somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

সত্যপথিক শাইয়্যান
অন্যদের সেভাবেই দেখি, নিজেকে যেভাবে দেখতে চাই। যারা জীবনকে উপভোগ করতে চান, আমি তাঁদের একজন। সহজ-সরল চিন্তা-ভাবনা করার চেষ্টা করি। আর, খুব ভালো আইডিয়া দিতে পারি।

নীরজা, আপনি যেখানেই থাকুন, আপনার জন্যে একরাশ শ্রদ্ধা নিরন্তর :|

৩১ শে মে, ২০২৬ রাত ১:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



করাচি বিমানবন্দর। ৫ সেপ্টেম্বর, ১৯৮৬। ভোর ৫টা। প্যান অ্যাম ফ্লাইট ৭৩ মুম্বাই থেকে এসে সবেমাত্র ল্যান্ড করেছে। গন্তব্য নিউ ইয়র্ক। বিমানে যাত্রী এবং ক্রু মিলিয়ে প্রায় ৩৮০ জন মানুষ। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে, কিন্তু রানওয়ের নিস্তব্ধতা ভেঙে হঠাৎ সাইরেনের মতো বেজে উঠল এক বিপদ সংকেত। রানওয়েতে ঢুকে পড়ল চারজন সশস্ত্র জঙ্গি। তাদের হাতে একে-৪৭, গ্রেনেড এবং বেল্টে বিস্ফোরক। তারা ছিল ফিলিস্তিনি জঙ্গি সংগঠন 'আবু নিদাল'-এর সদস্য।

বিমানের দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন সিনিয়র ফ্লাইট পার্সার, মাত্র ২২ বছরের সুন্দরী তরুণী নীরজা ভানোট। তার ২৩তম জন্মদিন আসতে আর মাত্র দুদিন বাকি। জঙ্গিরা ভেতরে ঢুকেই এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করল। নীরজা মুহূর্তে বুঝতে পারলেন পরিস্থিতি ভয়ানক। তিনি দ্রুত ইন্টারকমের মাধ্যমে ককপিটে হাইজ্যাকের সংকেত পাঠিয়ে দেন। তার বুদ্ধিমত্তায় পাইলট, কো-পাইলট এবং ফ্লাইট ইঞ্জিনিয়ার ককপিটের ওপরের 'ওভারহেড হ্যাচ' দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। ফলে বিমানটি আর ওড়ানোর উপায় রইল না।

পাইলটরা পালিয়ে যাওয়ায় বিমানের দায়িত্বে এখন একা নীরজা। জঙ্গিরা ক্ষিপ্ত। তারা নীরজাকে হুকুম দিল যাত্রীদের পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল আমেরিকান নাগরিকদের খুঁজে বের করে হত্যা করা।

শুরু হলো এক অদ্ভুত স্নায়ুযুদ্ধ। নীরজা জানতেন, পাসপোর্টগুলো জঙ্গিদের হাতে দেওয়া মানেই বিমানে থাকা ৪৩ জন আমেরিকান যাত্রীর মৃত্যুদণ্ড। তিনি তার সহকর্মীদের ইশারা করলেন। বিমানের আবছা আলোয়, জঙ্গিদের চোখের আড়ালে শুরু হলো এক বিপজ্জনক খেলা। নীরজা এবং তার টিম আমেরিকান পাসপোর্টগুলো বেছে বেছে লুকিয়ে ফেলতে লাগলেন। কিছু পাসপোর্ট লুকানো হলো সিটের নিচে, কিছু ফেলে দেওয়া হলো ময়লা ফেলার ঝুড়িতে (Garbage Chute)। জঙ্গিরা যখন পাসপোর্ট চেক করল, তারা আমেরিকান ও নন-আমেরিকান যাত্রীদের আলাদা করতে পারল না। নীরজার এই উপস্থিত বুদ্ধি সেদিন বোকা বানিয়েছিল মৃত্যুর দূতদের।

ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাটছে। ১৭ ঘণ্টা। করাচির রোদ চড়া হচ্ছে, আবার নিভে যাচ্ছে। বিমানের ভেতরে এসি বন্ধ, অসহ্য গরম, আর দমবন্ধ করা আতঙ্ক। নীরজা হাসিমুখে যাত্রীদের জল দিচ্ছেন, খাবার দিচ্ছেন। তিনি পালিয়ে যাননি, তিনি লড়েছিলেন।

রাত নামল। বিমানের পাওয়ার সাপ্লাই ইউনিট বন্ধ হয়ে গেল। ঘুটঘুটে অন্ধকার। এই অন্ধকারই জঙ্গিদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে দিল। তারা ভাবল কমান্ডোরা হয়তো অ্যাটাক করবে। প্যানিক করে তারা এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করল। গ্রেনেড ফাটাল। বিমানের ভেতরে তখন নরক গুলজার।

নীরজা তখন সাহসের চরম পরাকাষ্ঠা দেখালেন। তিনি ইমার্জেন্সি এক্সিট বা জরুরি দরজা খুলে দিলেন। তিনি চাইলেই সবার আগে স্লাইড দিয়ে নেমে নিজের প্রাণ বাঁচাতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করলেন না। তিনি দরজার পাশে দাঁড়িয়ে যাত্রীদের একে একে ঠেলে বের করে দিতে লাগলেন।

সবাই যখন নামছে, তখন নীরজা দেখলেন তিনটি ছোট শিশু সিটের আড়ালে ভয়ে কুঁকড়ে আছে। তিনি তাদের হাত ধরে টেনে নিয়ে এলেন দরজার দিকে। কিন্তু ততক্ষণে জঙ্গিরা তাকে দেখে ফেলেছে। পেছন থেকে এক জঙ্গি এসে নীরজার চুল ধরে টান মারল। তারপর খুব কাছ থেকে (Point blank range) তাকে গুলি করল।

নীরজার শরীর ঝাঁঝরা হয়ে গেল। রক্তে ভিজে গেল ইউনিফর্ম। কিন্তু শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে তিনি নিশ্চিত করলেন ওই তিনটি শিশু নিরাপদে স্লাইড দিয়ে নেমে গেছে।

৭ সেপ্টেম্বর ছিল তার জন্মদিন। তার বাবা হরিশ ভানোট চেয়েছিলেন মেয়েকে জন্মদিনে সারপ্রাইজ দেবেন, কিন্তু ৫ সেপ্টেম্বর তিনি পেলেন মেয়ের কফিন। নীরজা আগে মডেলিং করতেন, তার সৌন্দর্য ছিল মুগ্ধ করার মতো। কিন্তু সেই রাতে তিনি যে সৌন্দর্য দেখিয়েছিলেন, তা ছিল তার আত্মার সৌন্দর্য।

ভারত সরকার তাকে মরণোত্তর 'অশোক চক্র' সম্মানে ভূষিত করে। তিনি এই সম্মান পাওয়া প্রথম নারী এবং তৎকালীন সময়ে সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি। পাকিস্তান সরকার তাকে 'তমঘা-ই-ইনসানিয়াত' (মানবতার জন্য পদক) প্রদান করে।

আজও যখন আমরা বিমানে চড়ি, এয়ার হোস্টেসদের দেখি, তখন হয়তো ভাবি তাদের কাজ শুধু খাবার পরিবেশন করা। কিন্তু নীরজা ভানোট প্রমাণ করে গেছেন, ইউনিফর্মের পেছনের মানুষটি প্রয়োজনে সুপারহিরো হয়ে উঠতে পারে। ১৭ ঘণ্টার সেই অন্ধকারে তিনি একাই ছিলেন আলোর মশাল।

স্যালুট নীরজা ভানোট। আপনি আমাদের শিখিয়েছেন, ছোট জীবনেও কীভাবে বড় কাজ করে অমর হওয়া যায়।

Source:

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া (Neerja Bhanot), সারভাইভারদের বয়ান এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের আর্কাইভ।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে মে, ২০২৬ রাত ১:২৮
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ পাঠের সওয়াব

লিখেছেন শিমুল মামুন, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৪৬


লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। এর ফজিলত ও সওয়াব অনেক বেশি। আমলটি করার ব্যাপারে হাদিসে অনেক বর্ণনা এসেছে।

সাগরের ফেনা পরিমাণ গুনাহ মাফ হয়
আবদুল্লাহ ইবনে আমর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সী পার্ল এবং চারপাশ

লিখেছেন রোকসানা লেইস, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:১৪


খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গল। সূর্য তখনও জাগেনি। ব্যালকুনিতে গিয়ে বসলাম কিছুক্ষন। সামনে সাগর আপনমনে ঢেউ তুলে নাচছে। একজন মানুষও নাই সাগরপাড়ে। এমন নিরিবিলি সাগরপাড়ই চেয়েছিলাম। যেখানে পুরোটাই আমার থাকবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ড. ইরফান আল-হোসাইনীর রহস্যজনক মৃত্যু - জীবনের চেয়ে কোনো সম্পর্ক বড় নয়

লিখেছেন এমএলজি, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৪০

= ড. ইরফান আল-হোসাইনীর রহস্যজনক মৃত্যু - জীবনের চেয়ে কোনো সম্পর্ক বড় নয় =

বিশ্বখ্যাত আমেরিকান বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানি এনভিডিয়া (NVIDIA)-তে কর্মরত, বুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং অত্যন্ত সম্ভাবনাময় তরুণ বিজ্ঞানী ড.... ...বাকিটুকু পড়ুন

হয় না দেখা আর

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩৩


কতদিন হলো, হয় না দেখা
রঙধনু মেলা, শীত কাটে না
আর ঐশ্বর্য উষ্ণ বেলা
চঞ্চলতায় টিপুটিপু খেলা;
বিস্মৃতির পাতায় ডুবে যাচ্ছে
চাঁদ না দেখার আর্তনাদ,
ভেঙ্গে পরেছে অমোঘ
অপেক্ষায় দীর্ঘশ্বাস ঘুণ ধরেছে
নুনে পরেছে সময়ের ছলনা
মুখ ফিরেছে বাতাসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ শেষ জীবনে

লিখেছেন সামিয়া, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৯



ঘুমিয়ে থাকা একজন মানুষ কখনো কখনো জেগে থাকা একজন মানুষের চেয়ে অনেক বেশি ভালো থাকতে পারে? কথাটা শুনতে অদ্ভুত। কিন্তু বয়স হলে মানুষ অনেক অদ্ভুত কথাই বিশ্বাস করে চিন্তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×