somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিজয় দিবসের কথা :)

১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৪ দুপুর ১২:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

৪৩ বছর আগের কথা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়য়ে গণিতের একজন অধ্যাপক ছিলেন, নাম মুজিবর রহমান। বেশ সহজ সরল একজন মানুষ, কারো সাতেও নেই, কারো পাঁচেও নেই, কারো সাত যোগ পাঁচ= বারোতেও তিনি নেই। রাজনীতির কোন ধার ধারতেন না তিনি। কিন্তু ভুল যা হওয়ার তা তার নামেই ছিল, শেখ মুজিবরের সাথে নামে মিল থাকার কারণেই হয়ত পাকিস্তানীরা তাকে ধরে নিয়ে এত বেশি অত্যাচার করেছিল যে যুদ্ধের শেষ দিকে ছাড়া পেয়ে নিজের মুসলমানি নাম ত্যাগ করে "দেবদাস" নাম গ্রহণ করলেন তিনি। ইসলাম ধর্মের উপরেই বিশ্বাস হারিয়ে ফেললেন তিনি। তাঁর মানসিক ভারসাম্য আর কোনদিন স্বাভাবিক হয় নি।

কি এমন অত্যাচার? নমুনা দেয়া যাক- ছাদের সঙ্গে পা বেঁধে ঝুলিয়ে মারা, হাতের নখ তুলে ফেলা, এক একটা অঙ্গ কেটে নিয়ে নির্যাতন করা, ইলেকট্রিক শক দেয়া- যত রকমের নিষ্ঠুর অত্যাচার কল্পনা করা যায়। (১)

যুদ্ধের ফলে ব্যাপকহারে এবং দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত আর একটা শ্রেণী হলেন নারীরা। কারণ নারীরা তো শুধু মানুষ নন, তাঁদের প্রতি বাড়তি একটা আকর্ষণ আছে- "যৌন আকর্ষণ"। "ধর্মপ্রাণ" পাকিস্তানীরা তাঁদের ধর্ষণ ও গণধর্ষণ করত, বালিকা, যুবতী, কিশোরী, মহিলা- কাউকেই তারা রেহাই দেয় নি। পরিবারের সদস্যদের সামনে ধর্ষণ করা, কিশোরী মেয়েদের যোনিপথ ছোট থাকায় বেয়নেট দিয়ে কেটে বড় করে নিয়ে ধর্ষণ করার কথাও জানা যায়।(২) যুদ্ধের গোড়ার দিকে এক ব্রিটিশ সাংবাদিক হোটেল ইন্টারকনে ছিলেন। তিনি ধর্ষণের বর্ণনা দিয়েছিলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়য়ে এক হলে এক একটি মেয়েকে ১০/১২ জন মিলে ধর্ষণ করেও পাকিস্তানীদের খায়েশ মিটেনি, এরপরে তারা তাঁদের সাথে করত পায়ু-সঙ্গম। (৩)

আরও অবিশ্বাস্য কিছু ঘটনা ছিল। কোন কোন স্বামী স্ত্রীকে ধর্ষণের জন্য এগিয়ে দিয়ে নিজেকে রক্ষার চেষ্টা করেছেন- আপনি বাঁচলে বাপের নাম বলে কথা! বউ তো অনেক পাওয়া যাবে বেঁচে থাকলে! এ রকমের একজন পত্রিকার সম্পাদকের কথা জানা যায়, যদিও সম্পাদক যে পাকসেনাকে নিজের বউ উপহারস্বরূপ প্রেরণ করছিলেন- সেই পাকসেনা তাঁর বউকে গ্রহণ করেননি। (৪)
মুক্তিযুদ্ধে ধর্ষিতার সংখ্যা দুই বা তিন লাখ বলা হলেও, আসল সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হওয়ার কথা বলে মত বিশ্লেষকদের। কারণ অনেক ক্ষেত্রেই ধর্ষণের কথা গোপন করেছে পরিবার, বিশেষ করে "ভদ্রলোকেরা"। যারা আবার সাহস করে নিজেদের উপরে ঘটে যাওয়া নির্যাতনের কথা প্রকাশ করেছেন, যুদ্ধের পরে তাঁদের আর বিয়ে হয়নি- কেও তাঁদের গ্রহণ করেনি- না সমাজ, না পরিবার। সবাই "পবিত্র" মানুষের সাথে থাকতে চায়, "নষ্ট মেয়েমানুষের" সাথে থেকে নিজেদের পবিত্রতা(!) কেও নষ্ট করতে চায়না।

আরও কিছু নমুনা শোনা যাক অত্যাচারের- গণধর্ষণের পর বেয়নেট দিয়ে যোনিপথ কেটে হত্যা করা ( এই অত্যাচারের বর্ণনা লিখতে আমার যে কি পরিমাণ কষ্ট হচ্ছে এটা শুধু আমি জানি!), স্তন কেটে ফেলা, ধর্ষণ করতে করতে মেরে ফেলা, অর্ধমৃত অবস্থায় রাস্তায় ফেলে রাখা, শরীরের জামা কাপড় খুলে কোন রুমে আটকে রাখা যাতে পালাতে না পারে- সবই করা হয়েছিল উল্লাসের সাথে। (৫)

এতসব কথা কেন বলছি? কারণ স্বাধীনতার ৪৩ বছর পরেও শুনতে হয়- যা হওয়ার হইসে, এগুলো এত মনে রেখে কি হবে? এখন সামনে আগানোর দিন- কথা সত্য, কিন্তু অতীতকে অস্বীকার করে সামনে আগানো যায়না। ডিয়ার ফেসবুক আর সেলফি প্রজন্ম- তোমাদের কাছে এইসব হলিউড বা বলিউড এর কোন কাহিনী মনে হইতে পারে বা কোন হিট সিনেমার স্ক্রিপ্ট মনে হইতে পারে- কিন্তু দুঃখের কথা হল- এসব সত্যি- যেমন সত্যি চাঁদ আর সূর্য। রাজাকারদের বয়স হইসে, এখন বিচার করে কি হবে, ওরা তো এমনেই মারা যাবে, শাস্তি দিলে সৃষ্টিকর্তা শাস্তি দিবেন, আমরা কে শাস্তি দেয়ার- এগুলো বলা অনেক সহজ, কিন্তু নিজের স্বজন হারাও নাই তো ডিয়ার নতুন প্রজন্ম- তাই বুঝবা না স্বজন হারানোর কষ্ট! নিজের সদ্য জন্ম নেয়া শিশুকে দেয়ালে আছড়ে মারা হয়েছে যেই মায়ের চোখের সামনে- পারলে সেই মায়ের সামনে যেয়ে এই কথা বইল! যেই ভাইয়ের চোখের সামনে তাঁর বোনের স্তন কেটে ফেলা হইসে, তাঁর সামনে যেয়ে এই কথা বইল পারলে। মুক্তিযুদ্ধকে বুঝতে না পার, স্বজন হারানোর ব্যথা হয়ত বুঝতে না পার, তাতে সমস্যা নাই তেমন- কিন্তু এই ধরনের ক্ষমার কথা বইল না দয়া করে, ক্ষমা মানুষকে করা যায়, মানুষরূপী পশুকে না।

মুক্তিযুদ্ধ এত সহজ না, আমার দেশের পতাকা এত সস্তা না, সিনেপ্লেক্সে সিনেমার শুরুতে পতাকা দেখানো হইলে আয়েশ করে বসে থাকা কোন "কুলনেস" না, যারা পতাকার সামনে দাঁড়ায় সম্মান প্রদর্শনের জন্য- তাঁদেরকে টিজ করা কোন "মডার্ননেস" এর অংশ না। পারলে কোনদিন লাল সবুজ পতাকার দিকে একটু মনোযোগ দিয়ে তাকানোর চেষ্টা কইর- মানুষের আত্মত্যাগ দেখার চেষ্টা কইর এই কাপড়ে, পারলে শোনার চেষ্টা কইর লাখ লাখ মা বোনের ধর্ষণের চিৎকার।

সবাইকে বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা। বাংলাদেশ আগাবেই- দাবায় রাখতে পারবা না!

পুনশ্চঃ ১- মুক্তিযুদ্ধ ও তারপর- একটি নির্দলীয় ইতিহাস- গোলাম মুরশিদ- প্রথমা প্রকাশনী
২- যুদ্ধ ও নারী- ডঃ এম এ হাসান- তাম্রলিপি প্রকাশনী
৩-The Black Book of Genocide in Bangladesh - Jagmohan- New delhi : Geeta book centre
৪- Witness to Surrender - Siddiq Salik- Oxford University press, 1978
৫- একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ রক্তাক্ত মধ্য আগস্ট ও ষড়যন্ত্রময় নভেম্বর- শাফায়াত জামিল- সাহিত্য প্রকাশ

বাই দ্যা ওয়ে, শুধু সিনেমা সম্পর্কেই টুকটাক জানি-তা না, নিজের দেশ আর মুক্তিযুদ্ধ নিয়েও কিছু জানি, অন্তত জানার চেষ্টা করি।
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দেশভাগ এবং ধর্ম- অধর্ম

লিখেছেন রাজীব নুর, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৪



শীতের শেষে সমস্ত গাছের পাতা ঝরে পড়ে।
তখন পাতা ছাড়া গাছ একদম রুগ্ন মনে হয়। শুকনো পাতা দিয়ে মাটির পথ ঢেকে যায়। সেই পথ দিয়ে কোনো পথিক হেটে গেলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিরো থেকে হিরো (মহাজগৎ সংক্রান্ত) - পর্ব-১

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫০




কোন কিছুর অস্তিত্ববিহীন অসীম শূন্যে উদ্ভব ঘটেছে সকল বস্তু ও শক্তি উপাদানের। তাতে কোন স্থান না থাকায় উক্ত বস্তু ও শক্তি উপাদান সমূহ একে অপরের স্থান হয়েছে। সুতরাং... ...বাকিটুকু পড়ুন

শব্দের শক্তি, ভাষার মাধুর্য....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:৫২

এমিরেটস, কাতার এয়ার লাইন্স ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট রিক্রুটমেন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে গ্রুপ ডিসকাশন। গ্রুপ ডিসকাশনের সারমর্ম হচ্ছে—৬-৮ জন কয়েকটি গ্রুপে একটি নির্দিষ্ট টপিক নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবে। নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বলুন - "হ্যালো আল্লাহ্‌, আমি এখনো বেঁচে আছি!"

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:৫৫

আপনার কাছে মনে হচ্ছে, আল্লাহ্‌ আপনার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
তিনি আপনার দোয়া কবুল করছেন না।
আপনার কাছের মানুষকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন।
আপনার কোন চাকরী নাই। রিজিক ছোট হয়ে এসেছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

উচ্চবংশীয় ছাগল!

লিখেছেন রাজীব নুর, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:০৯



এককালে কেবল ঘড়িতেই বাজতো টিক টিক- টিক টিক;
বারবেলায় এসে দেখছি টিক টিক বলে কিছু নেই আর ঠিক ঠিক!
বরং 'টিকটক'- এ আকণ্ঠ বুদ হয়ে আছে আবালবৃদ্ধবনিতা!
মানুষের লম্ফঝম্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

×