somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আনিস সাহেবের স্বপ্ন

১৪ ই মে, ২০১১ সকাল ১১:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



সরকারি আমলা আনিসুজ্জামান চৌধুরী রাত তিনটায় তাঁর বেডরুমে বসে আছেন। তিনি বিপত্নীক ,তাই আনিস সাহেবের পাশে তাঁর স্ত্রী শুয়ে নেই। স্ত্রী মারা গেল তিন বছর হয়ে এসেছে। বয়স থাকলেও আর দ্বিতীয় বিয়ের ইচ্ছে নেই। আনিসুজ্জামান চৌধুরীর বয়স ৫৬, উচ্চপদস্থ আমলা, ভুরি বেশ দশাসই, গ্যালিস দিয়ে প্যান্ট পড়েন তাতে একটু ভারিক্কি ভাব আসে। আনিসুজ্জামান এই মধ্য রাতে বিছানায় বসে হাঁপাচ্ছেন তার পেছনে একটা কারণ আছে। এসি রুমেও তিনি ঘামছেন। কারণ একটাই-তিনি এক ভয়ানক স্বপ্ন দেখেছেন। স্বপ্নটা এইরকম-আনিস সাহেব গহিন অরন্যে দৌরাচ্ছেন,পেছনে তার বাল্য বন্ধু কালাম,তার দুই হাতে হাজার হাজার সাপ। আনিস সাহেব জানেন কালাম তাকে ধরতে পারলে ঐ সাপগুলো তাকে কামড়াবে।

আনিস সাহেব কিন্তু সাপের ভয়ে হাঁপাচ্ছেন না। হাঁপাচ্ছেন এই কারণে যে তিনি কালামকে স্বপ্ন দেখেছেন। কালাম আনিস সাহেবের নেংটা কালের বন্ধু। এক সাথে বৈশাখ-জৈষ্ঠের ঝড় শেষে আমকুড়ানো,মাঝ নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরা আর স্কুলের লাস্ট বেঞ্চে বসে পুরো ক্লাশকে জ্বালানো এই ছিল তাদের কাজ। কালাম ছাত্র হিসেবে ছিল দারুন তবে পড়া লেখায় তার মন ছিল না বিধায় সব সময় সে শিক্ষকদের হাতে নিগৃহিত হত। আনিস সাহেব ছিলেন শান্ত এবং সৌম্য তবে তা শুধু বাড়িতেই। বাড়ির বাইরে তাঁর থেকে দুরন্ত আর কেউ ছিল না। আনিস সাহেব বাবাকে অনেক ভয় পেতেন, মা ছিল না তাই বাবা রেগে গেলে তাকে থামানোর কেউ ছিল না। আনিস সাহেব চাইতেন না বাবার হাতে মার খেতে। একবার কালামের জোরাজুরিতে উঁনি আর কালাম গেলেন মতির ঝিলে মাছ ধরতে। তখন ছিল বর্ষাকাল,কদম গাছে কদম আর চারিদিকে পাকা কাঁঠালের গন্ধে একাকার। বাড়িতে ফিরতে ফিরতে হয়ে গেল রাত আর আনিস সাহেবের বাবার রাগ দেখে কে! কালাম আর কিশোর আনিসকেসহ বেদম প্রহার। গরিবের ছেলে কালাম সেদিন বিন্দুমাত্র প্রতিবাদ করেনি,বন্ধু আনিসের জন্য সে দ্বিধাহীন ভাবে মার খেয়েছে। ঐ দিনের পর থেকে আনিস সাহেব আর কালামের মাঝে সৃষ্টি হয় এক ধরণের দূরত্ব যা আর কোনদিনই ঘোচেনি।

কালাম এর পর থেকে আনিস সাহেবকে এড়িয়ে চলত। আনিস সাহেব সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেও পারেননি। কালামের বাবা ছিল কৃষক। বাবা কৃষক হওয়া সত্যেও কালাম পড়ালেখা করত। স্কুল শেষ করে বা বন্ধের দিনে সে বাবাকে সাহায্য করত। কালামের বাবা জুলমত আলি চাইত কালাম পড়ালেখা করুক,মানুষের মত মানুষ হোক,চাষার বাচ্চা গালি যেন তার ছেলের শোনা না লাগে। কালাম বাবার কাছ থেকে শুনত কিভাবে,কী উপায়ে কাজ করলে সৎ থাকা যাবে,কারো ক্ষতি কেন করা উচিত না,কেন সে আর আনিসের সাথে মিশবে না। চাষার ছেলে কালাম আনিসকে প্রচন্ড ভালবাসত তাই চায়নি আনিসকে আর তার বাবার হাতে মার খাওয়াতে।

আনিস সাহেব তখন সপ্তম শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষা দিচ্ছিলেন, আগের রাতে তেমন পড়া হয়নি বলে পকেটে করে নিয়ে গেছিলেন কিছু বইয়ের কাটিং যদি কমন পড়ে। তবে আনিসুজ্জামান চৌধুরীর দুর্ভাগ্য কিছুই কমন পড়ল না। সামনে বসা কালামকে আনিস সাহেব দ্বিধা নিয়ে, মৃদু সংকোচে দেখাতে বললেন। কালাম যেন শুনেও শুনল না। আনিস সাহেব আবারও বললেন, না ,এবারও কালাম শুনল না। আনিস সাহেব আকুতি-মিনতি করে বললেন কিন্তু কালামের রা নেই। পেছন থেকে খোঁচান,গুতা মারেন, না, কালাম তাও টু শব্দ করে না। শেষ মেষ আর না পেরে আনিস সাহেব তখন কালামের পিঠে সজোরে এক চিমটি মারলেন,কালাম চিৎকার করে ওঠায় স্যার এসে পড়লেন ।ঘটনা সামান্যর ওপর দিয়ে যেত কিন্তু দুর্ভাগা আনিস সাহেবের পকেট ফুলে থাকায় স্যার চেকিং করাতে এক দলা কাগজ বেরিয়ে আসল। আনিস সাহেবকে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হত যদি তার বাবা জোর চেষ্টা না করত।

আনিস সাহেব এ ঘটনায় কালামের ওপর বিরক্ত হলেন এবং একই সাথে কালামের ক্ষতি করার বুদ্ধি আঁটলেন। আনিস সাহেবের সাথে পরিচয় ছিল তাদের এলাকার এক সাপুড়ের। সাপুড়েকে বেশ কিছু পয়সা দিয়ে আনিস সাহেব বললেন একটা গোখরা সাপ দিতে। আনিস সাহেব জানেন কালাম বনে জংগলে ঘোরা ছেলে সে ঢোরা সাপ দেখে কিছুতেই ভয় পাবে না। সাপুরে আনিসকে তার মতলব না বুঝেই বাক্স করে দিয়ে দিল এক গোখরা সাপ । আনিস স্কুলের পাশের রাস্তায় এসে দেখে স্কুল ছুটি হয়েছে। সে আস্তে আস্তে নির্জন এক রাস্তায় সেই বাক্স নিয়ে একটা গাছের মাথায় উঠল। কিশোর আনিস কালামকে শুধুই ভয় দেখাতে চেয়েছিল। কালাম গাছের কিছুটা কাছাকাছি আসতেই আনিস সাহেব বাক্স খুললেন আর সাথে সাথে সাপটা ছোবল মেরে উঠল। আনিস সাহেব গাছ থেকে পড়লেন সাপের কামড় খেয়ে।

আনিস সাহেব সুস্থ হয়ে উঠলেন। অনেক দিন ভাঙ্গা পা নিয়ে পড়ে ছিলেন বিছানায়। সাপটার বিষ তার শরীরে ছড়াতে পারেনি কালামের জন্যই। কালামের বুদ্ধির জোরেই আনিস সাহেব বেঁচে গেলেন। কিন্তু কালাম কই? আনিস সাহেব তার বাড়ির লোকজনদের কাছে জানতে পারল কালামকে তার বাবা প্রচন্ড মেরেছে এই ঘটনার জন্য। আনিস সাহেবের বাবার ধারণা কালামই সাপ এনে আনিসকে কামরিয়েছে আর সেই তাকে গাছ থেকে ফেলে দিয়েছে। কালাম যখন আনিসকে নিয়ে আসে বাড়িতে আনিস তখন অজ্ঞান। মার খেয়ে পাঁচদিন জ্বরে ভুগে চাষার বাচ্চা কালাম বিনা চিকিৎসায় মারা গেল। আনিস সাহেবের স্বপ্নের সাপগুলো সেই গোখরার মতোই দেখতে।

১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

×