
আম্রকাননের আগুন
এপ্রিলের এক দুপুর।
বাতাসে বারুদের গন্ধ, আকাশে অনিশ্চয়তার মেঘ।
মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় আমগাছের ছায়ায় এসে দাঁড়ালেন কয়েকজন মানুষ।
দূরে চুয়াডাঙ্গা জ্বলছে, তবু এখানে শপথ।
একটি আমবাগান সেদিন হয়ে উঠল একটি দেশের প্রথম ঘর।
তার নাম হলো মুজিবনগর।
সেদিন সেখানে ছিলেন না যাঁর নামে এই শপথ,
তিনি তখন শত্রুর কারাগারে, লোহার শিকের ওপারে।
তবু প্রতিটি শব্দে ছিলেন তিনি,
প্রতিটি নিঃশ্বাসে, প্রতিটি হৃদস্পন্দনে।
অনুপস্থিত, অথচ সর্বত্র।
তিনি তো আমাদেরই মানুষ।
টুঙ্গিপাড়ার মাটিতে বেড়ে ওঠা এক গ্রামের ছেলে।
ধানের গন্ধ, নদীর স্রোত আর মায়ের ডাক ছিল তাঁর শৈশব।
সেই মানুষটিই একদিন বাঙালির বুকের কথা নিজের কণ্ঠে তুলে নিলেন।
সত্তরের নির্বাচনে মানুষ ভোট দিয়েছিল,
এক শ উনসত্তরটির মধ্যে একশ সাতষট্টিটি আসনে।
সেই রায়কে পায়ে ঠেলা হলো।
তারপর সাতই মার্চ, রেসকোর্সের খোলা আকাশের নিচে,
তিনি এমন কথা বললেন, যা প্রতিটি ঘরের মানুষ নিজের মনের কথা বলে চিনে নিল।
পুরাণে এক চরিত্র ছিলেন, প্রমিথিউস।
মানুষের হাতে আগুন তুলে দেওয়ার অপরাধে তাঁর পায়ে পড়েছিল শেকল।
আমি ভাবি, আমাদের গল্পেও এক প্রমিথিউস ছিলেন।
তিনি বাঙালির বুকে জ্বেলে দিলেন স্বাধীনতার আগুন, আত্মমর্যাদার আগুন,
আর দাম দিলেন বন্দিজীবনে, জীবনের দীর্ঘ বছরগুলো দিয়ে।
একদিন পলাশীর আমবাগানে নিভে গিয়েছিল আমাদের স্বাধীনতার সূর্য।
আজ বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে সেই সূর্য উঠবে বলে শপথ হলো।
ইতিহাস যেন নিজেই ফিরে এল সেই আমের ছায়ায়,
নিজের ভুল শুধরে নিতে।
আমাদের নেতা বন্দি হতে পারেন,
আমাদের গ্রাম পুড়তে পারে,
আমাদের মানুষ ঝরে পড়তে পারে,
তবু আমাদের স্বপ্নকে কেউ শেকল পরাতে পারবে না।
আগুন নেভেনি।
মুজিবনগর সেই আগুনকে দিল ঠিকানা, দিল নাম, দিল রাষ্ট্রের ভাষা।
তাই মুজিবনগর শুধু ইতিহাস নয়,
সে এক আগুন বাঁচিয়ে রাখার স্মৃতি।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



