
হাসিনা-বিভ্রাট: এটা ট্রল নয়, কূটনৈতিক সতর্কসংকেত
জাপানের এক প্রভাবশালী সংসদ সদস্যের একটি পোস্ট নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে হাসাহাসি চলছে। আমার মনে হয়, হাসির আড়ালে আসল প্রশ্নটা চাপা পড়ে যাচ্ছে।
ঘটনাটা কী
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপানে সরকারি কর্মসফরে আছেন। সফরে জাপানের ক্ষমতাসীন দল এলডিপির সংসদ সদস্য ও সাবেক শিল্পমন্ত্রী নিশিমুরা ইয়াসুতোশি তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। নিশিমুরা সাধারণ কেউ নন। ২০২৬ সালে তিনি এলডিপির নির্বাচনী কৌশল কমিটির চেয়ারপারসন হয়েছেন। তাঁর নিজের পোস্ট অনুযায়ী তিনি জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় বন্ধুত্ব লিগের সাধারণ সম্পাদকও।
সাক্ষাতের পর নিজের ভেরিফাইড এক্স অ্যাকাউন্টে তিনি লেখেন, বাংলাদেশের "প্রধানমন্ত্রী হাসিনা"র সঙ্গে দেখা হয়েছে। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী নাই অনেক দিন হলো (প্রায় আড়াই বছর)। কাজেই এটাকে নিছক জিভ ফসকানো বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন।
কেন বিষয়টা গুরুতর
১. কূটনীতিতে নাম আর পদবি পাথরে খোদাই করা তথ্য।
বন্ধুত্ব লিগের সাধারণ সম্পাদক, যাঁর দায়িত্বই দুই দেশের সম্পর্ক দেখা, তিনি সরকারপ্রধানের নাম ভুল লিখলে বুঝতে হবে তথ্য-সরবরাহের কোথাও ফাঁক ছিল। এসব সাক্ষাতের আগে সাধারণত প্রোটোকল ও দূতাবাসের ব্রিফিং নোট তৈরি হয়। সেই ব্রিফিং হয় হয়নি, নয়তো পৌঁছায়নি, নয়তো কেউ মন দেয়নি।কিংবা প্রয়োজন মনে করেননি।
২. দায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও দূতাবাসের।
এক্স পোস্ট দূতাবাস লেখে না, সত্যি। কিন্তু সাক্ষাতের প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের দায়িত্ব মন্ত্রণালয় এবং টোকিওর বাংলাদেশ দূতাবাসের। ভুলটা যেখানেই হোক, জবাবদিহি তাদের।
৩. সময়টা সন্দেহজনক।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের ঠিক আগে টোকিওর রাষ্ট্রদূত মো. দাঊদ আলীকে ঢাকায় ফেরানো এবং সফরকালে টোকিও থেকে দূরে রাখা হলো। তাঁর বদলে সফরের কূটনৈতিক বিষয় তদারকি ও সার্বিক আয়োজন সমন্বয়ের বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে মন্ত্রণালয়ের দ্বিপাক্ষিক বিষয়ক সচিবকে টোকিও পাঠানো হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত নিতে হলে সমস্যা আগেই জানা ছিল। তাহলে সফরের আগে এত দেরি কেন? আগে ব্যবস্থা নিলে নতুন দায়িত্বশীলরা গুছিয়ে নেওয়ার সময় পেতেন। শেষ মুহূর্তের রদবদলে সমন্বয়ের ফাঁক তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক।
৪. অভিযোগ সত্য হলে প্রশ্ন আরও বড়।
রাষ্ট্রদূতের বিরুদ্ধে জামায়াত-সংশ্লিষ্টতার যে অভিযোগ আলোচনায় এসেছে, সরকারিভাবে তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা জনসমক্ষে আমার চোখে পড়েনি। মে মাসে জামায়াত আমিরের সঙ্গে জাপানে বাংলাদেশ দূতাবাসের মতবিনিময় সভায় রাষ্ট্রদূত উপস্থিত ছিলেন বলে একটি সংবাদে এসেছে। সেটাই কি কারণ, নাকি অন্য কিছু? আপত্তি থাকলে সেই মে মাসেই কেন পদক্ষেপ হলো না? পাঁচ মাস পর, সফরের দোরগোড়ায় কেন?
আসল প্রশ্নগুলো
** ভুলটা কোথায় হলো: মন্ত্রণালয়ের ব্রিফিংয়ে, দূতাবাসের সমন্বয়ে, নাকি জাপানি পক্ষের নিজস্ব নথিতে?
** রাষ্ট্রদূতকে সরানোর সিদ্ধান্ত এত দেরিতে কেন, আর তার কারণ জাতিকে স্পষ্ট করে জানানো হচ্ছে না কেন?
** সফরের মতো গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কি আদৌ একটি সমন্বিত পরিকল্পনায় চলছে?
বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ক সাধারণ নয়। জাপান আমাদের শীর্ষ উন্নয়ন-সহযোগীদের একটি, আর এখন সম্পর্ক ঋণ-সহায়তা থেকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও কৌশলগত অংশীদারত্বের দিকে এগোচ্ছে। এমন সময়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রথম সরকারি জাপান সফর ঘিরে এই বিড়ম্বনা অপ্রয়োজনীয় ক্ষতি।
শেষ কথা
কবি শামসুর রাহমান এর "অদ্ভুত উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ আমার" পঙ্ক্তিটা মনে পড়ছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কি সেই উটের পিঠেই সওয়ার? ট্রল হোক, মিম হোক, হাসি থামলে প্রশ্নটা থেকে যায়। সরকারের উচিত দ্রুত জানানো, কী ঘটেছিল, কার ভুল ছিল এবং ভবিষ্যতে এমন যাতে না হয় তার জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জবাবদিহিহীন নীরবতাই সবচেয়ে বড় অযোগ্যতার প্রমাণ। এভাবে চলতে থাকলে আরো বড় ভুলের জন্য অপেক্ষা করুন, আর মনে রাখুন এ ভাবে ভুল করবে রাষ্ট খেসারত দিবে মানুষ।।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


