যেই বয়সে একজন ছেলে বা মেয়ে সিদ্ধান্ত নেয়- আচ্ছা, হাইয়ার এডুকেশন এর জন্য আমি কি সাইন্স নিব নাকি কমার্স? নাকি আর্টস নিলে ভালো হয়?- সেই বয়সে এই মানুষটাকে সংসারের হাল ধরতে হয়েছিল, সেই বয়সে এই মানুষটা সংসারের হাল ধরার জন্য ক্যামেরার পিছনে দাঁড়িয়েছিলেন, খুবই অল্প বয়স সেটা তার কাজের তুলনায়- মাত্র ১৭!
বাবা ছিলেন সিনেমার বিখ্যাত একশন ডিরেক্টর এমবি শেত্তি। ছোটবেলায় যেকোনো মানুষের প্রিয় "হিরো" থাকেন তাদের বাবা, সুতরাং বাবার কাজকেই ভবিষ্যতে নিজের পেশা বানাবেন বলে ভেবে রেখেছিলেন। তার "ভাবনা" কিছুদিন পরেই "বাধ্য হয়ে" তাকে বাস্তবে রূপ দিতে হয়- কোন বলা নেই, কওনা নেই- হঠাৎ করে তার বাবা চলে গেলেন না ফেরার দেশে। অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল তখন তার, বাসে ভ্রমণ করার মতো টাকাও পকেটে ছিল না।
প্রথম যেই সিনেমাতে তিনি অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর ছিলেন, তার নাম ছিল ফুল অউর কাটে- নায়ক হিসেবে ছিলেন অজয় দেবগন। সহকারী পরিচালক হিসেবে তার আয় ছিল মাত্র ৩৫ রুপি। এই সিনেমাতে প্রথম অজয় দেবগন দুটি চলন্ত বাইকের উপরে ভারসাম্য রেখে দুর্দান্ত এক এন্ট্রি নেন, সেই "ভিএফএক্স"হীন যুগে। এই সিনটা তার মনে এমনই নাড়া দেয়, সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন যে নিজে কোনোদিন সিনেমা বানালে এরকম দৃশ্য মাস্ট রাখবেন তার সিনেমাতে। অনেক সিনেমাতে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করার পরে এবার নিজে ডিরেক্টর হলেন, নায়ক হিসেবে নিলেন সেই অজয় দেবগণকে, সাথে ছিলেন অভিষেক বচ্চন- কিন্তু বিধি বাম! প্রথম সিনেমা বক্স অফিসে চরম ব্যর্থ।
সমালোচকেরা যেন সার্ফ এক্সেল দিয়ে "ধুয়ে" দিলেন তাকে আর তার প্রথম সিনেমা "জমিন" কে। কিন্তু হার মানলেন না, তার রক্তেই ছিল না সেটা, তিন বছর পরে আবার হাজির হলেন অজয়ের কাছে, একেবারেই ভিন্ন ধরনের কমেডি একটা সিনেমার (গোলমাল) আইডিয়া নিয়ে। অজয় একবারও বললেন না "তোমার সাথে করা আমার প্রথম সিনেমাই তো ফ্লপ, তোমার সাথে আর কাজের ইচ্ছা নাই", উল্টো সাথে সাথেই রাজি হয়ে গেলেন! অজয়ের এমন ব্যবহার তাকে বেশ মুগ্ধ করেছিল, তখন থেকেই অজয়ের সাথে তার এক অদ্ভুত সম্পর্ক আর অদ্ভুত কেমিস্ট্রি আছে, যেটা বলিউড এর অনেক নায়ক নায়িকার মাঝেও পাওয়া যায় না
বলিউড এর প্রথম "ট্রিলজি" বানিয়েছেন তিনি, গোলমাল শিরোনামে। অজয় দেবগণকে তার ক্যারিয়ারের প্রথম ১০০ কোটি সিনেমার মালিক বানিয়েছেন তিনি, ২০১০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত সাউথের সিঙ্ঘাম সিনেমার রিমেকের মাধ্যমে, রিমেক হলেও- এটাতে নিজের পরিচালনার ছাপ রেখেছিলেন তিনি, ১২৭ দিনের প্রতিদিন ২০ ঘণ্টার পরিশ্রমের মাধ্যমে। একের পর এক ব্যবসাসফল সিনেমা দিয়েই যেতে লাগলেন তিনি, কারো মনেই থাকল না এই মানুষটার ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল একটা ফ্লপ সিনেমা দিয়ে।
মানুষটার নাম অনেক আগেই বুঝে ফেলার কথা, রোহিত শেত্তি। কমার্শিয়াল সিনেমা বানাতে যার জুড়ি মেলা ভার। সূর্য যেমন পূর্ব দিকে উঠে, তেমনি রোহিতের সিনেমাতে গাড়ি উড়বে- সূর্য ওঠার মতই এটা চিরন্তন সত্য। বেলা বাড়ার সাথে সাথে যেমন সূর্যের তেজ বাড়ে, তেমনি নিজের আগের সিনেমার চেয়ে নিজের পরের সিনেমাতে তিনি গাড়ির কারবারি আরও বেশি বাড়াতে থাকেন (উদাহরণস্বরূপ তিনি বোল বচ্চন সিনেমাতে বাস উড়িয়েছিলেন
একটা সময় সমালোচকদের মন্তব্য শুনলে অনেক রেগে যেতেন, এখন গা সহা হয়ে গেছে, উল্টো এখন তিনি কানই দেন না সমালোচকদের কথায়, তাদের কোন রিভিউ পড়েন না। নিজের সিনেমা আর টার্গেট অডিয়েন্স সম্পর্কে তিনি বলেন "আমি তো কখনোই বলি না যে আমি ফরেস্ট গাম্প এর মতো মাস্টারপিস বানাচ্ছি! আমি তো ঘোষণাই দিয়েই নামি যে আমি নাচ-গানে-একশন-কমেডির একটা কমার্শিয়াল সিনেমা বানাচ্ছি- তাহলে আমার সিনেমা সম্পর্কে এত কথা কীসের? এমন তো না যে আমি মাস্টারপিসের কথা বলে পাবলিকের সাথে প্রতারণা করে তাদেরকে সস্তা জিনিস গেলাচ্ছি! আর সস্তা আর দামীর সংজ্ঞা কি? এটা কে ঠিক করবে? সমাজের উচ্চবিত্তরা না বুদ্ধিজীবীরা? তাদের কাছে যেটা ভাল্লাগবে সেটাই "ভালো" আর যেটা ভালো লাগবেনা সেটাই সস্তা, সেটাই ডাব বিক্রেতার জন্য? ডাব বিক্রেতার কি পার্সোনাল চয়েস থাকতে পারে না? তাকে কেন জোর করে "মেসেজ" সমৃদ্ধ সিনেমা দেখতে হবে? আর এতই যদি মেসেজওয়ালা সিনেমা দেখার ইচ্ছা থাকে, তাহলে ডকুমেন্টরি দেখেন, বই পড়েন- আমার সিনেমা কেন? আমি শুধুই এন্টারটেইনমেন্ট এর জন্য সিনেমা বানাই, আর কিছু না। আমার কাছে সিনেমা মানে যতক্ষণ আপনি হলে থাকবেন, ততক্ষন আমি হাসবেন, কাঁদবেন, চিৎকার করবেন, আপনার হার্ট পাম্প করবে- সেটাই আমার কাছে সিনেমা। হ্যাঁ, থ্রি ইডিয়টস বা চাক দে ইন্ডিয়া অনেক ভালো সিনেমা, আমার কাছে খুব ভালো লাগে- কিন্তু আমার দ্বারা সেটা বানানো সম্ভব না, আমার সেই ট্যালেন্ট নাই। আমার দ্বারা যেটা সম্ভব, আমি সেটাই বানাব। কোনোদিন এন্টারটেইনমেন্ট আমার সিনেমাতে কম পেলে আমাকে বলবেন- সেই অভিযোগ আমি মাথা পেতে নিতে রাজি। হলিউড এ মাইকেল বে ১০০ টা গাড়ি ওড়াবেন- সেটা খুব সুন্দর লাগবে দেখতে, আর আমি ২০ টা গাড়ি উড়ালেই দোষ? বাজেট বা প্রযুক্তির কথা বলবেন? কোন সমস্যা নাই, আমাকে হলিউড এর মতো বাজেট দেন, আমি সেরকম জিনিস বানাতে পারব- এটা নিজের সম্পর্কে আমার আত্মবিশ্বাস, অভার কনফিডেন্স না- কারণ আমি জানি আমি কি চাই, আমি কি পারি।আমি তো আমার সিনেমাতে কোন vulgarবা অশ্লীল জিনিস রাখি না, নারীর নগ্ন দেহ দেখাই না সিনেমার ব্যবসা বাড়ানোর জন্য- তারপরেও সব দোষ কেন আমার? মাস পিপল নিয়ে এত সমস্যা আপনার- অথচ আপনি ভুলে যান এই সমাজ গড়েছে ঐ মাস পিপলই।"
নিজের সব সিনেমার শুরুতে বা শেষে একজন ডিরেক্টরের নাম দেখা যায়- এটা স্বাভাবিক, সব দেশের সিনেমাতে হয়। কিন্তু রোহিত শেত্তি সম্ভবত একমাত্র ডিরেক্টর, যার সিনেমাতে নামের জায়গায় দেখা যায়- Rohit Shetty and his team.
সবসময় অজয়ের সাথে কাজ করে কিছু সময় আগে তিনি কাজ করেছেন শাহরুখ খানের সাথে, চেন্নাই এক্সপ্রেস নামক সিনেমায়- এবং যথারীতি রেকর্ড ব্রেকিং বিজনেস। তারমানে কি অজয়ের সাথে তার সম্পর্ক শেষ? "যখন অজয়ের সাথে কাজ করতাম, তখন মানুষ বলত- অজয় কেন খালি?যখন শাহরুখের সাথে আসলাম, তখন জিজ্ঞেস করে-অজয় নাই কেন?- আমি আসলে বুঝি না মানুষ এমন ক্যান! অজয়ের সাথে আমার অনেক ভালো সম্পর্ক, ঠিক তেমন সম্পর্ক শাহরুখ এর সাথে"। এই সম্পর্কের কারণেই হয়ত নিজের পরের সিনেমাও শাহরুখ এর সাথে করতে যাচ্ছেন। এই বছরের শেষের দিকে রিলিজ পাওয়ার কথা, সেপ্টেম্বরে শাহরুখ এর "ফ্যান" সিনেমার রিলিজের পরে।
আজকে অসাধারণ এক দামি প্রতিভা আমির খানের জন্মদিন। সবাই যখন তাকে উইশ করছে , তখন হঠাৎ কেন জানি আমার এই "সস্তা" পরিচালকের কথা মনে পড়ল! হ্যাঁ, আজকে রোহিত শেত্তির শুভ জন্মদিন। একের পর এক সাফল্য এই মানুষটাকে এখনও আগের মতই রেখেছে, কোন চেঞ্জ করেনি, এখনও তিনি খুবই সাধারণ মানুষের মতো চলাফেরা করেন। সাফল্যের "চেন্নাই এক্সপ্রেস" এ করে হয়ত অনেক উপরে উঠেছেন তিনি, তবে মানুষ হিসেবে এখনও তিনি পৃথিবীর "জমিন" এই আছেন
জন্মদিনের অনেক শুভেচ্ছা। ইনসেপশন আর প্রিডেসটিনেশন এর মতো মাথা আউলানো সিনেমার পরে আপনার সিনেমাই আমাকে একটু রিফ্রেশ করে- হোক না সেটা 'সস্তা", দুনিয়ার সবাই "দামি" কাজ করলে, সস্তা কাজগুলো কে করবে শুনি?


অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




