
অবশেষে আমার কিছু কথা শুনে ওরা হাসিতে ফেটে পড়লো। সবার মুখে ছিল উজ্জ্বল হাসি।
আজ দুপুরে একটি এলাকার মাসজিদ সংলগ্ন পুকুর পাড় ধরে হাঁটছিলাম। সপ্তাহে শুধু জুম্মার দিনই ভিক্ষুকদের মাসজিদের আশেপাশে ভিড়ার সুযোগ দেয়া হয়, তাও কেবলমাত্র জুম্মার নামায শেষ হবার পর এবং কেবল কয়েকটি নির্দিষ্ট জায়গায়। বাকি দিনগুলোতে ভিক্ষুকের প্রবেশ ও যাতায়াত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সপ্তাহে মাত্র একটি দিন ভিক্ষা চাওয়ার সুযোগ থাকাতে ঐ দিনটিতে ভিক্ষুকদের প্রচুর সমাবেশ হয়। পুরুষ ভিক্ষুকের চেয়ে নারী ভিক্ষুকের সংখ্যা প্রায় তিন-চার গুণ বেশি থাকে। নারী ভিক্ষুকেরা আবার তাদের সাথে দুই একজন করে বাচ্চা (নিজেদের অথবা অপরের) নিয়ে এসে তাদেরকে ভিক্ষার লাইনে দাঁড় করিয়ে দেয়। কিন্তু বাচ্চারা তো বাচ্চাই। তারা কিছুক্ষণ মুসল্লীদের পেছনে পেছনে হাত পেতে সুর করে ভিক্ষা চাইতে চাইতে একসময় রণে ভঙ্গ দিয়ে সুযোগ খুঁজতে থাকে কি করে সিকিউরিটি গার্ডের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিছুটা সময় পুকুর পাড়ের দোলনায় বসে মনের সুখে দোল খেতে পারে।
পুকুরের পূর্ব পাড় দিয়ে হেঁটে যাবার সময় আমি একটা দোলনায় পাঁচজন শিশুকে একসাথে বসে দোল খেতে দেখলাম। ওদের চেয়ে বয়সে একটু বড় অপর একটা মেয়ে পেছন থেকে ওদেরকে দোল দিচ্ছিল। এ সময়টা ওরা বেছে নিয়েছিল কারণ এ সময়টাতে অন্যান্য কর্তব্য পালনে ব্যস্ত থাকার কারণে সিকিউরিটি গার্ডদের এ দিকটাতে নজর দেয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। ওদেরকে দেখে আমি ওদের দিকে এগিয়ে গেলাম। আমাকে দেখে ওরা খানিকটা ভড়কে গেল, কিছুটা অজানা ভয়ে আর কিছুটা দোলনার সুখ থেকে বঞ্চিত হবার আশঙ্কায়। আমার চেহারা দেখে ওরা অনুমান করার চেষ্টা করলো, আমি ওদের friend না foe। আমি ওদের সাথে গল্প জুড়ে দিলাম। আমার কথা শুনে ওরা আস্থা ফিরে পেতে শুরু করলো এবং একে অপরের সাথে মুখ চাওয়া চাওয়ি করে যাচাই করে নিচ্ছিল আমি নির্ভরযোগ্য কিনা। এক সময় অঙ্গভঙ্গিসহ আমার কিছু কথা শুনে ওরা হাসিতে ফেটে পড়লো।
শিশুদের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা অসাধারণ। এক সময় ওরা লক্ষ্য করলো যে দূর থেকে একজন বয়স্ক ভদ্রলোক এগিয়ে আসছেন। ওরা আমাকে বললো, “স্যার, আপনি থাইকেন, যাইবেন না কিন্তু। আমরা ঐ নানার কাছ থিকা ভিক্ষা লইয়া আসি”। আমি বললাম, “তোমরা তো ছোট, তোমাদেরকে কেউ ভিক্ষা দেবে না”। তখন ওরা বললো, “না স্যার। বুড়া মানুষেরা দেয়। নানু দাদুরা দেয়, ভাইয়া আপুরাও দেয় কেউ কেউ। কিন্তু আঙ্কেল আন্টিরা কেউ দিতে চায় না”। দেখলাম, ওরা হাত পাতার সাথে সাথে সেই বয়স্ক ভদ্রলোক ওদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে দশ টাকার নোট গুঁজে দিলেন। টাকা পেয়ে খুশি হয়ে ওরা আবার দৌড়ে এসে দোলনায় চেপে বসে নতুন কিছু শোনার জন্য আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। ওদের পাঁচজনের মধ্যে একজন আর্জেন্টাইন সমর্থক ছিল। সে আর্জে্নটিনা ফুটবল দলের জার্সি'র রেপ্লিকা পরিহিত ছিল। তার চুল এবং পোষাক অন্যদের তুলনায় বেশ পরিপাটি ছিল। সব শিশুদের মধ্যে সে-ই ছিল সবচেয়ে বেশি সপ্রতিভ ও প্রাণবন্ত। এর কিছুক্ষণ পর কয়েকজনের মা এসে ওদেরকে বললো, “গার্ড আসতাছে, চল বাড়ি যাই”। মুহূর্তের মধ্যে এক দৌড়ে ওরা সবাই চোখের আড়ালে চলে গেল!
ঢাকা
১৬ অক্টোবর ২০২৬
শব্দ সংখ্যাঃ ৪৩৮

আমার কথা শুনতে শুনতে হয়তো তাদের ভয় কিছুটা কেটে যাচ্ছিল। ছবিতে তাদের অভিব্যক্তি দেখে সেরকমই মনে হচ্ছে। নতমুখ দু'জনের মধ্যে একজন মাথা তুলে তাকালো, তৃৃতীয় একজনের মুখে একটু হাসির রেখাও দেখা দিল।
ঢাকা
১৬ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১৪ঃ০৯

ওদের মধ্যে যে ছিল সবার বড়, সে পেছনে দাঁড়িয়ে ওদের দোলনাটা ঠেলছিল। ওরা পেছন ফিরে তার মুখের অভিব্যক্তি পাঠ করে আস্থা অর্জনের চেষ্টা করছিল। ওদের মধ্যে একজন আর্জেন্টাইন সমর্থকও ছিল। তার মুখের অভিব্যক্তিই সবচেয়ে স্পষ্ট ছিল। সে হা করে আমার কথা শুনছিল।
ঢাকা
১৬ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১৪ঃ০৯

ওরা নিজেদের মধ্যে কিছু শলা পরামর্শও সেরে নিচ্ছিল।
ঢাকা
১৬ অক্টোবর ২০২৬

সেই আর্জেন্টাইন সমর্থকের হাসিটা ছিল একেবারে প্রাণখোলা। আমার মনে হয়, আমার কথাগুলো সে-ই সবচেয়ে বেশি উপভোগ করেছে।
ঢাকা
১৬ অক্টোবর ২০২৬

শিশুহীন, শূন্য দোলনা!
চোখের তারায় যাদের আলোর ঝিলিক, হাসিতে যাদের প্রাণের বন্যা, তাদের কারণে প্রাণহীন দোলনাটাকেও প্রাণবন্ত মনে হয়েছিল। ওরা চলে যাওয়াতে দোলনাটাও প্রাণহীন, স্থবির হয়ে গেল!
ঢাকা
১৬ অক্টোবর ২০২৬
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




