
১৯০১ সালের ডিসেম্বরে শান্তিনিকেতনে "ব্রহ্মচর্যাশ্রম" নামে একটি বিদ্যালয় স্থাপন করলেন রবীন্দ্রনাথ। যদিও জমিটি কিনেছিলেন তার বাবা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বোলপুরের কাছে ১৮৮৩ সালে। পরে জায়গাটির নাম দেন শান্তিনিকেতন। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে অনুমতি ও আশীর্বাদ নিয়েছিলেন। সেই সময়ে বিদ্যালয়ের খরচের জন্য ঠাকুরবাড়ির থেকে আলাদা করে মাসহারা পেতেন রবীন্দ্রনাথ। বিদ্যালয়ের প্রথম পাঁচজন ছাত্রের অন্যতম ছিলেন কবি পুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
এদিকে ধীরে ধীরে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বাড়ছে। বঙ্গভঙ্গ নিয়ে সকলেই সরব। সবাই স্বদেশী জিনিসের দিকে ঝুঁকছেন। বিলেতি দ্রব বর্জন চলছে পুরো দমে।
অরবিন্দ ঘোষ পরিকল্পনা করেছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের। কিন্তু নানা কারণে এখনও ফলপ্রসূ হয়নি। এরই মাঝে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৮ সালের ২৩শে ডিসেম্বর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন বিশ্বভারতীর। ঠিক তিন বছর পর ১৯২১ সালের এই একই দিনে আনুষ্ঠানিক ভাবে পথ চলা শুরু হল সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করলেন, কিন্তু খরচা আসবে কোথা থেকে? ইতিমধ্যে তিনি তার নোবেল প্রাপ্তির প্রায় পুরো টাকাটাই দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় তৈরির কাজে। কিন্তু আরও টাকা চাই।খরচ অনেক। তিনি সেই সময় অর্থ চিন্তায় বেশ জর্জরিত।
কিভাবে টাকার উপায় হতে পারে আলোচনার জন্য শান্তিনিকেতনেই নিজের কাছের জন দের নিয়ে একটা ছোট সভা ডাকলেন। উপস্থিত সকলের মতামত চান তিনি। অনেকেই গুরুদেবকে বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিচ্ছেন। সবার চোখে-মুখে উৎকণ্ঠা।
গুরুদেব বুঝলের সভার পরিবেশ বড় বেশী গুরুগম্ভীর হয়ে উঠছে। তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন, - “আহা তোমরা এত ভাবছ কেন? টাকা পাবার একটা অতি সহজ উপায় আছে”।
সবাই কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইলেন, - “কি সে উপায়”?
গুরুদেব এবার সেখানে উপস্থিত রানী চন্দকে আড়চোখে একবার দেখে নিয়ে সবার দিকে ফিরে বললেন, - “মাত্র সোয়া পাঁচ আনা খরচ”।
গুরুদেবের কথা শুনেই লজ্জায় পড়ে গেলেন রানী চন্দ তিনি বুঝে নিয়েছেন এবার গুরুদেব ঠিক কি বলতে চলেছেন।
আসল ঘটনা হল, রানী চন্দ একবার খুব আগ্রহ নিয়ে গুরুদেবকে মা মঙ্গলচণ্ডীর ব্রতের কথা শুনিয়ে ছিলেন। বাংলার ঘরে ঘরে সেই সময় এই ব্রত বেশ প্রচলিত ছিল। এই ব্রতকথাতে বলা আছে নিষ্ঠাভরে এই ব্রত উপবাস করলে নির্ধনেরও ধন হয়। রানী চন্দ ঠিক এই কথাই বলেছিলেন গুরুদেবকে। সাথে এও বলেছিলেন – “পুজোর খরচও বেশি নয়, মাত্র সোয়া পাঁচ আনা”।
সেই থেকে গুরুদেব যখনই বিশ্বভারতীর জন্য অর্থ কষ্টে পড়তেন তখনই মজা করে বলতেন, - “ভাবছ কেন? টাকার খনি হাতে পাবে মাত্র তো সোয়া পাঁচ আনার মামলা”।
রানী চন্দ:
কখনও শুনেছেন রবীন্দ্রনাথ কারও বিয়ের পৌরহিত্য করেছেন?
শুনতে আশ্চর্য লাগলেও সেইটি হয়েছিল ১৯৩৩ সালে। সেবার রবীন্দ্র সপ্তাহ উদযাপনের জন্য ডাক এসেছে মুম্বই থেকে। রবীন্দ্রনাথ গিয়েছেন সাথে প্রায় জনা পঁয়তাল্লিশের একটি দল।
সেই দলে রানী চন্দ আছেন। তিনি তখন রানী দে। এবং সাথে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত সচিব অনিল চন্দও সেই দলে উপস্থিত।বিশ্বভারতীর সূত্রেই শান্তিনিকেতনেই একে অপরকে চেনা জানা। দুজনের বিয়েও প্রায় ঠিক। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বেঁকে বসেছে অনিল চন্দের পরিবার। বিয়ে এখন হয় কিনা সেটিই একটি বিরাট প্রশ্ন। গুরুদেব সব শুনেছেন কিন্তু কোনও মন্তব্য করেন নি।
রবীন্দ্রনাথ মুম্বাই চলেছেন। হঠাৎ বর্ধমান ষ্টেশনে দেখা গেল রানী দে আর অনিল চন্দ হাজির। তারাও বিয়েতে দুবাড়ির মনোমালিন্য ভুলে রবীন্দ্রনাথের সাথে যাত্রায় সামিল হতে চায়।
মুম্বই পৌঁছে রবীন্দ্রনাথ উঠলেন পূর্ব নির্ধারিত টাটা প্যালেসে। বাকিরা সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে। রবীন্দ্রনাথের কথা মতো রানী দে উঠলেন পুরুষোত্তম ত্রিকোমদাসের (সেই আমলের নামজাদা আইনজীবী) স্ত্রী বিজু বেনের বাপের বাড়িতে। তখন বিজু বেন শান্তিনিকেতনের কলাভবনের ছাত্রী।
যেদিন তারা মুম্বই পৌঁছালেন সেদিন বিকেলেই রবীন্দ্রনাথ খবর পাঠালেন রানীকে ভালো করে সেজে গুঁজে তাড়াতাড়ি টাটা প্যালেসে চলে আসতে।
কবিগুরু সেজে আসতে বলেছেন এদিকে রানী তাড়াহুড়োয় একটার বেশি শাড়ি আনেন নি। গত কয়েকদিন এই একটি শাড়ি পরেই কাটছে। চিন্তায় পড়লেন তিনি। অনেক কষ্টে একটা শাড়ি জোগাড় হল। সেই শাড়ি পরে এবং মাথায় একটু ফুল জড়িয়ে হাজির হলেন রানী টাটা প্যালেসে।
গিয়ে দেখলেন গরদের ধুতি-পাঞ্জাবি আর গলায় লম্বা জুঁইয়ের মালা পরে বসে আছেন রবীন্দ্রনাথ। ডেকে পাঠানো হয়েছে অনিল চন্দকেও। রানী আর অনিলকে নিজের সামনে বসালেন কবি।
ঘরে তখন উপস্থিত সরোজিনী নাইডু, নন্দলাল বসু, ক্ষিতিমোহন সেনও। গুরুদেবের নির্দেশে নন্দলাল বসু হলেন কন্যাপক্ষ। শান্তিনিকেতনে রানী তার প্রিয় ছাত্রী। ক্ষিতিমোহন সেন হলেন বরপক্ষ।
রবীন্দ্রনাথের কড়া হুকুম ঘরে এই সময় যেন কেউ না ঢোকে। সেই কারণে দরজায় পাহারায় রইলেন হরেন ঘোষ (তিনিই মুম্বাইতে এই রবীন্দ্র সপ্তাহ অনুষ্ঠানের মূল পরিকল্পনাকার)।
দুজনকে সামনে বসিয়ে রবীন্দ্রনাথ শুরু করলেন বৈদিক মন্ত্র পাঠ। তারপর নিজের গলা থেকে ফুলের মালা খুলে ওঁদের হাতে দিলেন। তাই দিয়েই হল মালা বদল। এবং সম্পন্ন হল বিবাহ।
বিয়েতো হল কিন্তু সকলকে খবর দেওয়া হবে কিভাবে।
মুম্বইয়ের মেয়রের বাড়িতে সেদিন সন্ধ্যে বেলা নৈশভোজের আমন্ত্রণ কবি আর তার সমস্ত সাথী দের। সেখানে সকলে হৈ হৈ করছে কবিকে নিয়ে। হাজির সংবাদ মাধ্যমও। রবীন্দ্রনাথ হঠাৎ সকলকেই চমকে দিয়ে বললেন আজ তার দিন নয়। আজ এদের বিয়ের দিন। নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করার দিন।
তারপর দিন সংবাদপত্রের মাধ্যমে সমস্ত ভারত জেনে গেল তাদের বিয়ের খবর।
রানী চন্দের জন্ম মেদিনীপুরে। তার বাবা ছিলেন সেই আমলের পদস্থ পুলিশ কর্মচারী এবং কবি কুলচন্দ্র দে এবং মা পূর্ণশশী। তার যখন মাত্র ৪ বছর বয়স তখন তার বাবা মারা যান।
তার দাদা সরকারি আর্ট কলেজের প্রথম অধ্যক্ষ (চারু ও কারু মহাবিদ্যালয়ের)মুকুল দে। রবীন্দ্রনাথের স্নেহধন্য। সেই সময়ে রানী থাকতেন দাদার সাথে। কলকাতাতেই চৌরঙ্গীতে সরকারি আর্ট কলেজের কোয়ার্টারে। সেখানে প্রায়ই আসতেন রবীন্দ্রনাথ। সেখানে রবীন্দ্রনাথকে প্রথম দেখা রানীর।
১৯২৮ সালে রবীন্দ্রনাথ তাকে এবং তার বোন অন্নপূর্ণাকে (ঘোষ) শান্তিনিকেতনের কলাভবনে ভর্তি করে দেন। এবং খুব কম সময়েই তিনি নন্দলাল বসুর প্রিয় ছাত্রী হয়ে ওঠেন তিনি। পরে তিনি অবনীন্দ্রনাথের কাছেও আঁকা শিখেছেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং তিনি যৌথভাবে বাল্মীকি প্রতিভা নাটকের সিরিজ এবং শান্তিনিকেতনের দৃশ্যাবলীর রঙিন ছবি আঁকেন। তার আঁকা ছবিগুলির ভিতরে রাধার বিরহ এবং ১৯৩০ সালে লিনোকাটের উপর তার একটি বই খুব প্রশংসা পেয়েছিল।
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর তিনি জড়িয়ে পড়েন স্বাধীনতা সংগ্রামে (অগষ্ট আন্দোলন)। ধরাও পড়েছেন এবং জেলও খেটেছেন।
১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে দেশের প্রথম মহিলা চিত্রশিল্পী হিসাবে দিল্লি ও মুম্বাইতে একক চিত্র-প্রদর্শনী করে খ্যাতিলাভ করেন। তার আঁকা ছবি দিয়ে তৈরি অ্যালবাম খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। তার আঁকা ছবিগুলি দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবন সহ বিভিন্ন রাজ্যের রাজভবন গুলিতেও স্থান পেয়েছে। চিনের প্রধানমন্ত্রী চুনকিং ভারতে এলে ভারত সরকার রানী চন্দের আঁকা ছবি সৌহার্দ্যের প্রতীক হিসাবে চিন সরকারের হাতে তুলে দেয়।
তিনি সঙ্গীত এবং নৃত্যাভিনয়েও তিনি পারদর্শী ছিলেন। আশ্রমের ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যখন দেশে বিদেশে অনুষ্ঠান করেছেন তখন তিনিও সেইসব অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। শ্রীলঙ্কায় মঞ্চস্থ “শাপমোচন” নৃত্যনাট্যে তিনি নাচে দৃশ্যে অংশ নিয়েছিলেন।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার স্বামী ভোটে জিতে নেহেরুর মন্ত্রীসভার পররাষ্ট্র মন্ত্রী হওয়ার হলে (১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দ) তিনি শান্তিনিকেতন ছেড়ে স্বামীর সাথে দীর্ঘ ২০ বছর দিল্লিতে ছিলেন। সেই সময়ে জওহরলাল নেহরু, বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত প্রমুখের সাহচর্যে আসেন।
১৯৫৫ সালে তিনি স্বামীর সাথে সাংস্কৃতিক দলের অন্যতম প্রতিনিধি হয়ে পূর্ব ইউরোপ এবং তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়ায় ভ্রমণ করেন।
রবীন্দ্রনাথের অনুপ্রেরণা এবং নির্দেশে তিনি সাহিত্যচর্চা শুরু করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের রোগশয্যায় যখন কবি একটানা লিখতে পারতেন না। তিনি গুরুদেবের মুখে মুখে বলা রচনার অনুলিপিকার ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের শেষ কবিতা “মৃত্যু” (“দুঃখের আঁধার রাত্রি বারে বারে/এসেছে আমার দ্বারে” লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর স্নেহধন্য এই নারী)তাঁর হাতে লেখা।
এ ছাড়া অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবনী এবং তার দুটি স্মৃতিকথা “জোড়াসাঁকোর ধারে” এবং “ঘরোয়া” তারই অনুলিখন। ১৯৫৪ সালে তার “পূর্ণকুম্ভ” গ্রন্থের জন্য তিনি রবীন্দ্র পুরস্কার লাভ করেন। তার সাহিত্য কীর্তির জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ভুবনমোহিনী স্বর্ণপদক এবং রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাকে ডি.লিট ডিগ্রি দিয়ে সম্মানিত করে। তার রচিত অন্যান্য গ্রন্থ : আলাপচারী রবীন্দ্রনাথ, গুরুদেব, পথে ঘাটে, সব হতে আপন, আমার মায়ের বাপের বাড়ি, শিল্প গুরু অবনীন্দ্রনাথ প্রভৃতি।
তার স্বামীর মৃত্যুর পর ১৯৭২ সালে তিনি শান্তিনিকেতনে ফিরে আসেন এবং তিনি সেখানেই আমৃত্যু কাটান। তার মৃত্যু হয় ২৯-০৬-১৯৯৭।
ছবি: রানী চন্দ সাথে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং স্বামী অনিল চন্দ।
লেখা ও ছবি বইয়ের হাট থেকে সংগৃহীত ।।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে আগস্ট, ২০২০ দুপুর ১:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



