somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিঠি

১১ ই মার্চ, ২০১৫ দুপুর ১:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



(মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ধনাঢ্য বড় দাদার কাছে লেখা চিঠি)

'শ্রীচরণকমলেষু
আপনি বোধহয় জানেন আমি প্রায় দুই বৎসর হইল মাথার অসুখে ভুগিতেছি, মাঝে মাঝে অজ্ঞান হইয়া যাই। এ পর্য্যন্ত নানাভাবে চিকিৎসা হইয়াছে, কিন্তু সাময়িকভাবে একটু উপশম হইলেও আসল অসুখ সারে নাই। কয়েকজন বড় বড় ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করিয়া আমি বুঝিতে পারিয়াছি কেবল ডাক্তারি চিকিৎসার উপর নির্ভর করিয়া থাকিলে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করা সম্ভব হইবে কি না সন্দেহ। অথচ প্রথম অবস্থায় আরোগ্যলাভের ব্যবস্থা না করিলে অসুখ যত পুরাতন হইবে, ততই আরোগ্যের সম্ভাবনা কমিয়া যাইবে। সুতরাং অন্য চিন্তা স্থগিত রাখিয়া সর্ব্বাগ্রে আমাকে সুস্থ হইবার জন্য সর্ব্বপ্রকার চেষ্টা করিতে হইবে।

আমার যতদূর বিশ্বাস, সাহিত্যক্ষেত্রে তাড়াতাড়ি নাম করিবার জন্য স্বাস্থ্যকে সম্পূর্ণ অবহেলা করাই আমার এই অসুখের কারণ। আমার প্রথম পুস্তক ১৩৪০ সালে প্রকাশিত হয়। তিন-চার বৎসরের মধ্যে বাঙ্গালা সাহিত্যের অধিকাংশ সমালোচক স্বীকার করিয়াছেন যে, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের পরবত্র্তী যুগে আমি সর্ব্বশ্রেষ্ঠ লেখক। অবশ্য mass-এর নিকট popular হইতে আমার কিছুদিন সময় লাগিবে, কারণ mass mind নূতন চিন্তাধারাকে অত্যন্ত ধীরে ধীরে গ্রহণ করে। এই নিয়মে শিক্ষিত শ্রেণী ছাড়াও mass-এর মধ্যেও আমার popularity যে ক্রমে ক্রমে বাড়িতেছে তাহার পরিচয়ও আমি পাইতেছি। বাঙ্গালা দেশে সাহিত্যক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা লাভের জন্য আমাকে আর কিছু করিতে হইবে না।

কিন্তু দুঃখের বিষয়, আমি যখন International fame-এর জন্য নিজেকে প্রস্তুত করিতেছিলাম, সেই সময় এই অসুখ হইয়া সব গোলমাল করিয়া দিয়াছে। যে সময়ের মধ্যে এবং যে বয়সে আমি বাঙ্গালা সাহিত্যে যতখানি প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছি, বাঙ্গালা দেশে আর কেহই তাহা পারে নাই। অন্য দেশের সাহিত্যের ইতিহাসেও এরূপ দৃষ্টান্ত নাই। এজন্য আমার স্বাস্থ্যহানি ঘটিবে তাহা আমি জানিতাম, কিন্তু এরূপ একটা অসুখ যে হইবে তাহা আমি কল্পনাও করিতে পারি নাই। সাধারণভাবে স্বাস্থ্য খারাপ হইলে বৎসরখানেক লেখা ও পড়া কমাইয়া দিয়া নিয়মমত থাকিলে স্বাস্থ্য ভালো করা যাইবে আমার এইরূপই ধারণা ছিল।

আমি এক বৎসরকাল আমার এই অসুখ সারাইবার জন্য ব্যয় করিব স্থির করিয়াছি। জোড়াতালি দেওয়া চিকিৎসার পরিবর্ত্তে আরোগ্য লাভের জন্য যাহা কিছু প্রয়োজন সমস্ত ব্যবস্থা করিব, কারণ তাহা না করিলে এই অসুখ সারিবে কি না বলা কঠিন। এক বৎসর চেষ্টা করিয়া যদি আরোগ্য লাভ না করিতে পারি, তাহা হইলে বুঝিতে পারিব আমার যে অত্যন্ত উচ্চ ধসনরঃরড়হ ছিল তাহা সম্পূর্ণরূপে সফল করিতে পারিব না। আংশিক সাফল্য লইয়াই সাধারণভাবে আমাকে জীবন কাটাইতে হইবে। এভাবে বাঁচিয়া থাকিবার ইচ্ছা আমার নাই।

আমি আপনাকে সমস্ত কথা পরিষ্কার করিয়া খুলিয়া লিখিলাম। চিকিৎসার জন্য আমার অর্থের প্রয়োজন আছে, এখন চাকুরীতে আমি যাহা মাহিনা পাই তাহাতে চিকিৎসা চলিবে না। এ পর্য্যন্ত যেরূপ চলিয়াছে সেইরূপ জোড়াতালি দেওয়া চিকিৎসা চলিতে পারে মাত্র।

এই জন্য আমি আপনার নিকট এক বৎসর কালের জন্য মাসিক একশত টাকা করিয়া সাহায্য প্রার্থনা করিতেছি। চিকিৎসার ক্ষতি না করিয়া আমি যাহা উপার্জ্জন করিব এবং এই একশত টাকা করিয়া পাইলে আমি ঠিকভাবে চালাইতে পারিব।

আশা করি আপনি ভাবিয়া দেখিবেন যে, আমার সমস্ত ভবিষ্যৎ এই অসুখ হইতে আরোগ্য লাভের উপর নির্ভর করিতেছে। আমার ইহা সাধারণ অসুখ নহে, ইহার প্রকৃত চিকিৎসার জন্য ডাক্তার, ওষুধ প্রভৃতির খরচ ছাড়াও আরও বহুবিধ খরচ দরকার। আপনার পক্ষে মাসিক একশত টাকা দেওয়া কিছুই নহে, কিন্তু ইহা আমার জীবন মরণ সমস্যা।'

(চিঠিটি জাকির তালুকদারের “মানিক বাঁড়ুজ্জের সাথে যাবার সময়” প্রবন্ধ থেকে নেওয়া। চিঠিটির কী উত্তর এসেছিল কিংবা আদৌ কোনো উত্তর এসেছিল কিনা জানা নেই।)
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই মার্চ, ২০১৫ দুপুর ১:৩৭
১৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আত্মহনন ও পক্ষপাতিত্ব

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:২৮


রবীন্দ্রনাথ কি বাংলাদেশের নাগরিক ??!! শুধুমাত্র জাতীয় সংগীতের রচয়িতা এবং বাংলাদেশে কিছু সুশীলদের (ভালো নাপিত) তাকে নিয়ে নানা রকমের কলহ-বিবাদ-বিভক্তি তৈরী ব্যতিত; বাংলাদেশে তার আর অবদান কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

তারা ভারতের এই সফট টুলস রবীন্দ্রনাথকে রক্ষা করবে।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৩


কয়েকদিন আগে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জাতীর পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলা হলো, সেখানে তো গ্রেপ্তার দেখলাম না! সেখানে কি পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবণতির শঙ্কা ছিলো না? পাকিস্তানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপি হল অথর্ব আর ইডিয়েটদের দল। বর্তমানে এদের দেশ পরিচালানার করার কোন যোগ্যতা ই নেই।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:২৩

রবীন্দ্রনাথের ছবিতে কালি দেয়াটা নিন্দনীয় কিন্ত তার বিচার হবে কিসে? রাষ্ট্রদ্রোহিতা মামলায়?? রিমান্ডে নিয়ে?

চৈতালি চক্রবর্তী সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, সে আইন বুঝে। প্রায় প্রতিদিন জুলাই, আবু সাইদ, বাংলাদেশ সব কিছু সম্পর্কে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এআই মন্তব্যের পর ব্লগারগণের পোষ্ঠ ভালো বুঝে আসে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২০



চাঁদগাজী/সোনাগাজী বলতেন অনেক ব্লগার গরুর রচনা এবং অনেক ব্লগার গার্বেজ লেখেন। তাঁর এমন মন্তব্যের কারণে তাঁর বিরোধী ব্লগার সংখ্যা বেড়ে যায়। ফলে তিনি বার বার ব্যানের শিকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

=মনে রং নেই আর=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৫২


মন তো ছিল গোলাপী রঙ আভায় বন্দি, মন ছিল চন্দ্র মল্লিকা,
মন আর সেই মন নেই, মনের চারিপাশে এক সমুদ্দুর কুহেলিকা;
মন যেন পাথর হয়ে আছে, নেই অফুরন্ত ফুরসত
মন গোলাপী রঙ নয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×