিয়ে পড়ব সেই ডাকে।
অথচ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কী অবস্থা হয়েছিল এই বেবুনের?
ঘটনাকাল ১৯৭২-এর জানুয়ারি। স্থান চট্টগ্রাম ও বঙ্গোপসাগর। দু'জন মানুষ সাড়ে সাত মণ সোনা ও হাজার হাজার টাকা সঙ্গে নিয়ে একটি ট্রলারে মিয়ানমার পালাচ্ছিলেন। মুক্তিপাগল মানুষ ও নবগঠিত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের ধরে ফেলে। পরদিন তাদের ছবি দৈনিক পত্রিকায় ছাপা হয়। প্রথমজন চৌকফা। দ্বিতীয়জন তার ছেলে চৌকাসা। দ্বিতীয়জন সাগরে ঝাঁপিয়ে পড়ে পালানোর জন্য পোশাকও খুলে ফেলেছিলেন। পরদিন পত্রিকায় তার সুইমিং কস্টিউম তথা আন্ডারওয়্যার পরা ছবি ছাপা হয়েছিল। ইস, এই ছবিটি যদি আবারও ছাপানো যেত!
১৯৭৯ থেকে এ পর্যন্ত যত নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, সেসব নির্বাচনে তিনি তার এলাকার সংখ্যালঘু তথা হিন্দু এলাকায় যেতেন। তার ক্যাডাররা লোকজন জড়ো করত। উপস্থিত লোকজনকে উদ্দেশ করে তিনি বলতেন, আমি ভোটে দাঁড়িয়েছি। আশা করি আপনারা আমাকে ভোট দেবেন। দেবেন না? এলাকার ভীত মানুষদের এরপর তিনিই বলতেন, বুঝেছি আপনারা আমায় সমর্থন দিচ্ছেন। ভোট আমি পেয়ে গেছি। আপনাদের আর কষ্ট করে ভোটকেন্দ্রে যেতে হবে না।
প্রাণ বাঁচাতে সংখ্যালঘুরা ভোটকেন্দ্রে যেত না। তিনি নির্বাচিত হতে পারতেন। খুনের সেঞ্চুরির চেয়ে এভাবে ভোট চাওয়া হয়তো অনেক বেশি শান্তির।
বিশেষ দ্রষ্টব্য : যেসব বানর, শিম্পাঞ্জি সোজা হবে না কখনও, আচরণে যারা পাগলা কুকুরের মতোই ধৃষ্টতা দেখাবে, কী শাস্তি হতে পারে তাদের? ছড়ায় আছে_ সর্বোচ্চ সাজা কার? আলবদর রাজাকার!
আগে দেখতাম মিউনিসিপ্যালিটির লোকজন ঘোষণা দিয়ে পাগলা কুকুর বধে নামত। পাগলা কুকুরদের ইনজেকশন দিয়ে বা গুলি করে তারা মেরে ফেলে। এই কর্মসূচিটি আবারও হাতে নেওয়া দরকার!
সূত্র: সমকাল।
লিংক: http://tinyurl.com/3xcgxoq

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


