ধরেন একটা খুন হয়েছে।
খুনি খুঁজতে গিয়ে গোয়েন্দা কিংবা পুলিশ, সবার আগে যে কাজটা করবে, তা হলো- সন্দেহ। একটা সম্ভাব্য সন্দেহজনকদের তালিকা। প্রমাণ নেই, শুধু অনুমান, অনুমানেই সন্দেহ।
এরপরের ধাপ- বিশ্বাস। কিছু প্রমাণ আছে কোনো খুনির বিরুদ্ধে, তবে তা নিশ্চিত প্রমাণ নয়।
শেষ ধাপে, একজনকে খুনি হিসাবে আবিষ্কার করা। তার বিরুদ্ধে কিছু অকাট্য প্রমাণ বিদ্যমান। তাই নিশ্চিত, সেই খুনি। এই ধাপটার নাম – নিশ্চিতি।
এই তিনটি ধাপকে খুব আলাদা মনে হলেও, ধাপ তিনটি পরস্পরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বিশ্বাস আসলে, সন্দেহকে দমন করে রাখার একটা সিদ্ধান্ত।
আর নিশ্চিত হলো, সন্দেহের পথ একেবারে বন্ধ করে দেয়া। তালা ঝুলিয়ে, চাবি অতল সমুদ্রে ফেলে দেয়া।
এক্ষেত্রে বিপদও আছে। সন্দেহের সাথে সাথে বন্ধ তালা খুলে, নতুন কোনো সত্যের প্রবেশের পথও বন্ধ হয়ে যায়।
মনোবিজ্ঞানে Confirmation Bias নামে একটা কথা আছে।
আপনি যখন একটা বিষয়কে বিশ্বাস করবেন, তখন শুধু তার পক্ষেই আপনি যুক্তি খুঁজবেন। বিপক্ষের যুক্তি - হয় খুঁজবেন না, অথবা এড়িয়ে চলবেন।
ধরুন আপনার এক বন্ধু, আপনি বিশ্বাস করেন- সে কখনও মিথ্যে বলতে পারে না, মানে আপনি নিশ্চিত।
আপনার সামনে তার যদি কোনো ছোটোখাটো মিথ্যে ধরা পড়ে যায়, আপনার মন দুই ধরণের যুক্তি দাঁড় করাবে,
এক – সে পরিস্থিতির চাপে মিথ্যে বলেছে, এ ছাড়া তার কোনো উপায় ছিল না।
দুই- সে এর আগে বহুত সত্য কথা বলেছে, এটা বাদে যা সবই সত্য কথা বলেছে। মিথ্যে নিয়ে কোনো আলাপেই আপনি যাবেন না।
সামনে বিশ্বকাপ খেলা। আপনি আপনার পছন্দের দল নিয়ে, পছন্দের প্লেয়ার নিয়ে, যে ভালো ভালো কথা বলবে, বিশ্বাস করতে শুরু করবেন, এই লোকটা অনেক ভালো। তার প্রতি একটা ট্রাস্টের জায়গা আপনার তৈরি হবে। আপনি তার ফ্যান হয়ে যাবেন।
আর যে আপনার দল কিংবা প্লেয়ারকে নিয়ে খারাপ বা বাজে কথা বলবে, ট্রল করবে, তাকে আপনার খুব খারাপ মানুষ বলে মনে হবে। তার কোনো কথাই আপনার বিশ্বাস হবে না। এমনি সে আপনার দল কিংবা প্লেয়ার নিয়ে কটু সত্য কথা বললেও, তার বিপরীতে আপনি যুক্তি দাঁড় করাবেন।
একই ঘটনা কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও । এবং এক্ষেত্রে এই ঘটনাটা খুবই এক্সট্রিম।
একটা অন্ধ বিশ্বাস, আপনার রাজনৈতিক দলের সকল ভুলত্রুটি অন্ধকারে ফেলে রাখবে। আপনার চোখে কিছুই পড়বে না। যদি কিছু পড়েও, আপনি তা জাস্টিফাই করার চেষ্টা করবেন। আপনার মতের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে, তাকে আপনি মেরে ফেলতে পর্যন্ত চাইবেন।
এটাই Confirmation Bias.
আমরা খুনি নিয়ে আলোচনায় ছিলাম। এই Confirmation Bias এর কারণে অনেক ক্ষেত্রে অনেক নিরপরাদ মানুষও শাস্তি পায়, ফাঁসিতে ঝুলে যায়।
কারণ আপনি গোয়েন্দা বা বিচারক হয়েও শুধু একটা বিশ্বাস আকড়ে ধরে এগিয়েছেন নিশ্চিতের পথে, প্রশ্ন আর সন্দেহের পথ বন্ধ করে।
আবার যদি উল্টোভাবে আমরা চিন্তা করি। খুনির মনস্তাত্তিক দিকটা যদি বোঝার চেষ্টা করি। আমরা দেখতে পাব, তার ভিতরও এই তিনটে সত্ত্বা – সন্দেহ, বিশ্বাস আর নিশ্চিত কাজ করেছিল।
প্রথমে সন্দেহ করল সে, এই লোক আমার শত্রু।
এরপর সে বিশ্বাস করতে শুরু করল, এর কারণেই আজকে আমার এত করুণ অবস্থা। এর বেঁচে থাকা উচিত নয়।
আর শেষ মুহূর্তে সে নিশ্চিত হয়ে যায়- এই লোককে আমাকেই খুন করতে হবে।
সন্দেহ তাকে থামাতো, বিশ্বাস তাকে খুন করার জন্য এগিয়ে নিয়ে গেছে, আর নিশ্চিতি তাকে দিয়ে খুন করিয়েছে।
আদতে আমরা যে সন্দেহ বা Doubt কে সবসময় ভিলেন ভাবার একটা চেষ্টা করি, আসলে দেখা যাচ্ছে সন্দেহ লোকটা সবসময় ভিলেন না। দরকার আছে তাকে জীবনে।
এবার খুনোখুনি থেকে একটু ভালোবাসাবাসির দিকে যাই। সম্পর্কের ক্ষেত্রে এই তিনটে ব্যাপার সন্দেহ, বিশ্বাস আর নিশ্চিত, এরা ভিন্ন ভিন্ন ভাবে কাজ করতে পারে।
ধরা যাক একটা সম্পর্ক যখন শুরু হয়, পুরোটা জুড়ে বিশ্বাস। আমাকে সে ভালোবাসে, আমিও তাকে ভালোবাসি।
ঝামেলাটা বাঁধে যখন সন্দেহের ব্যাপারটা আসে। আমার সন্দেহ হলো, সে অন্য কারও সাথে মেসেঞ্জারে কথা বলে। তার সন্দেহ হলো, আমি কারও সাথে লুকিয়ে দেখা করি।
এবার টানাপোড়ন সম্পর্কে, দুটো সন্দেহের যে কোনোটা একটা নিশ্চিত হলেই, সম্পর্কের অবসান।
আবার ব্যাপারটা একটু আগপিছ করেও হতে পারে। যেমন সম্পর্কের শুরুতে মনে হলো, সন্দেহ আসলো, আমাকে সে সত্যিই ভালোবাসে তো। সারাজীবন পাশে থাকবে তো?
দুজনের নেয়া প্রতিটা ছোটো ছোটো পদক্ষেপ, এই বিশ্বাসকে গাঢ় করে, আমাকে সে ভালোবাসে। এরপর একটা সময় পার করে, দুজনেই নিশ্চিত হয়ে যায়, এ আমাকে ছেড়ে কখনও যাবে না।
তবে সমস্যাটা বাড়ে এখানটাকে, যখনই নিশ্চিত ভালোবাসার ব্যাপারটা আসে, তখন এক পক্ষ বা উভয় পক্ষের ভালোবাসা টিকিয়ে রাখার যে চেষ্টা, যে যত্ন, তা উবে যায়, Taken for Granted এর চক্করে পড়ে, হাওয়াই মিঠের মতন চুপসে যায়।
মনোবিজ্ঞানী জন গটম্যান, তার বিয়েসাদি ও সাংসারিক জীবন সম্পর্কিত দীর্ঘ আলাপচারিতায় বলেছেন, যে দম্পতি, একে অপরকে নিয়ে নিশ্চিত, তারা আর একে অপরের দিকে তেমন একটা খেয়াল রাখে না। তার চেয়ে যে সকল সম্পর্কে সামান্য স্বাস্থ্যকর সন্দেহ বিদ্যমান। যেমন ও আসলে কী ভাবছে? এটা করলে কী রাগ করবে? এটা করলে কী ও আদৌ ও খুশি হবে? এসব ব্যাপার স্যাপার থাকে, সে সকল সম্পর্ক আরও বেশি জীবন্ত।
বলা যায়, সম্পর্কে,
সন্দেহ- স্বাস্থ্যকর হলে সম্পর্ক টিকে থাকে। বিষাক্ত হলে, মরে যায়।
বিশ্বাস- সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার ভিত্তি। কিন্তু ভিত্তিহীন বিশ্বাসে তেমন কোনো লাভ নেই।
নিশ্চিত- অপরিপক্ক নিশ্চয়তা অপর জনের জন্য অবহেলা ও নিজের ক্ষেত্রে Taken for Granted এর জন্ম দেয়। আর পরিপক্ক নিশ্চয়তা, যা সময়ের সাথে সাথে মানসিক পরিক্কতার সাথে সৃষ্টি হয়, তা সারাজীবন একসাথে থাকার প্রেরণা হয়।
এবার বিজ্ঞান বা গবেষণার দিকে যদি তাকাই, একটা অনুমান বা Hypothesis কে আমরা সন্দেহের সাথে তুলনা করতে পারি।
এরপর পরীক্ষা নিরীক্ষা, ফলাফল হতে প্রাপ্ত Theory কে আমরা বিশ্বাস বলতে পারি।
আর মজার বিষয়, বিজ্ঞানে আমরা অনেক কিছু নিশ্চিত ভাবি, এ কারণে এটা হচ্ছে, ঐ কারণে এটা। তবে বিজ্ঞান কোনোকিছুকেই চুড়ান্ত নিশ্চিত বলে না। সন্দেহের পথ খোলা রাখে সবসময়।
শেষমেশ বলতে পারি, এই তিন জিনিসের অবস্থান আছে, ধর্ম বা আধ্যাত্মিকতায়। সবচেয়ে সেনসিটিভ ইস্যু।
ধর্মের মূল ভিত্তিটাই হচ্ছে বিশ্বাস। প্রমাণ চোখের সামনে থাকুক বা না থাকুক বিশ্বাস করা, উপরে একজন আছেন।
এখানে সন্দেহের ফলাফল হতে পারে দুটি। এক সন্দেহের সঠিক উত্তর না পেয়ে, বিশ্বাসে চিড়, ধর্মে উদাসি।
দুই সন্দেহের উত্তরের দ্বারা Dark Night of Soul, বিশ্বাসের সবচেয়ে গভীরতম সংকটটা পার করে বিশ্বাসকে আরও অটুট করা।
আর এর চুড়ান্ত ধাপ নিশ্চিতি, নিশ্চিত করে গভীর আধ্যাত্মিকতার, পরম শান্তির সন্ধান দেয়।
আমাদের ব্রেইনেও তিনটি বিষয় তিনভাবে কাজ করে। আমাদের মস্তিষ্কের Anterior Cingulate Cortex অংশটা কনফ্লিক্ট বা ডাউট ডিটেক্ট করে। ভুল ত্রুটি নিয়ে কনফিউশনে পরে, বেশ মাত্রায় শক্তি খরচ করে, এই অবস্থা হতে বের হতে চায়। হয় বিশ্বাস না হয় নিশ্চিত যে কোনো এক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চায়।
বিশ্বাস, Dopamine নিঃসরণ করে। আমাদের ব্রেইন পুরস্কৃত হয়েছে বলে মনে করে। এটায় প্রশাস্তি পাওয়া গেলেও, অনেকটা ফাঁদের মতন। আমাদের মস্তিষ্ক বিশ্বাসের পুরষ্কারের লোভে, তাকে চ্যালেঞ্জ করবে এমন তথ্য এড়িয়ে চলে।
আর আমরা নিশ্চিত হই যখন আমাদের মস্তিষ্কের Prefrontal Cortex কোনো সিদ্ধান্তে স্থির হয়। তর্ক করার রাস্তা একদম বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলাফল হতে পারে দুটি, একটি গোঁয়ার্তুমি অপরটি জ্ঞান।
তাহলে সন্দেহ, বিশ্বাস আর নিশ্চিত। কোনটাকে বেশি শক্তিশালী বলা যায়?
প্রতিটারই শক্তিশালী দিক আছে, দুর্বলতা আছে।
সন্দেহ, সবচেয়ে সৎ অবস্থা। আমি জানি না, তবে হতে পারে। এই বিষয়টা বিজ্ঞান থেকে তদন্ত, ভালোবাসা থেকে ধর্ম সবক্ষেত্রে সচেতনতার সৃষ্টি করে। তবে সন্দেহে আটকে থাকলে সামনে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব।
বিশ্বাস, সবচেয়ে সাহসী অবস্থা। সম্পূর্ণ তথ্য নেই, তবু তদন্ত, ভালোবাসা, বিজ্ঞান, ধর্ম সবই টিকে আছে এই বিশ্বাসের উপর। কিন্তু অন্ধ বিশ্বাস মানুষকে প্রতারিত করে, মাঝে মাঝে সহিংস করে।
নিশ্চিত, সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ অবস্থা। কিন্তু বেশিরভাগ সময় যেটাকে আমরা নিশ্চিত ভেবে নিচ্ছি, তা গাঢ় বিশ্বাস ছাড়া কিছুই না।
জীবনে সবচেয়ে জরুরি এটা বুঝতে পারা, কখন আমাকে সন্দেহ করতে হবে, কখন বিশ্বাস আর ঠিক কখন নিশ্চিত হতে হবে। তার থেকেও জরুরি এই বিষয়টা বুঝতে পারা, আমি সন্দেহ করছি, বিশ্বাস করছি নাকি আমি নিশ্চিত?
রিয়াদুল রিয়াদ
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মে, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



