somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সুখের বলিদান (পার্ট-১)

০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০১৪ বিকাল ৪:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সেদ্ধ আলুর উপকারীতা আর কেউ না জানলেও কাদের জানে। আজকালকার উচ্চমূল্যের বাজারে চাল কেনা কাদেরের জন্য একপ্রকার স্বপ্ন। ভাতের স্বাদ সে প্রায় ভুলে গেছে।

দুই তিনটার বেশী চালান করা যায় না। যাবেই বা কেমনে? ওমন শুকনো আলু সেদ্ধ গলা দিয়ে নামানো কি চাট্রিখানি কথা? তবুও চালের সাথে সব তরি তরকারী যখন দূর্মূল্যের মিছিলে শামিল তখন শুধু আলু সেদ্ধতেই শান্তনা নিতে বাধ্য।

কাদের ডাক দেয়- '' শশী, কাস্তেটা কোথায় রেখেছিস, নিয়া আয়। আমি গোয়ালে গেলাম গরু ছাড়তে। ''

কাদেরের ১০ বছরের মেয়ে শশী। কাস্তে এগিয়ে দিতে দিতে বলে- ''এত্ত সকালে মাঠে না গেলে হয়না বাবা? এখনো তো সূর্য উঠে নাই। ''
কাদের হাসে। হেসেই জবাব দেয়-
''সূর্য উঠলে তো কাজ করা কঠিন রে মা, তেজ শরীরে আগুনের মত লাগে ''
''তাহলে যে তুমি বেলা করে মাঠ থেকে ফিরে আস?''
কাদের মেয়ের প্রশ্নের উত্তর দেয় না। অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে গরু ছাড়তে থাকে। কাস্তে বগলে নিয়ে মাঠের দিকে হাটা ধরে।

দেখতে দেখতে মাঠে এসে যায় কাদের। জমির চারপাশে একবার চোখ বুলায়। সোনালী ধানে মন জুড়িয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু তা না হয়ে ভেতরে কোথায় যেন একটা বেদনার সূর হু হু করে বেঝে উঠে!

গত বছর পর্যন্ত এই জমির মালিক ছিল কাদের। বড় মেয়ের বিয়ের সময় একমাত্র এই জমিখানা বিক্রি করতে হয়েছে। যৌতুকের মোটা অংক পরিশোধ করতে বিকল্প আর কিছু ছিল না।

রোদ বৃষ্টি পিঠে সয়ে চাষ করা, ঢেলা ভাঙ্গা, আগাছা পরিষ্কার করা, সার দেয়া, তারপর বৃষ্টি হলে আবার চাষ দিয়ে বীজ বপন করা, ধান লাগানো। ধানগাছ একটু বড় হলে আবার ঘাস বাছা, সার দেওয়া, দরকার হলে সেচ দেওয়া।

এই এত কষ্টের ফসল কাদেরের একার না। জমির মালিককে অর্ধেক দিতে হবে। নিজে উপস্থিত থেকে কড়ায় গন্ডায় ভাগ করে নেয়।

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কাদের ভাবে, আহা! এত কষ্টের ফসলে আগের মত যদি কেউ ভাগ না বসাতো!

কাদের লুঙ্গিটা মালকোচা মারে। কাদার মধ্যে লুঙ্গি ছাড়া থাকলে কাদা লেগে লুঙ্গি ভারী হয়ে যায়। কাজ করা যায় না। তাছাড়া জোকের ভয় তো আছেই। গরু দুটাকে আগেই চারন ভুমিতে ছেড়ে দিয়েছে। এবার একটা ত্যানা দুই হাতে ভাল করে পেচিয়ে নেয়। পাকা ধানের পাতা হাত ঘা করে ফেলে। তাই জন্য এই ব্যাবস্থা। ফুলহাতা শার্ট গায়ে থাকলে হত। যেটা নাই সেটার বিকল্প সবাইকেই খুজে নিতে হয়।

সেদ্ধ আলু পেটে আবার সেদ্ধ হওয়ার আগে কাজ ভালই চলে। মাঝে মাঝে একটা বিড়ি জ্বালিয়ে শরীরকে একটু তাপ দিতে হয়, এই যা।
কাদের উঠে দাড়ায় ধীরে ধীরে। ধান অনেক কাটা হয়েছে। রোদ প্রচন্ড গরম। সহ্য সীমার বাইরে। এবার বাড়ী ফিরতে হবে। কাটা ধান মাঠেই রেখে আসে কাদের।

পড়ন্ত বিকালে বাড়ী নিয়ে আসে। বাড়ীতে এনেই তো আর কাজ শেষ না। মাড়াই করা, খড় আলাদা করা, ধান থেকে ময়লা পরিষ্কার করা তারপর শুকিয়ে ঘরে তোলা। এ কাজগুলো কিন্তু কম কষ্টের না!

ধান শুকাতে শুকাতেই জমির মালিক কাইয়ুম চৌধুরীর গোমস্তারা এসে হাজির হয়। দাড়ী কাটা দিয়ে কড়ায় গন্ডায় মেপে দুই ভাগ করে একভাগ নিয়ে যায়।

কাদের দ্বীর্গশ্বাস ছেড়ে চেয়ে থাকে সারা বছরের খাটুনির দিকে। আগে তার ক্ষেতের ধান দিয়েই মোটামুটি সারা বছরের ভাত হত। এ বছর অর্ধেক ধানের মালিক সে। বছরের মাঝামাঝি আসলে চাল কিনে ভাত খেতে হবে।

বড় মেয়ের শশুর এসেছেন। কাদেরের বেয়াই। ভালই হল। নতুন ধান ঘরে উঠেছে। মেয়েকে বাড়ি আনতে হবে। দরকারী কথা এখানে আগেই সেরে নেয়া যাবে।
'' তা কি খবর বেয়াই, আপনার দিনকাল চলছে কেমন? '' কাদের জিজ্ঞেস করে।
'' আমার দিনকাল আর! চলছে একরকম '' বেয়াই জবাব দিলেন।

এটা সেটা নিয়ে অনেক গল্প হল। একটা ব্যাপার কাদের প্রথম থেকে লক্ষ করছে। বেয়াই এর মুখে কাঠিন্য। কাদের বুঝতে চেষ্টা করেও পারছে না। যখন বুঝল একেবারে আকাশ থেকে পড়্ল!

বেয়াই দাবি করছেন যৌতুকের পাওনা বাকী টাকা। বিয়ের সময় বরপক্ষের দাবী ছিল ৫০ হাজার টাকা। কাদের সেটা তখনই মিটিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এখন বেয়াই বলছেন তাদের দাবী ছিল এক লাখ। অর্ধেক টাকা বাকী আছে।

এখন কাদের কি করবে? ঘরে যা ধান আছে সব বিক্রী করলেও তো ৫০ হাজার হবে না। টাকা না দিলে মেয়েকে যিম্মি করা হবে। এমনটাই ইঙ্গিতে বুজিয়েছেন বেয়াই।

এরি মধ্যে দু দিন হয়ে গেছে। কাদের চিন্তা করে কোন কিনারা করতে পারে নি।
হঠাত পাশের বাড়ীর আবুল খবর আনল কাদেরে মেয়ে নাকী খুব অসুস্থ! কাদের ছুটল মেয়েকে দেখতে। গিয়ে যা দেখল! তার চোখ ছানাবড়া। হতবিহব্বল কাদের মেয়েকে আনতে চাইল। মেয়ের শশুর দিতে রাজী হল না।

কাদের রাস্তায় হাঠছে আর ভাবছে স্ত্রীকে গিয়ে কি বলবে? মেয়েকে শশুর বাড়ির লোকেরা মারধর করেছে? সত্যি কথাটা কি মা হয়ে সে হজম করতে পারবে? আজ মেয়েটা তার দুর্বলতার কারনেই মার খেয়ে বিছানায়। অতচ এদের সুখের জন্য কতবার নিজের সুখকে বলি দিয়েছে সে!!
৩টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সৌদি আরবে বাংলাদেশের নতুন অধ্যায়

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৫৮


দিন দিন সরকারপ্রধানের ফ্যান হয়ে যাচ্ছি। তাঁর চলাফেরা, সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেলামেশা দেখে মানুষ বলতে শুরু করেছে, এ যেন আরেক জিয়া। আর “I have a plan” কথাটার অর্থ এত... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিশ্ব রাজনীতি, ক্ষমতা ও অর্থনীতির কেন্দ্রে এখন ভারত

লিখেছেন ...নিপুণ কথন..., ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:১২


ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী Dr S. Jaishankar কথা বলছেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওসহ অন্য বিশাল ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের মন্ত্রীরা একাগ্রচিত্তে শুনছেন।

হ্যাঁ, অস্বীকার করার উপায় নেই। বর্তমানে বিশ্বে ভারতের অবস্থান এমনই। সামরিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

এইচ এস সি রেজাল্ট ২০২৬ -ঢাকা বোর্ড

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৯

খুব অদ্ভুত ব্যাপার। আমাদের সময়ে চলে এলো নাকি? সেই চার দশক আগের মতন !
যা তথ্য পেলামঃ

In the 2026 HSC examinations, a total of 297,621 candidates appeared... ...বাকিটুকু পড়ুন

নারীর অনমনীয়তা, আমিত্ব ও ফিক্সড মাইন্ডসেটের কাছে অসহায় স্বয়ং ঈশ্বরও

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:৩৪



নারীর অনমনীয়তা, আমিত্ব বা ফিক্সড মাইন্ডসেট খুবই ভয়ংকর এক জিনিস, যেটার মুখোমুখি হয়ে ব্যর্থ হয়েছিল স্বয়ং মার্ভেল কমিকসের গড-লাইক ক্যারেক্টার 'বিয়ন্ডার'ও। বলছি সেই কাহিনি...

মার্ভেল কমিকসের অন্যতম মোস্ট পাওয়ারফুল ক্যারেক্টার... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের হ্যালোইন উদযাপন

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩


আজ ছিল হ্যালোইন। এই উৎসব ফসল কাটার মৌসুমের শেষ ও শীতের শুরু - এই উপলক্ষে হলেও বছরের এ সময়ে কানাডায় ঠান্ডা পড়ে যায়। তবে আজ আবহাওয়া ছিল ভালো। সারাদিন রোদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×