somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সাগর!

০২ রা জুলাই, ২০০৬ ভোর ৪:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সাগর এখনো ঢাকায় আছে। দিন তিনেক থাকবে। তারপর ফিরে যাবে চট্টগ্রামে। ও ঢাকায় এলে গুটিয়ে যায়। বলে, তোর শহরটা একটা মরা শহর। যখন শহরে প্রবেশ করি তখন মনে হয় একটা কূফা জঞ্জাল শহরে প্রবেশ করলাম। দম বন্ধ হয়ে আসে। থাকিস কি করে এখানে? এক কাজ কর, অতীতে চলে আয়। ওখানে প্রচুর সবুজ বাতাস। তুই শ্বাস নিবি, তুই পথ হারাবি।
স্বপ্নময় দুহাত মাথার উপর দিয়ে রেলিং এ শুয়ে মেঘ দেখে। কিছু বলে না। বলার কিছু নেই।

ছোট ছোট কথার ফাঁকে সাগর হঠাৎ উদাসী হয়ে যায়। রেলিং এ পা ঝুলিয়ে মাথাটা একপাশে হেলে আকাশের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বলে-
--- ছোটবেলার সব কথা তোর মনে পড়ে?
--- উঃ সব না; কিছু কিছু মনে পড়ে। তোকে মার দেবার ঘটনাগুলো খুব মনে পড়ে। স্বপ্নময় অলস হাসি হাসে।
--- আমার বাবার কথা তোর মনে আছে? কথাগুলো সে মিনমিনিয়ে বলে। খুব কষ্ট করে শুনা লাগে।
--- হঁ্যা, বাজারে তোদের একটা বড় দোকান ছিল। বাজার উঠলে আমাকে সঙ্গে নিতি। তোর বাবা চার আনা'র লাল গোলগোল কিযেন খাওয়াতো। মিষ্টি-ই ছিল মনে হয়।
--- বেশ এটুকুই?
--- হুম; তবে আরও একটা ঘটনা মনে পড়ে। তোর বাবা একদিন ইয়া বড় ছোরা নিয়ে কাদের যেন মারতে যাচ্ছিল!
--- বাবাটা কিভাবে মারা গেলরে?
--- কি করে বলি? আমিও তো তখন ছোট ছিলাম। কত বয়স হবে, বড়জোর 5।
--- তিনি বেঁচে থাকলে আমার জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো।
--- তা হয়তো।
--- তা হয়তো কিরে? এত কষ্ট কি করা লাগতো? লেখাপড়াটা করতে পারলাম না। টাকার জন্য ম্যাট্রিক পরীা দিতে পারলাম না দেখে মা'টা গুমড়ে কত কাঁদলো। আজও আমি বুকের ভেতরের কষ্টটাকে বের করতে পারিনি। মাঝে মাঝে বুকটা খুব ভেঙ্গে যেতে চায়রে...।

স্বপ্নময় মাঝে মাঝে খুব আবেগী হয়ে যায়। যখন কাছাকাছির মানুষজন তাকে হতাশার গল্প শুনায় তখন তার কান্নার বাঁধ ভেঙ্গে যেতে চায়। তার খুব খুব খুব কাঁদতে ইচ্ছে করে। কান্নারা দুচোখের ডগায় সংগ্রম শুরু করে দেয়। ও উঠে বসে। রেলিং এ পা ঝুলিয়ে সাগরের পাশে এসে বসে। কিছুন দুজন নিরব থাকে। সময় কাটে। রাত গড়ায়। মেঘগুলো চাঁদটাকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে ছুটে যায়। এলোমেলো বাতাস চারদিকে।
--- আমার বাবাটা বেঁচে আছেন, কি লাভ হয়েছে? আমার জীবনটা পাল্টে গেছে? তোর মনে আছে, সেসব দিনের কথা...? তিনি সেযে সকালে বের হতেন বাড়ী কবে ফিরবেন তা কেউ বলতে পারতো না। মাঝে মাঝে মাসও কাবার হয়ে যেত; তারপরও তিনি আসতেন না। একের পর এক জমি বিক্রি করলেন। টাকা উড়ালেন। ভাইয়াটা সারা জীবন কষ্টই করে গেল। পড়ালেখাটা বিসর্জন দিলো। আমার খুব মনে পড়ে সেসব দিনের কথা। বাবার প্রতি কখনোই কোন টান ছিলনা। তার আদর পাইনি কোনোদিন... অথচ তিনিই নাকি আমাকে খুব পছন্দ করতেন।
--- হু, মনে পড়ে। তোদের সাথে আমিও কতদিন বসে ছিলাম কাঠের ছোট সাঁকোটাতে।
--- ভাইয়া কাজ সেরে রাতে বাড়ি ফিরতো। আমি আর ছোটো... দুই ভাই/বোন সাঁকোটায় সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত বসে থাকতাম। বাবার বাড়ী ফেরার প্রতীায় নয়; ভাইয়া'র আদর পাবার প্রতীায়। কখনো কখনো সে তাড়াতাড়ি আসতো, কখনো কখনো খুব দেরী করে। বিষন্ন মন নিয়ে সন্ধ্যায় ফিরে আসতাম। ঘুমিয়ে যেতাম। বাড়ী ফিরে ভাইয়া আমাদের ঘুম ভাঙ্গাতেন। দুইজনকে দুপাশে বসিয়ে ভাত মাখিয়ে খাওয়াতেন। সেসব ভেবে আমার কখনো কান্না পায়নারে... স্বপ্নময় আর কথা বলতে পারেনা। প্রাণপন চেষ্টা করে নিজেকে সামলানোর। পারেনা। অপলক চোখে মেঘের দিকে তাকিয়ে থাকে। কষ্টরা টপটপ করে শব্দহীন ঝরে পড়ে। দুয়েক ফোটা। স্বপ্নময় বেশি কাঁদতে পারেনা।

অনেকখন পর সাগর মুখ খুলে--- একটা সমস্যায় আছিরে। নিজের টেনশনেই বাঁচিনা...।
--- তোর আবার টেনশনও আছে? চোখ চকচক করে স্বপ্নময়ের।
--- তা আর বলছি কি, বাড়ীওয়ালার মেয়েটা আছে না; সে তো গলেই গেল! তিনটা চিঠি দিয়েছে।
--- চিঠি 3 টা সাথে এনেছিস, না?
--- সাগর উপর নিচ মাথা নাড়ায়।
--- স্বভাবটা তোর এখনো গেলনা। তোর শহুরে বিশ্ব সুন্দরী মেয়েটি ছুটে গেল নাতো?
--- যাকগে, ঐটাকে আলগাতে পারতাম না। তাই ঢিল দিয়েছি।
--- নিজেকে এত ছোট ভাবিস কেন?
--- তবে কি আর ভাববো? ছোটোই তো। এত কষ্ট করছি... তারপর কিছুই করতে পারছি না।
--- পারবি, পারবি। একটু কষ্ট হবে। একসময় দেখবি সব ঠিক হয়ে গেছে।
--- সান্তনা দিচ্ছিস?
--- উহু; গাছ হতে বলছি। লতা-গুল্ম'র স্বপ্ন আর দেখিস না।

সাগর চলে যাবে... যাক। যতদিন সে থাকবে, ততদিন অতীত হামলা করবে। অতীতহীন শহুরে জীবনে হতাশা, ব্যর্থতা আর বিস্বাদ নিয়েও কেমন করে স্বপ্নময়ের দিনগুলো কেটে যাচ্ছে...! উদভ্রান্তের মত সে টিকে আছে। বেঁচে আছে। নিজের কষ্টগুলো মাঝে মাঝে খুব মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চায়। টিকে থাকতে চায়। সে আমল দেয়না। মানুষের সুখ দুঃখে'র কেচ্চা-কাহিনী শুনে সে নির্ভার থাকে। এভাবেই কেটে যাচ্ছে তার প্রতিটি দিন, একই রঙে...।


--(অমানুষ-3)
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৭ রাত ২:৩১
৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ফিল সিমন্স একটি নাম একটি ইতিহাস

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:১৮



"ফিল সিমন্স একটি নাম একটি ইতিহাস"

একটা সময় ছিল, যখন বাংলাদেশ ক্রিকেটে "কোচ" শব্দটা মানেই ছিল ঝড়!

রাসেল ডোমিঙ্গো, হাথুরুসিংহে-
Phil Simmons (2024–present)
Chandika Hathurusingha (2014–2017, 2023–2024)
Russell Domingo (2019–2022)
Steve Rhodes... ...বাকিটুকু পড়ুন

জন্মদিনে তাহাদের জন্য শুভকামনা। আমার জন্মদিনের স্মৃতি...

লিখেছেন করুণাধারা, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৫৬



একেকটা জন্মদিন পার করা মানে জীবন বইয়ের একেকটা পৃষ্ঠা পড়ে ফেলা, কয়েক বছর পরপর সেই বইয়ের একেক অধ্যায় শেষ হয়! বইটা ট্রাজেডি না কমেডি, একেবারে শেষ পর্যন্ত না পৌঁছালে তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

নির্ভীক অভিযাত্রা

লিখেছেন আকিব হাসান জাভেদ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৩৩

আমি চলি ঐ প্রান্তে,
যেখানে অসৎ থেকে মানুষ হয়েছে সৎ।
আমি চলি উড়ে উড়ে,
ডানাহীন পাখির মতো,
যেখানে দুর্বলতাকে জয় করে
হয়েছে দুঃসাহস।
আমি চলি শক্তির সাথে,
দেহ যায় না ঝুঁকে।
করি না প্রণাম,
করি না চাটুকারিতা আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

চুপ - একদম চুপ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৭ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭



আমরা শুধু চুপ থাকবো -
আমাদের কথা বলার মুখ নেই
আমাদের দেখার মতো চোখ নেই
আমাদের শোনার মতো কান নেই
মনে হয়, মনে হয় -
আমাদের হাত-পাও নেই।

আমাদের বিবেক নেই
আমাদের চিন্তা-চেতনাও নেই
আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০২





হিজিবিজি নদী চলে মন উদাসের দেশে !

...................................................................
মানচিত্রের আঁকাবাঁকা রেখায় তারে পাবেনা,
সে নদী তো চেনা কোনো ঠিকানায় যাবে না।
তার কোনো কূল নেই, নেই কোনো ঘাট,
সে বয়ে চলে একা, বুক জুড়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×