somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমাদের হ্যালোইন উদযাপন

০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আজ ছিল হ্যালোইন। এই উৎসব ফসল কাটার মৌসুমের শেষ ও শীতের শুরু - এই উপলক্ষে হলেও বছরের এ সময়ে কানাডায় ঠান্ডা পড়ে যায়। তবে আজ আবহাওয়া ছিল ভালো। সারাদিন রোদ ছিল, শরতের হিমেল বাতাসটাও আজ ছিল না, তাই কনকনে ঠান্ডা নেই। তার ওপর আজ শনিবার হওয়ায় ছুটির দিনের সাথে মিলিয়ে হ্যালোইনের আয়োজন ছিল উৎসবমুখর।

ছয়-সাত বছর আগে, যেবার প্রথম আমরা হ্যালোইনে বাচ্চাদের নিয়ে বাসা থেকে বের হয়েছিলাম, সেবার অনুভব করেছিলাম যে হ্যালোইন পৃথিবীর সুন্দরতম উৎসবগুলোর একটি। বিশেষ করে শিশুদের জন্য হ্যালোইনের মতো সৃজনশীল উৎসব আর নেই।

হ্যালোইনের পোশাক ও সাজসজ্জার কথা ধরা যাক। হ্যালোইনে শিশুরা কল্পনা ও সৃজনশীলতা দিয়ে নিজেদের নানাভাবে উপস্থাপন করে। কেউ ভূত, কেউ সুপারহিরো, কেউ সিনেমা বা কার্টুনের কোন চরিত্রের আদলে নিজেকে সাজায়। কেউ পোশাকের সাথে মিলিয়ে মুখের সাজ পাল্টায়, কেউ চুলের ধরন বদলায়, আবার কেউ ছোট ছোট খুঁটিনাটি দিয়ে নিজের ভাবনাগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করে। খাতার পাতায় আমরা যে ছবিগুলো আঁকি বা আঁকতে চাই, সেই কল্পনার জগৎই এখানে সাজপোশাক ও অবয়বের সাথে মিশে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

কয়েক বছর আগে, একবার অনেক খোঁজাখুঁজির পর আমার মেয়ের পছন্দমতো একটা হ্যালোইনের পোশাক কিনে দিয়েছিলাম; কিন্তু স্কুলের অনুষ্ঠান থেকে সে ফিরলো মন খারাপ করে। কারণটা হলো, ক্লাসের অন্য শিক্ষার্থীরা পোশাক ছাড়াও আরও অভিনব সব ধারণা দিয়ে নিজেদের অনেক বেশি সৃজনশীলভাবে উপস্থাপন করেছিল, যা আমার মেয়ে আগে ভেবে দেখেনি।

এখন মেয়ে অনেকটা বড় হয়েছে, হ্যালোইনের পোশাকে তার খুব বেশি আগ্রহ নেই। পাড়ায় ঘুরে বেড়ানোর আয়োজনেও সে আর যোগ দেয় না। এখন শুধু ছেলেকে নিয়ে মহল্লার বাড়ি বাড়ি ঘুরতে বের হই। যেসব বাড়ির সামনে হ্যালোইনের সজ্জা আছে কিংবা যেসব বাড়ির সদর দরজায় সন্ধ্যার পর আলো জ্বলে, বাচ্চারা সেসব বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ে। গৃহকর্তীকে মজার ছলে ভয় দেখিয়ে তারা ক্যান্ডি সংগ্রহ করে, আর এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়ি ঘুরে বেড়ায়।

এই আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে শিশুরা নিজেদের পরিবারের বাইরের মানুষের সাথে পরিচিত হয়। অপরিচিত মানুষের দরজায় গিয়ে কথা বলে, চাইতে শেখে ও ধন্যবাদ জানাতে শেখে। অন্যের কাছ থেকে গ্রহণ করার প্রথম অভিজ্ঞতাটা তারা এভাবে অর্জন করে। হ্যালোইনে শিশুরা এই সামাজিক শিক্ষাটা পায় যে, উৎসবের দিনে আমাদের ঘরের দরজা শুধু নিকট আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবের জন্যই খোলা থাকে না, পরিচিত-অপরিচিত সবার জন্যই খোলা থাকে। আর তারা শেখে যে, আনন্দ ভাগ করে নিতে হলে নিজের গণ্ডির বাইরের মানুষের কাছে যেতে হয়।

আমার ক্লাস ফোরে পড়া ছেলের এক বন্ধুর বাবা সকালে ফোন করে জানালেন যে, তাঁর ছেলে নাকি আমার ছেলের সাথে ট্রিক অর ট্রিটে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছে। তিনি নিজেই আজ বাচ্চাদের তদারকি করবেন। আমার জন্য এতে সুবিধা হলো; বিকেলে ছেলেকে বন্ধুর বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে ঘরে ফিরলাম।

কিন্তু আমার স্ত্রীর হ্যালোইন উপলক্ষে পরিকল্পনা ছিল। কয়েক দিন ধরে দোকান ঘুরে ঘুরে তিনি সাজসজ্জার জিনিস কিনেছেন। বাড়ির সামনে সেগুলো লাগানোর পরে মনে হয়েছিল, সাজসজ্জাটিকে আরেকটু বাড়ানোর প্রয়োজন আছে। দোকান থেকে খোদাই করা কুমড়ো, কৃত্রিম কঙ্কাল আর কাকতাড়ুয়া কিনে এনে বাড়ির সামনে সাজিয়ে দিলাম। কেনা ক্যান্ডি ও চিপসের প্যাকেটগুলো ভূতুড়ে নকশার একটি বালতিতে ঢেলে ট্রিক-অর-ট্রিটের প্রস্তুতি সম্পন্ন হলো।

সন্ধ্যা নামতেই বাচ্চারা আসতে শুরু করল। তিনি খুবই উৎসাহ নিয়ে একে একে সবাইকে ক্যান্ডি দিতে লাগলেন। কোনো কোনো বাচ্চার পোশাক, বয়স কিংবা ছোটখাটো কাণ্ডকারখানা দেখে তিনি খুবই আনন্দ পাচ্ছিলেন। তিনিও একটি ছোটখাটো সাজ পরেছিলেন। মাথায় একটি হেডব্যান্ড লাগিয়ে হরিণ বা এ জাতীয় কোনো প্রাণীর সাজ নিয়েছিলেন।

ক্যান্ডি বিলানোর ফাঁকে ফাঁকে তিনি বাচ্চাদের কাণ্ডকারখানার নানা গল্প আমাকে শোনাচ্ছিলেন। কেউ এত ছোট যে একেবারে কুটিকুটি, কেউ একটু বড়, আবার কোনো কোনো দলে বড় বাচ্চারাও এসেছে - এসব গল্প আমাকে শোনাচ্ছিলেন। আমি তখন লেখালেখিতে ব্যস্ত। কিন্তু আমার ডাক পড়ল। বললেন, "অনেকক্ষণ ধরে আমি ক্যান্ডি বিলাচ্ছি, এবার তোমার পালা।" অগত্যা ক্যান্ডি বিলানোর দায়িত্ব প্রাপ্ত হলাম।

সারা বছর আমরা যে ঘরের কোণে নিজেদের গুটিয়ে রাখি, উৎসব সেই গণ্ডি থেকে আমাদের বের করে আনে এবং বাইরের মানুষের সঙ্গে মিলিত হওয়ার সুযোগ করে দেয়। আপন-পরের বিভাজন অতিক্রম করে সমাজকে আপন করে নেওয়ার মধ্যেই উৎসবের সার্থকতা। উৎসব মানুষের মধ্যে সৌহার্দ্য জাগিয়ে তোলে এবং পারস্পরিক সংযোগ গড়ে তোলে।

যখন দেখি, একটি ধর্মান্ধ গোষ্ঠী প্রতিটি উৎসবের ক্ষেত্রেই নানা অদ্ভুত যুক্তি হাজির করে মানুষকে তাতে অংশগ্রহণ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করে, তখন তাদের এই সংকীর্ণতা উৎসবের আনন্দকেই শুধু খর্ব করে না, বরং মানুষের সহজাত প্রেম, উদারতা ও মঙ্গলবোধের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। যে উৎসব মানুষকে কাছাকাছি আনে, সেটাকেই বিভাজনের উপলক্ষ করে তোলা এই সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর অনেক সমস্যার একটি। অথচ তা উৎসবের মূল উদ্দেশ্যেরই পরিপন্থী।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা নভেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:৫৪
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আম্রকাননের আগুন

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:২১


আম্রকাননের আগুন

এপ্রিলের এক দুপুর।
বাতাসে বারুদের গন্ধ, আকাশে অনিশ্চয়তার মেঘ।
মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় আমগাছের ছায়ায় এসে দাঁড়ালেন কয়েকজন মানুষ।
দূরে চুয়াডাঙ্গা জ্বলছে, তবু এখানে শপথ।
একটি আমবাগান সেদিন হয়ে উঠল একটি দেশের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছবি ব্লগ -৮ ভগ্ন শাখা- ভগ্ন জীবন

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:২৫

জীবনের ভগ্নদশা অনেকটা এমন এক বৃক্ষের মতো, যার ডালপালা একে একে বিলুপ্ত হয়েছে।

একসময় যে শাখাগুলোতে স্বপ্ন, সম্পর্ক ও সম্ভাবনার পাতা দুলত, আজ সেখানে শূন্যতা ও নীরবতা। তবু কাণ্ডটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

/স্বাধীনতা বিরোধীদের safe home আগে ছিলো লিবিয়া আর এখন হলো তুরস্ক।

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:১২

/স্বাধীনতা বিরোধীদের safe home আগে ছিলো লিবিয়া আর এখন হলো তুরস্ক।

/শুধু তাই না, তারা খোলাখুলি ভাবেই আমাদের স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াতের সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। ৭১ এর মানবতাবিরোধী অপরাধের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাদ্রাসা ও জঙ্গী আতঙ্কের অর্থনীতিতে এক নির্বোধজীবি আত্মভোলা জাতির আয়না

লিখেছেন তানভীর রাতুল, ৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩

এক

বুদ্ধিজীবিরা নাকি জাতির বিবেক! তা সে তো ভালো কথা। কিন্তু সাধারণত যা ভালো তা যখন খারাপ তখন সাধারণত তা খুবই খারাপ। একটা জাতির সবচেয়ে মজার কিন্তু করুণতম দৃশ্য হলো তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাষ্ট্র ব্যর্থদের দায়িত্ব নেয় নাকি ব্যর্থতার সংজ্ঞাই রাষ্ট্র কর্তৃক নির্ধারিত হয়???

লিখেছেন সুব্রত দত্ত, ৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:৫৪

আমাকে যারা চেনেন অথবা আমার অন্যান্য লেখা যাদের পড়া আছে তারা জানেন আমি একজন নিহিলিস্ট। একজন নিহিলিস্ট ‘রাষ্ট্রধারণা’য় বিশ্বাসী নয়। রাষ্ট্র সম্পর্কে সে উদাসীন। আমি নিজেও রাষ্ট্র সম্পর্কে উদাসীন। কিন্তু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×