somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

৫ আগস্টের সেই ভিডিও, কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন এবং ইতিহাসের নির্মম পরিণতি

৩০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


৫ আগস্টের সেই ভিডিও, কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন এবং ইতিহাসের নির্মম পরিণতি

ক্ষমতার পালাবদল হয়, কিন্তু ইতিহাসের কাঠগড়া কখনো খালি থাকে না
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নাটকীয় দিন। শেখ হাসিনার হেলিকপ্টারে আরোহণের সেই ভিডিও আজও বহু মানুষের মনে নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়। ভিডিওটি কীভাবে ধারণ করা হয়েছিল? ক্যামেরাটি কার হাতে ছিল? এর পেছনে কি কেবল একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত ধারণের উদ্দেশ্য ছিল, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও কোনো অজানা ঘটনা?

ভিডিওটি যদি সাধারণ মোবাইল ফোনে ধারণ করা না হয়ে থাকে, তবে এর উৎস, ধারণপদ্ধতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে। বিশেষ কোনো অস্ত্রের ক্যামেরা ব্যবহারের যে দাবি আলোচনায় এসেছে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে।

তবে প্রশ্ন তোলা আর অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়। সত্য উদ্‌ঘাটনের জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রযুক্তিগত প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকার স্বচ্ছ অনুসন্ধান।

প্রশ্ন হলো, সেই দিনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কি যথাযথভাবে অনুসন্ধান করা হয়েছে? নাকি ক্ষমতার পালাবদলের ডামাডোলে কিছু প্রশ্ন উত্তরহীন থেকে গেছে?

যদি সত্যিই কাউকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর পরিকল্পনা থেকে থাকে, তবে সেই পরিকল্পনার পেছনে কারা ছিল, উদ্দেশ্য কী ছিল এবং কারা তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছি- এসব প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করা জরুরি। আর যদি এমন কোনো পরিকল্পনার অস্তিত্ব না থাকে, তাহলে অপপ্রচার ও ভিত্তিহীন সন্দেহের অবসান ঘটানোও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

একটি ভিডিওর উৎস কিংবা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তির মৃত্যু- কোনোটিকেই এককভাবে কোনো ষড়যন্ত্রের প্রমাণ হিসেবে ধরে নেওয়া যায় না। কিন্তু কোনো ঘটনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠলে তার উত্তর দেওয়ার দায়িত্বও এড়িয়ে যাওয়া যায় না।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব সত্যকে আড়াল করা নয়; সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করা।

ক্ষমতার রাজনীতি ও ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা
ইতিহাসের পাতা খুললে আমরা দেখি, ক্ষমতার দ্বন্দ্বে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, বিশ্বাসঘাতকতা ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বহুবার মানুষের জীবনকে বিপন্ন করেছে। কারবালার প্রান্তর, পলাশীর যুদ্ধক্ষেত্র কিংবা ১৯৭১ সালের রণাঙ্গন- প্রতিটি ঘটনাই নিজস্ব ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে আমাদের সামনে ত্যাগ, নিষ্ঠুরতা ও ক্ষমতার পরিণতির ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা তুলে ধরে।

কারবালায় ইমাম হোসাইনের আত্মত্যাগ, পলাশীর পতনের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতা হারানোর ইতিহাস এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ- এসব স্মৃতি আজও মানুষের আবেগ, চেতনা ও ঐতিহাসিক উপলব্ধির অংশ।

ইতিহাসের চরিত্রদের মূল্যায়ন সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে। কিন্তু একটি বিষয় বারবার সামনে আসে: ক্ষমতা অর্জন করাই ইতিহাসে সম্মান অর্জনের নিশ্চয়তা নয়। মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও আত্মত্যাগের প্রশ্নে শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের মূল্যায়ন নির্ভর করে কাজের ওপর।

মীরজাফর, ইয়াহিয়া খান কিংবা খন্দকার মোশতাক আহমদের নাম বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে নেতিবাচক তাৎপর্য বহন করে, তা নিছক ব্যক্তিগত বিরাগের ফল নয়; এর পেছনে রয়েছে ঐতিহাসিক ঘটনা, রাজনৈতিক ভূমিকা ও জনস্মৃতির দীর্ঘ প্রক্রিয়া, আরো যুক্ত হতে পারে ৫ আগসে্টর কুশীলবরাও।

ইতিহাস কাউকে চিরকাল ক্ষমতাবান রাখে না। আবার ক্ষমতাহীন হলেই কেউ ইতিহাসের চোখে অপরাধী হয়ে যায় না। ইতিহাসের প্রকৃত বিচার নির্ভর করে প্রমাণ, দায়িত্ব ও কর্মের ওপর।

আজকের বাংলাদেশও ইতিহাসের বাইরে নয়

আজ যারা ক্ষমতার কাছাকাছি, যারা ক্ষমতার ছায়ায় নিজেদের অপরাজেয় মনে করছেন, যারা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করাকে বিজয় বলে ভাবছেন- তাদের সবারই মনে রাখা উচিত, রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, সময় পরিবর্তন হয় তেমনি আপনিও পরিবর্তন হবেন, যেমন হয়েছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী। আপনার হাতে আজ যে লাঠি রয়েছে আগামীদিন আপনার প্রতিপক্ষের হাতে থাকবে, অতএব সাধু সাবধান।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অপমান করা, প্রতিহিংসার শিকার বানানো কিংবা বিচার ছাড়াই অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা কোনো সভ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় হতে পারে না। একইভাবে, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় তাকে অপরাধের ঊর্ধ্বে রাখার অধিকারও দেয় না।

অপরাধের বিচার হতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে। নিরপরাধের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে আইনের মাধ্যমে। আর রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি থাকতে হবে জনগণের কাছে, আজ সেটা কোথায়?

যারা আজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলছেন, তাদেরও মনে রাখতে হবে- ন্যায়বিচারের দাবি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সেই দাবি নিজের রাজনৈতিক পক্ষের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য হয়।

অন্যায়ের বিচার চাইতে গিয়ে আরেকটি অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া যায় না। প্রতিশোধ কখনো ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না।

শেষ কথা: ইতিহাসের কাঠগড়ায় সবাইকেই দাঁড়াতে হয়

৫ আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে যদি কোনো অমীমাংসিত প্রশ্ন থেকে থাকে, তার উত্তর খুঁজে বের করা হোক। ভিডিওটির উৎস, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা- সবকিছুই নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের আওতায় আসুক।

কেউ যদি অপরাধ করে থাকে, তার পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থান যা-ই হোক, তাকে আইনের মুখোমুখি হতে হবে। আর কেউ যদি নির্দোষ হন, তবে রাজনৈতিক বিদ্বেষের কারণে তাকে অপরাধী বানানোর অধিকার কারও নেই, আর এখন তাই হচ্ছে।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে ক্ষমতাবানদের অপরাধও বিচারের আওতায় আসবে, বিরোধীদের অধিকারও সুরক্ষিত থাকবে এবং সত্য প্রকাশের জন্য কাউকে ভয় পেতে হবে না।

কারণ ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, রাজনৈতিক আনুগত্য পরিবর্তনশীল, আর জনমতও সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি টিকে থাকে ন্যায়বিচার, সত্য এবং মানুষের অধিকারের ওপর।

ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা এখানেই- আজ যে অন্যায়ের বিচার চাইছে, কাল তার হাতেই যেন নতুন অন্যায়ের জন্ম না হয়।

সত্যকে চাপা দেওয়া যায়, কিন্তু সত্যের অনুসন্ধানকে চিরকাল থামিয়ে রাখা যায় না। আর ইতিহাসের বিচারে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে না কার হাতে কত ক্ষমতা ছিল; টিকে থাকে কে ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়িয়েছিল, কে অন্যায় করেছিল এবং কে সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করার সাহস দেখিয়েছিল।

ইতিহাসের চূড়ান্ত রায় কোনো ব্যক্তি, দল কিংবা সরকারের একার হাতে লেখা হয় না। সেই রায় গড়ে ওঠে ঘটনা, প্রমাণ, মানুষের অভিজ্ঞতা এবং সময়ের নিরপেক্ষ মূল্যায়নে।

সত্যের জয় হোক। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হোক। বাংলাদেশের মানুষ আর কখনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বলি না হোক।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৪৪
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অনন্ত সেই ভালবাসার স্রোত

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৭:৫৬

অনন্ত সেই ভালবাসার স্রোত



সময় চলেছে তার আপন খেয়ালে,
নদীর স্রোতেরা হারায় কালের বুকে;
আমি শুধু এক অনন্তকাল ধরে,
ডুবে আছি প্রিয়, তোমার চাওয়া পাওয়ার ওই সুখে।

বাহিরের সব নিয়ম চলুক তার মতো,
মহাবিশ্ব... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ের অবস্থা নিয়ে আলাদা গুরুত্ব দেয়া দরকার

লিখেছেন অপলক , ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৪৫



পাহাড়ীদের হাতে এখন প্রচুর টাকা। সে টাকার যোগান প্রত্যাক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে আমরা সমতলের জনগন দিয়েছি। পাহাড়ীরা এখন জাতীয় অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখছে। তাদের মাঝে প্রচুর উচ্চ শিক্ষিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

চলার পথে ক্ষণিক দেখা – (১১)

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:০২

পূর্বের পোস্টঃ ক্ষণিকের দেখা, মায়াময় এ ভুবনে -১০


অবশেষে আমার কিছু কথা শুনে ওরা হাসিতে ফেটে পড়লো। সবার মুখে ছিল উজ্জ্বল হাসি।

আজ দুপুরে একটি এলাকার মাসজিদ সংলগ্ন পুকুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ২০২

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০২



আমাদের চারপাশে অনেক কিছু আছে।
যা আমরা দেখতে পাই না। ব্যাকটেরিযয়া, ভাইরাস, ডার্ক ম্যাটার, অণু ও পরমাণুর কথা বলছি না। আমি বলছি, মৃত মানুষের কথা। প্রতিদিন বিশ্বে গড়ে দেড়... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রধানমন্ত্রী বিদেশে, আইনও কি সঙ্গে নিয়ে গেছেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩০ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০৬


প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফরে গেলেই দেশ অশান্ত হয়ে ওঠে । সালাহউদ্দিন আহমেদের মতো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে কেন? প্রধানমন্ত্রী দেশের বাইরে থাকলেই কিছু নেতাকর্মী যেন নিজেদের দেশের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×