
আমাদের চারপাশে অনেক কিছু আছে।
যা আমরা দেখতে পাই না। ব্যাকটেরিযয়া, ভাইরাস, ডার্ক ম্যাটার, অণু ও পরমাণুর কথা বলছি না। আমি বলছি, মৃত মানুষের কথা। প্রতিদিন বিশ্বে গড়ে দেড় লাখ মানুষ মারা যায়। এই মৃত মানুষেরা আমাদের আশেপাশেই থাকেন। খালি চোখে তাদের দেখা যায় না। কিন্তু কেউ তীব্র ভাবে চাইলে তাদের দেখা সম্ভব। কেউ যদি তীব্র ভাবে ভূত দেখতে চায়, তাহলে সে ভূতও দেখতে পাবে। এক কিশোরী মেয়ে দিনের পর দিন চিন্তা করে তার ঘরে খাটের নিচে একটা ভূত আছে। একদিন সে ঠিকই তার ঘরে খাটের নিচে ভূত দেখতে পায়। অথচ ভূত বলতে দুনিয়াতে কিছু নাই। আব্বা মরে গেছে অনেকদিন হয়ে গেছে। অথচ ইদানিং আব্বাকে খুব বেশি মনে পড়ছে। সেদিন শরীরটা খারাপ লাগছিলো। হয়তো প্রেসার লো হয়ে গিয়েছিলো। কেমন তন্দ্রা ভাব এসেছিলো। বিছানায় শুয়ে থাকলাম। কিন্তু ঘুম আসে না। ঘুম এবং জাগরণের মাঝামাঝি অবস্থা। সন্ধ্যায় বিছানা থেকে নেমে সুরভিকে বললাম, চা দাও। সুরভি বলল- দুপুরে না খেয়ে ঘুমাচ্ছো। এখন ভর সন্ধ্যা বেলা চা খাবে! সুরভি চা দিলো। পাশের ঘরে ফারাজাকে পড়াচ্ছে সুরভি। আমি চায়ের মগ হাতে নিয়ে বসে আছি। চায়ে চুমুক দিতে ইচ্ছা করছে না। হঠাত মনে হলো- এই ঘরে আব্বা আছে। আমার পাশেই চুপ করে বসে আছে।
রাতে ঘুম আসার আগে সময়টুকু আমি আব্বার কথা ভাবি।
ছোটবেলার একটা ঘটনা। তখন আমি ছোট। স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে। আমি সব বিষয়ে ফেল করেছি। স্কুলে আমাকে নিয়ে হায় হায় পড়ে গেছে। এবং সে বছর স্কুলে সব ছাত্রছাত্রীর মধ্যে শুধু আমি একাই ফেল করেছি। প্রিন্সিপাল স্যার আমাকে ডেকে তার রুমে নিয়ে গেছেন। উনি রাগে ফুঁসছেন। তার চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে! আসলে আমি এমন ভাবে ফেল করেছি, স্কুলের ইতিহাসে এরকম ফেল আর কোনো ছাত্রছাত্রী করেনি। প্রিন্সিপালের রুমে অন্যান্য স্যার ম্যাডামও ছুটে এসেছেন। একেক জন একেক রকম কথা বলছেন। আমার ক্লাশ শিক্ষক বললেন, আমি নাকি পুরো স্কুলের বদনাম করে ফেলেছি। মান সম্মান সব শেষ করে দিয়েছি। যাইহোক আব্বাকে ফোন করা হলো। আমাদের সময় রাগী পিতা'রা ছেলে ফেল করলে- মারতো। দরজা বন্ধ করে মারতো। কঠিন মাইর। ফেল করলে কেউ বাড়ি ফিরতে চাইতো না। বাড়িতে গেলেই বাপ মারবে। কেউ বাঁচাতে পারবে না।
কিছুক্ষনের মধ্যে স্কুলে আব্বা চলে এলো।
এসেই আমাকে কোলে নিলো। শিক্ষকরা কিছু বলার আগেই আব্বা বলল, আমার ছেলেকে আমি এই স্কুলে রাখবো না। নো নেভার। একটা বাচ্চা ছেলের সাথে আপনার এরকম আচরণ করছেন!! ফেল করেছে তো কি হয়েছে! মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে? আব্বা আমাকে কোলে করে বাসায় নিয়ে এলেন। বাসায় আনার আগে এক রেস্টুরেন্টে নিয়ে গেলেন। তেহারি আর কোক খাওয়ালেন। রিকশা করে বাসায় ফিরলাম। আব্বা শুধু বলল, ফেল কেন করবি? পাশ করা কোনো কঠিন কিছু না। একটু চেষ্টা করলেই সম্ভব। সামান্য পড়াশোনা করলেও পাশ করা সম্ভব। এরপর আমি বাকি জীবনে আর কোনো দিন ফেল করিনি। অতি সামান্য পড়াশোনা করেও পাশ করে গেছি। পড়াশোনা করতে গিয়ে দেখি মজা আছে। যত পড়ি তত মজা লাগে। পাটি গনিত, বীজ গনিত, ত্রিকোনোমিতি, পরিমিতি এমনকি জ্যামিতি- কিছুই কঠিন মনে হয় না। বরং আনন্দ পাই। ইংরেজিতে আনন্দ পাই। আসলে নতুন কিছু জানার মধ্যে অনেক আনন্দ আছে। এ জার্নি বাই ট্রেন মূখস্ত করে ফেললাম। এ জার্নি বাই ট্রেন মূখস্ত করার কারণে, এ জার্নি বাই বোট আর পড়ার প্রয়োজন হলো না।
হুট করে যখন মনে পড়ে আব্বা বেঁচে নেই-
তখন আমি খুব অসহায় হয়ে পড়ি। দম বন্ধ হয়ে আসে। নিজেকে নিজে শান্ত করি। আমি ফিরে যাই অতীতে। যখন আব্বা বেঁচে ছিলো। সময়টা ঝলমলে ছিলো। মনে পড়ে একদিন আব্বা আমকে নিয়ে বাইরে বের হলো। রিকশা করে যাচ্ছি নিউ মার্কেট। আব্বা আমাকে নতুন জামা কাপড় কিনে দিবে। কারণ কলেজে উঠেছি। আব্বা রিকশা থেকে নেমে বলল, চল আগে চা খাই। চা খেতে খেতে আব্বা বলল, ছেলেমেয়ে একসাথে পড়বি। নতুন বন্ধু তৈরি হবে। তবে কারো সাথে খারাপ ব্যবহার করিস না। কেউ যেন, বিশেষ করে মেয়েরা যেন তোর ব্যবহারে কষ্ট না পায়। মেয়েদের সাথে সহজ সরল সুন্দর আচরন করবি। জামা কাপড় কেনা শেষে আমি বললাম, আব্বা তুমি বাসায় যাও। আমার ফিরতে দেরি হবে। আমি এক বন্ধুর বাসায় যাবো। আব্বা বলল, চল তোর বন্ধুর বাসায় আমি তোকে এগিয়ে দিয়ে আসি। আব্বার সাথে আমার কোথাও যেতে ইচ্ছা করে না। আমাকে সে হাত ধরে রাস্তা পার করে দেয়। সেলুনে নিয়ে নিজের পছন্দ মতো চুল কাটায়। রাস্তায় দেখা হলে বলে, চুল এলোমেলো কেন? জামায় ময়লা কেন? জুতোও ময়লা!
বইমেলা হলেই আব্বা বলতো-
আমি তো যেতে পারিব না। ভীষন ব্যস্ত আমি। আমার সময় নেই। তুই যা। পছন্দের বই গুলো কিনে নিয়ে আয়, আমি টাকা দিচ্ছি। আমি বইমেলায় যাই। পছন্দের বই গুলো কিনি। আমার কন্যা আছে। ফারাজা। সে আমাকে সময় দেয় না। তাকে আমি পাই-ই না। মাঝে মাঝে ফোন করি। সে মোবাইলে কথা বলবে না। একদিন আমি সামান্য রেগে গিয়ে সুরভিকে বললাম- একজন বাবা তার মেয়েকে ফোণ করবে, আর মেয়ে ফোনে কথা বলবে না! এটা কেমন মেয়ে? সুরভি বলে, মেয়ের সাথে রাগ করার কি আছে? মেয়ে অনেক ছোট। বড় হোক। সেদিনই মেয়ে হোয়াটসঅ্যাপে ভয়েস ম্যাসেজ পাঠালো- বাবা, আমি যখন ব্যস্ত থাকি, তখনই তুমি আমাকে ফোণ করো। এমন সময় ফোন করবে, যখন আমি ব্যস্ত থাকবো না। কন্যার ম্যাসেজ পেয়ে মনে মনে ভাবি, মেয়ে কখন ফ্রি থাকবে? রাতে আমি দেরিতে বাসায় ফিরি। বাসায় ফিরে দেখি মেয়ে গভীর ঘুমে। সকালে আমিও ব্যস্ত, মেয়েও ব্যস্ত। আমি কাজে যাবো, মেয়ে স্কুলে যাবে। কথা বার্তা হয় না। অনেকদিন ধরে ভাবছি আমি আর কন্যা একটা মুভি দেখব। মুভির নাম- Piku। চমৎকার গল্প। চমৎকার অভিনয়।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




