
পাহাড়ীদের হাতে এখন প্রচুর টাকা। সে টাকার যোগান প্রত্যাক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে আমরা সমতলের জনগন দিয়েছি। পাহাড়ীরা এখন জাতীয় অর্থনীতিতে বিশাল ভূমিকা রাখছে। তাদের মাঝে প্রচুর উচ্চ শিক্ষিত এবং সরকারী উচ্চ পদমর্যাদার মানুষ রয়েছে।
এসবের সাথে যুক্ত হয়েছে, ভারতের আগ্রাসী মহাপরিকল্পনা। যেটা আমাদের চৌকস দেশ প্রেমিক মেজর জিয়া এবং রাষ্ট্রপতি এরশাদ বহু আগেই ধরেছিলেন কিন্তু নিয়েছিলেন একটা ভুল সিদ্ধান্ত। যার একটি অংশ হিসেবে গুচ্ছগ্রামের অছিলায় সমতলের মানুষদের এক জায়গায় করা হয়েছিল। তাদের চিন্তা ছিল, পাহাড়ী বাঙ্গালী আলাদা পরিমন্ডলে থাকলে নিজেদের দাঙ্গা হাঙ্গামা কমবে। কিন্তু সেটা খুব একটা সফল হয়নি, প্রতিবেশীর রাষ্ট্রের চালে এবং এদেশে ঘনঘন সরকার পরিবর্তনের কারনে। উল্টো, পাহাড়ীদের নিজেদের ভেতরেও হাঙ্গামা বেড়েছে।
অন্যদিকে খালেদা জিয়ার সাথে ভারতের দহরম মহরম কম ছিল। অন্তত, জাতির পিতা বা বুবুর মত অত গভীর ছিল না। স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত, পাহাড়ীরা অভাব পেরিয়ে যতই স্বনির্ভর হতে থাকলো, ততই তাদের হাতে অস্ত্র চলে আসতে থাকলো। হাসিনা বুবু পাহাড়ীদের কাছ থেকে কৌশলে অস্ত্র সংগ্রহ করে করেছিল ১৯৯৭ সালে, ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি বা "পার্বত্য শান্তি চুক্তি"র অধীনে। যেটা ছিল লোক দেখানো, অধিকাংশ পুরোন অচল অস্ত্র সংগ্রহ। সেসময় ভারত কিন্তু খুব একটা অসন্তুষ্ট হয়নি। কারন ততদিনে পাহাড়ে আধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছিল। আবার সেই চুক্তির কিছু দুর্বলতাও ছিল। তারপর থেকে সন্তু লারমা কত টাকার মালিক বনেছেন, তার হিসাব হয়ত তিনি নিজেই জানেন না। আমার ধারনা আমাদের পলাতক সাবেগ ভূমি মন্ত্রির চেয়ে কম কিছু না।
বর্তমানে পাহাড়ীদের মধ্যে যারা নিতান্তই সাধারন মানুষ, তারা পরেছেন দো টানায়। পাহাড়ী জঙ্গী বাহিনীর চাঁদা এখন তাদের গলার কাটা। যে বাহিনী বেশি ভয়ঙ্কর রুপ প্রদর্শন করে, তারাই সেখানকার প্রভাব বিস্তারের অধিকারী, মানে চাঁদা উত্তোলন কারী। বর্তমানে দুটো আগ্রাসী বাহিনীর রেশারেশিতে অনেকেই মারা পড়ছে, বসত ভিটা ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে, কাউকে কাউকে জোর করে জঙ্গি হামলার প্রশিক্ষণ দিচ্ছে, এমনকি নারীদের তুলে নিয়ে যাওয়ার বহু ঘটনাও আছে। আমরা সমতলে শিশু বা নারী ধর্ষনের ব্যপার নিয়ে ঘটনা ভাইরাল করি। বউ থাকতে শালি কে বিয়ে করার ঘটনা ভাইরাল করি। কিন্তু পাহাড়ের একটা ঘটনাও মিডিয়ায় আসে না। ব্যাপারটা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। এই যে, সাজেকে পাহাড়ীরা অযথা আন্দোলন করছে, সেটা আসলে ঐ দুটো বাহিনীর ভয়ে।
ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, পাহাড়ী এলাকায় (পার্বত্য চট্টগ্রামে) গুচ্ছগ্রাম ব্যবস্থার সূত্রপাত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়ার পেছনে মূল ভূমিকা ছিল মূলত দুটি সরকারের:
১. প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আমল (১৯৭৯-১৯৮১): পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি বাহিনীর সশস্ত্র তৎপরতা মোকাবেলা এবং জনসংখ্যার ভারসাম্য আনার উদ্দেশ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভূমিহীন ও নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত বাঙালি পরিবারগুলোকে পাহাড়ে নিয়ে আসা শুরু হয়। সে সময় পুনর্বাসিত এই সাধারণ বাঙালিদের নিরাপত্তা ও নির্দিষ্ট জায়গায় রাখার জন্য প্রাথমিকভাবে পাহাড়ি এলাকায় গুচ্ছগ্রাম বা ক্লাস্টার ভিলেজ ব্যবস্থার সূচনা করা হয়।
২. প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের আমল (১৯৮৮): পরবর্তী সময়ে ১৯৮৮ সালের দিকে এরশাদ সরকারের আমলে নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণে এই প্রক্রিয়াকে আরও জোরদার ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়। পাহাড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাঙালি সেটেলারদের একত্রিত করে রাস্তার দুই পাশে বড় বড় গুচ্ছগ্রামে আবদ্ধ করা হয়। একই সঙ্গে শান্তি বাহিনীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে অনেক স্থানীয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর (পাহাড়ি) মানুষকেও কৌশলগত কারণে সরকারিভাবে গুচ্ছগ্রাম বা "শান্তিগ্রাম"-এ স্থানান্তর করা হয়েছিল।
যাইহোক সরকারের উচিত সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া পাহাড়ের সমস্যা সমাধানে। নয়ত অদূর ভবিষ্যতে আমরা পার্বত্য চট্রগ্রাম হারাতেও পারি। পাহাড়ে শান্তি আনোয়নের ব্যপারে আমার মাথায় কিছু কথা খেলছে। যেমন:
১. ঐ সব অঞ্চলে নতুন করে অন্তত আরও ২০টি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বিজিবি, আনসার ও পুলিশ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র খোলা দরকার।
২. শান্তি চুক্তি সময়োপযোগী করে নবায়ন করা দরকার।
৩. সীমান্তে টহল ও নজরদারী বাড়াতে হবে। 'দুর্গম বলে ব্যবস্থা নেয়া ক্ষ্টকর'- এই কথাগুলো সশস্ত্র বাহিনীর মুখে শোনা যাবে না। দরকার হলে সড়ক পথ উন্নয়ন এবং আলাদা শক্তিশালী কন্ট্রোলড স্ট্যাটিক স্যাটেলাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
৪. শুধু পার্বত্য অঞ্চলের জন্য সশস্ত্র বাহিনীকে আলাদা ক্ষমতায় দিতে হবে, যাতে কেন্দ্রের অনুমতির অপেক্ষায় কালক্ষেপন না হয়। তবে অবশ্যই সবকিছু জবাব দিহিতার আওতায় রাখতে হবে।
৫. আদিবাসী, নৃগোষ্ঠী, সেটেলার, সেটেলার বাঙালি শব্দগুলো বাদ দিয়ে বাংলাদেশী হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। অর্থাৎ শুধু বাংলাদেশী হিসেবে পরিচিত হবে। এতে করে বিদেশী দাতা সংস্থা এবং এনজিও গুলোর কাঁচা টাকার খেলা কমে আসবে। সেই সাথে চাকরী বা অন্যান্য সকল সেক্টরে পাহাড়ীদের জন্যে কোন কোটা সুবিধা রাখা চলবে না। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ প্রাপ্ত হবে।
৬. পাহাড়ে উৎপাদিত পন্য মনিটরিং করে পার্বত্য এলাকা থেকে সমগ্র দেশে যেতে দিতে হবে। যাতে অর্থনৈতিক লেনদেন সরকারের কাছে আরও সুষ্পষ্ট হয়।
৭. পাহাড়ে নগদ লেনদেন কমিয়ে, ডিডিটাল কারেন্সীর প্রচলন বেশি ঘটাতে হবে। তাহলে সন্দেহ জনক লেনদেন ট্রেস করা সহজ হবে।
৮. পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন, ১৯৯৮ তুলে দিতে হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি, ১৯০০, কে সময়োপযোগি করতে হবে। জাতীয় এবং আঞ্চলিক নির্বাচনে ৮০% পাহাড়ে বসবাসকারীদের অংশগ্রহন নিশ্চিত করতে হবে। এতে করে নেতৃত্ব্ সংকট দূর হবে এবং কিছু উপজাতি গোষ্ঠির একছত্র আধিপত্য দূর হবে।
৯. সকল সরকারী অফিসার, কৃষি অফিসার, বন বিভাগের অফিসার সহ সবাইকে কর্মতৎপরতা বাড়াতে হবে এবং জন সংযোগ বাড়াতে হবে। সুষ্ঠ তদারকি ও জবাবদিহিতার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে।
১০ . পর্যটন এলাকার পরিধি বাড়াতে হবে এবং সমতলের ব্যবসায়ীদের পাহাড়ে ব্যবসার পরিবেশ তৈরী করে দিতে হবে।
১১. বাঙ্গালী, মারমা, গারো, হাজং, চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাদের এক ছাতার তলায় নিয়ে আসতে হবে। অর্থাৎ সবার জন্য একই আইন, একই সম্মান এবং সমান সুযোগ সুবিধা দিতে হবে।
১২. এনজিওদের পক্ষপাত দুষ্ট না হয়ে, সবার জন্য কাজ করতে বাধ্য করতে হবে। অর্থাৎ পাহাড়ী বা বাঙ্গালীকে আলাদা চোখে দেখা যাবে না।
১৩. আমাদের মিডিয়া কে ঢাকা কেন্দ্রিক মনোভাব ছেড়ে, সারাদেশ নিয়ে ভাবতে হবে। শুধু বিটিভি চট্রগ্রাম কেন্দ্র না রেখে আরও টিভি চ্যানেলকে এগিয়ে আসতে হবে। সব চ্যানেলকে দিনে অন্তত ২ ঘন্টা বরাদ্দ রাখতে হবে পাহাড়ী অঞ্চলের অনুষ্ঠান দিয়ে। ঢাকার ঝুটের গােডাউনে আগুন লাগার ঘটনা ৬ ঘন্টা ধরে লাইভ দেখানোর চেয়ে পার্বত্য চট্রগ্রাম, ময়মনসিংহ, শেরপুর, নোয়াখালী, ভোলা, সিলেটের খবর কাভার করা বেশি গুরুত্বপূর্ন।
আরও কিছু আপনার চিন্তায় থাকলে মন্তব্যে জানাবেন। হয়ত আমাদের আলোচনা কোন না কোন সময় যাদের চক্ষুগোচর হওয়া দরকার, তাদের হবে। পাহাড়ী জনপদের উপকার হোক, শান্তি ফিরুক এবং বিদেশী প্রভাব দূর হোক... এটাই চাই।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



