somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটোগল্প: অন্তর্ঘাত

০২ রা জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কোরবানির গরুটা কিনে সবার আগে বাবা কিংবা মায়ের কথাই মনে পড়ার কথা। কিন্তু সামিউলের মনে পড়ল, বেলায়েত স্যারের কথা। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে, চার বছরের চাকরি, নিজের ছোটোখাটো একটা ব্যাবসা দাঁড় করানো। সর্বোপরি নিজের পরিশ্রমের টাকায় কেনা, প্রথম কোরবানির গরু।
গরুর দড়ি ধরে সামনে হাঁটতে থাকা, ছোটো ভাইকে বলল, "শফিকুল, বামে ঢুকিস তো গরু নিয়ে।"
"ভাইজান বামের রাস্তা তো ভালো না। সময় বেশি লাগবে।"
অন্য সময় হলে সামিউল হয়ত ধমক দিয়েই বলত, "তোকে যেতে বলছি, যাবি। এত কথা কীসের?"
আজ সেভাবে বলল না। বরং বেশ শান্ত স্বরে, বুঝিয়ে বলল বামের গলি ধরেই যেন যায় শফিকুল। শফিকুল না করল না।

বামের গলিতেই বেলায়েত স্যারের দোতলা বাড়ি। সামিউলদের বিজ্ঞান পড়াতেন। স্কুলের সবাই তাকে কৃপণ হিসাবেই চিনত। সেসময়কার পাঁচ টাকার ভাড়া, দুই টাকা দেয়ার জন্য রিকশাচালকদের সাথে তিনি যে বচসা করতেন, যে পরিশ্রম দিতেন, সে পরিশ্রমে তিন টাকার বেশি উপার্জন করতে পারার কথা। বেলায়েত স্যারের ক্লাস সামিউল পেয়েছিল অষ্টম শ্রেণি থেকে।
এই অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা চালিয়ে নিয়ে আসাটা খুব একটা সহজ ছিল না সামিউলের জন্য। ওর বাবা সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করতেন এক বাড়িতে। বেতন নামমাত্র। সংসার চলে, তবে বিলাসিতা মানায় না। মাঝে মাঝে সামিউলের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়াটাও বিলাসিতা বলেই মনে হতো পরিবারের কাছে, কিংবা ওর নিজের কাছে। তবে এই একটা বিলাসিতা কখনও পরিহার করেননি সামিউলের সিকিউরিটি গার্ড বাবা। ছেলেকে পড়াশোনা করিয়েছেন।
ক্লাসের অন্য ছেলেমেয়েদের মতন বিষয় প্রতি পাঁচশ টাকা খরচ করে, সেকালে প্রতিটি বিষয়ের শিক্ষক দিতে পারেননি ঠিকই, তবে সন্তানের খাতা, কলম, বই সম্পর্কিত কোনো অভাব তিনি কোনোদিন রাখেননি।
সংসারে অভাব ছিল, তবে ছেলেকে না খাইয়ে তো রাখেননি, বরং বেশ ভালো মন্দ খাইয়েছেন সবসময়। মাছ মাংস নিয়মিত ছেলেকে দিতেন সিকিউরিটি গার্ড বাবা।

সে সময় স্কুলগুলোতে, বিশেষ করে মফস্বলের শিক্ষকদের মধ্যে অদ্ভুত এক প্রবণতা ছিল। হুট করে ছেলেমেয়েদের দাঁড় করিয়ে, বাবার নাম, বাবার পেশা জিজ্ঞেস করতেন। পড়াশোনার সাথে এ জিনিসের আদৌ কোনো সম্পর্ক ছিল কিনা কে জানে?
সামিউলের এ প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বস্তি কাজ করত। ভালো স্কুলে পড়াশোনা করাতেন বাবা। ছেলেবেলায় যে কথা উচ্চারণে আড়ষ্টতা আসত না, ঐ ক্লাস এইট-নাইনে তা বলতে আত্মসম্মানে বাধত। যদিও সে উত্তর দিয়ে, প্রচণ্ড সম্মানিত বোধ করার কথা সামিউলের। বাবা এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও পড়াশোনা করাচ্ছেন। কিন্তু ও সে কথা বলতে গিয়েই চুপসে যেত। প্রশ্নের উত্তরের পর, সবার একই রকম দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকা, মনের মধ্যে জমা অস্বস্তির কঠিন বরফের টুকরা ভেঙে-চুড়ে দিত। সে ভাঙা টুকরো চুয়ে পড়া জল, মাঝে মাঝেই চোখের কোণে জমা হতো। সে জল গোপন করার আপ্রাণ চেষ্টা বরাবরই করে যেত সামিউল।
বেলায়েত স্যার, যাকেই পড়া জিজ্ঞেস করতেন অথবা চেহারা দেখে নাম জানতে চাইতেন, সাথে বাবার নাম ও পেশা জিজ্ঞেস করার বাতিক ছিল। সামিউল ভয়ে থাকত, কখন বেলায়েত স্যার ওকে দাঁড় করান, এটা ওটা জিজ্ঞেস করেন। তিনি বাবার পেশা থেকে মাঝে মধ্যে বেতন কত, কয় বছরের চাকরি, ব্যাবসা করে লাভ কেমন- এসব আলাপেও চলে যেতেন। সামিউল এসবের উত্তর দিতে ভয় পেত।
সব ভয় সত্যি করে, বেলায়েত স্যার একদিন সামিউলকে দাঁড় করিয়ে একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছিলেন, “বাবার নাম কী?”
“সাদেক মুন্সি।“
“কী করেন?”
এই ছোটো আর সাধারণ এক প্রশ্নের বিপরীতে , সামিউল কিছুই বলতে পারেনি। ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল, কাঁপা কাঁপা পায়ের নিচের মাটি মনে হচ্ছিল সরে যাচ্ছিল। চোখের কোণটা ভিজে উঠছিল অকারণে। গলার কাছে কেউ যেন, শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে চেপে ধরে রেখেছিল। দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল ওর। বেলায়েত স্যারের ধমকেও সামিউলের সেই দমবন্ধ অবস্থা স্বাভাবিক হয়নি। পাশ থেকে এক ছেলে উত্তর দিয়েছিল, “স্যার, ওর বাবা সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি করে। তাই বলতে লজ্জা পায়। আমরা কত বলছি, লজ্জা পাওয়ার কিছু নাই। শোনে না।“
সামিউল বন্ধুর বলা এ কথার পর, আর কোনোদিকে তাকায়নি। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল, মলিন হয়ে আসা সাদা জুতো জোড়ার দিকে। পায়ের আঙুল দিয়ে ঘষে ঘষে জায়গা করতে চাচ্ছিল ক্লাসরুমের ফ্লোরে। ইচ্ছে করছিল, সে জায়গায় গিয়ে চুপচাপ বসে থাকে, লুকিয়ে থাকে।

এমন প্রশ্নের উত্তরেও বেলায়েত স্যার করুণার চোখে তাকাননি সামিউলের দিকে। আর কোনো প্রশ্ন করে বিব্রতও করেননি। তবে যা করেছিলেন, তাকে করুণা, সাহায্য, মায়া নাকি নিখাদ ভালোবাসা কী বলা উচিত ছিল সামিউলের জানে না। বেলায়েত স্যার ওর সবগুলো বিষয়ে বিনামূল্যে, সকল স্যারের কাছে ক্লাসের বাইরে প্রাইভেট ব্যাচে পড়াবার ব্যবস্থা করে দিলেন, স্কুলের বেতন মৌকুফ করিয়ে দিলেন। পড়াশোনার পথটা মসৃণ করে দিলেন। এই বেলায়েত স্যারকে সামিউলের মনে রাখা উচিত। সামিউল মনে রেখেছে।

কোরবানির গরু নিয়ে এসে সামিউল দাঁড়াল, বেলায়েত স্যারের বাসার সামনে। দুই তিনবার ‘স্যার স্যার’ বলে ডাক দিতেই বেরিয়ে আসলেন বাড়ি থেকে। স্যারের চেহারায় বয়সের ছাপ স্পষ্ট। স্যারের ছেলে মেয়ে নেই। স্ত্রীসমেত এই বাড়িতে থাকেন। সামিউলকে দেখে, বেলায়েত স্যারের চোখে মুখে আনন্দের ভাব চিকচিক করছে।
"কোরবানির গরু কিনলি?"
"আমাকে চিনতে পারছেন, স্যার?"
"চিনব না তোকে?" সামিউল নিচু হয়ে বেলায়েত স্যারের পা ছুঁয়ে সালাম করল। স্যার ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, "আমি এইবার কোরবানি দিতে পারতেছি না।"
কথাটা শুনে সামিউলের চোখে বড় জ্বালাপোড়া করছে। কিছু একটা বলা দরকার। সামিউলের গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। স্যারের স্ত্রী এসে দাঁড়ালেন পিছনে। তাকে দেখে সালাম দিলো সামিউল।

এই বাড়িটা, ঠিক এই বাড়িটাতেই, কত বছর আগে হবে? সামিউল তখন ক্লাস টেনে পড়ে। মানে প্রায় তেরো চৌদ্দ বছর আগে সামিউল এ বাড়িটায় এসেছিল। এক কোরবানির ইদের দিন, বিকেল বেলা। তখন সবার কোরাবানির পশু কাটাকুটি শেষ, বেশির ভাগ ভাষায় মাংস বসিয়ে দিয়েছে চুলায়। পুরো এলাকায় মাংসের গন্ধ। সামিউলের সে গন্ধ ভালো লাগে। অমন গন্ধ নিতে নিতে হেঁটে যাবার সময় হঠাৎ দেখা বেলায়েত স্যারের সাথে। স্যার জোর করে বাসায় নিয়ে আসেন। এই বাসাটাতেই। আদর করে বসিয়ে সেমাই খেতে দেন। হাঁক দিয়ে বেলায়েত স্যার স্ত্রীকে বলেন, “সামিউলকে মাংস দিয়ে দিও যাওয়ার সময়।“
সামিউল সেমাই খাওয়া শেষে বের হবার সময়, ওর হাতে মাংসের পলিথিন প্যাকেট ধরিয়ে দেন, বেলায়েত স্যারের স্ত্রী। সামিউল সে মাংসের প্যাকেট নিয়ে বাসায় যায়নি। ঐ মাংস নিয়ে বাসায় যাবার সাহস কিংবা সম্মানবোধ কোনোটাই ঐ কিশোর সামিউলের ছিলো না। সে মাংসের প্যাকেট ধরিয়ে দিয়েছিল রাস্তার এক ভিক্ষুকের হাতে।
সেদিন বাসায় ফেরার পথে অঝোরে কেঁদেছিল সামিউল। আজকেও ভীষণ কান্না পাচ্ছে। বেলায়েত স্যার কোরবানি দিচ্ছেন না এবার। এ কথার বিপরীতে ধরে আসা গলায় সামিউল বলে, “স্যার, আমি আছি কেন? আমি তো দিচ্ছি কোরবানি। আমি তো আপনার সন্তানের মতনই।“
বেলায়েত স্যার সামিউলের হাতটা শক্ত করে ধরলেন। তিনিও বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে দিয়েছেন, “বাবা, তুই কোরবানি দিতেছিস, এটাকে আমি কী যে খুশি হয়েছি। কত কষ্ট করছিস জীবনে।“
আরও কিছু বলতে চাচ্ছিলেন, অথচ বেলায়েত স্যার কিছু বলতে পারল না, সামিউলেরও নীরবতা ভাঙল না।
“আসি স্যার,” বলে সামিউল গরুটা নিয়ে চলে আসল।

কোরবানি ইদের দিন, কোরবানি শেষে সামিউল বেলায়েত স্যারের বাসায় মাংসের সবচেয়ে বড় ভাগটা নিয়ে হাজির হলো। সামিউলের প্রতি কোরবানি ইদে বেলায়েত স্যারের কথা মনে পড়ে। তিনি ওর পড়াশোনার পথ সহজ করে দিয়েছিলেন সে জন্য হয়ত নয়। সামিউলের বার বার সেই তেরো চৌদ্দ বছর আগের সেই মাংসের প্যাকেটটার কথা মনে পড়ে। সে প্যাকেটে গুণে গুণে মাংস ছিল – চার টুকরো।
সে চার টুকরো মাংসের পলিথিনের প্যাকেট কি সামিউলের জন্য রেখেছিলেন নাকি ভিক্ষুকদের দেয়ার জন্য?
এ প্রশ্ন কখনও জিজ্ঞেস করা হবে না, জানা হবে না সামিউলের।
বেলায়েত স্যারের জন্য আনা মাংসের ভাগের দিকে তাকিয়ে রইল সামিউল। আজকের পর কি সেই চার টুকরো মাংসের স্মৃতি আর কোনোদিন ওর মনে আসবে?

রিয়াদুল রিয়াদ
০২/০৬/২০২৬
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৩৪
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০১ লা জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:০০

ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা....

বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ যে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি, তা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘ দুই দশকের দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থপাচার এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত আর্থিক অব্যবস্থাপনার ফল আজ রাষ্ট্রকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

"টেকসই অর্থনীতির: সহজ সমাধান"

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০১ লা জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:০৭



দেশ এখন অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত। ব্যাংকে তারল্য সংকট, টাকার অবমূল্যায়ন, অর্থ পাচারসহ নানা বহুমুখী সমস্যার সম্মুখীন। ইউনূস সরকার দেশীয় ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিয়ে কোনোভাবে জোড়াতালি দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

দু-দণ্ড শান্তির পরেও যে তৃষ্ণা থাকে : বনলতা সেন - সিনেমা [স্পয়লার এলার্ট]

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ০১ লা জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪


সিনেমা হলের আলো নিভলে একটা চুক্তি হয়। পরিচালক বলেন; আমাকে বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে কোথাও নিয়ে যাব। দর্শক রাজি হয়ে চোখ মেলে বসে থাকেন। মাসুদ হাসান উজ্জ্বলের বনলতা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনি অন্যায় করছেন, ওমর খাইয়াম!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০১ লা জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৪

আপনি সামুতে দীর্ঘদিন ধরে লিখছেন। এই ব্লগে আপনার অনেক অবদান। সেই অধিকারে, যে কোন ব্লগারের লেখাকে আপনি সমালোচনা করতেই পারেন। কিন্তু, কারো নাম নিয়ে কটাক্ষ করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে?... ...বাকিটুকু পড়ুন

এমপির কাজ কি মানববন্ধন করা ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০২ রা জুন, ২০২৬ রাত ২:২০


ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় একটা সিনেমা দেখানো হবে। পারিবারিক সিনেমা। সেন্সর বোর্ড থেকে পাস করা। নাম "বনলতা এক্সপ্রেস।" ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফিল্ম সোসাইটি ঈদের আনন্দে মানুষকে একটু সিনেমা দেখাতে চাইল। এতটুকুই ছিল ঘটনা ।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×