somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সুমন প্রবাহনের কাব্যগ্রন্থ 'পতন ও প্রার্থনা' নিয়ে 'সমকাল'এ বিজয় আহমেদের একটি আলোচনা

০১ লা নভেম্বর, ২০০৮ দুপুর ১২:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সুমন প্রবাহনের বই 'পতন ও প্রার্থনা' নিয়ে বিজয় আহমেদের একটি লেখা প্রকাশিত হয় 'সমকাল' দৈনিক পত্রিকায়।সেটি পড়তে চাইলে click it


বইয়ের আলোচনাটি সকলের সুবিধার্থে নীচে দেয়া হলো।

সুমন প্রবাহনের কবিতা-

ক'দিন দেখা হয়নি অথচ যেন বহুকাল...
বিকেল বারান্দায় বসে ভাবছি তোমার কথা
সামনের লেকের সিথানে পাশাপাশি দুটি তালগাছ
দাঁড়িয়ে আছে
তাদের ছায়া জড়িয়ে আছে গোধুলি আলোর জলে
ভাবছি,
কেন যে গাছজন্ম হলো না
একবার কাছাকাছি দাঁড়াতে পারলে
আর দূরত্বের ভয় থাকত না।
[বন্ধুত্ব ও দূরত্ব; পতন ও প্রার্থনা]

কবিতাটি অকাল প্রয়াত কবি সুমন প্রবাহনের। আর সুমন প্রবাহন কে? সুমন কেউ নন। একজন কবি। শূন্য দশকের একদম শুরুতেই লেখা শুরু করেছিলেন। তার কবিতা ছাপা হতো 'কালনেত্র' অথবা 'লাস্টবেঞ্চ' নামক ছোট কাগজে। আমরা কয়েকজন, মানে আমি ও রুদ্র আরিফ, যখন প্রথম যাই আজিজ মার্কেটে, ততদিনে সুমন প্রবাহনরা আজিজ মার্কেটে নিয়মিত যান। সুমনকে সবচেয়ে বেশি দেখলাম 'বুকটান' প্রকাশের আগে থেকে। প্রায় বিকেল অথবা রাতেই দেখতাম টি-শার্টের ওপরে বোতাম না লাগানো শার্ট পরে, কিছুটা বোহেমিয়ান আরো কিছুটা রাগী ভঙ্গিতে হেঁটে যাচ্ছেন কফিল আহমেদের সঙ্গে।
তারপর 'বুকটান' প্রকাশিত হলো। আমরা শামিমুল হক শামীম ভাইয়ের 'লোক'-এ বসে দেখলামও সেই সংখ্যাটা। প্রচ্ছদটা সুন্দর। লেখাগুলোও চমৎকার। আর ছিল কফিল আহমেদের একটা সাক্ষাৎকার এবং অনেক গান। আর সম্পাদকের দায়িত্বে থাকায় এমন ভালো একটা লিটল ম্যাগাজিনের জন্য প্রশংসার প্রাপ্যই ছিলেন সুমন।
'বুকটান' প্রকাশিত হওয়ার পর অনেকদিন দেখিনি সুমনকে। দেখিনি বলছি কারণ সুমনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল মাত্র একবার; কিন্তু কথা হয়নি কখনো! তারপর আমি, রুদ্র আরিফ, মামুন খান অথবা ফেরদৗস মাহমুদ যখন তিন-চার-পাঁচ বছর হেঁটে হেঁটে পার করে দিলাম আজিজ মার্কেটের বারান্দায়; ততদিনে সুমন প্রবাহন, সেই টি-শার্টের ওপারে বোতাম খোলা শার্টের কবি, একদম অনুপস্থিত। কবিতাও দেখিনি কোনো লিটলম্যাগে। ফলে জানতে ইচ্ছে হতো, কোথায় আছেন সুমন প্রবাহন এবং তার বন্ধুরা। যাদের কাছে খোঁজ নিতাম, কেউই খোঁজ দিতে পারেনি।
তারপর হঠাৎই একদিন বলা নেই, কওয়া নেই শুনলাম সুমন প্রবাহন চলে গেছেন, কেবলই স্মৃতি-কাতরতার এক চির অচিন দেশে। যে দেশকে বলি নির্জন। কেবলই লেবুপাতার সুঘ্রাণময় আর অনুভূতিশীল। ভাবি, তাই সুমন নিজেই বেছে নিলেন এমনতর স্মৃতিকাতর এক দেশ, তাই ভালোই আছেন সেখানে। আবার যেহেতু মায়ের পাশেই তার থাকার ঘর, সেহেতু ভাবি খারাপইবা থাকবেন কেন? এমন ভাবতে ভাবতেই পড়ি মুয়ীয-প্রবরসহ তার শোকাহত বন্ধুদের আকুতি। তখন নিজেরও কেমন জানি হু-হু দীর্ঘশ্বাসে পেয়ে বসে! কেমন মন খারাপ করা একটা অনুভূতি। চারদিকে উড়ে বেড়ায়। ভাবি, আজকে সুমনের অনেক বন্ধুই ছবি আঁকে। গান গায়। কেউ নাটক বানিয়ে বিখ্যাত। কেউবা সিনেমা বানাবে বলে ছক কষছে। ভাবি, এসব করার কথা তো সুমনেরও ছিল। তখন খুব রাগ হয়। ভাবি, কেন এভাবে চলে যাওয়া। চলে যাওয়াটাই যেহেতু এক প্রকার জুয়া খেলা, সেহেতু বেঁচে থেকে যদি জীবনের সঙ্গেই জুয়া খেলতেন সুমন! তাহলে কেমন হতো? আর কিছু না হোক, হয় হেরে যেতেন। নতুবা জিতে যেতেন। তাও তো আমাদের জানার সম্ভাবনাটুকু ছিল, যে আপনি জিতে গেছেন অথবা হেরে গেছেন। অথচ আপনি করলেন কী, এমন এক দেশে চলে গেলেন, যেখানকার জুয়ার আসরগুলো অনেক দীর্ঘ, অনেক রাত্রিজুড়ে চলতেই থাকে, সেসব জুয়াড়ির আড্ডা, যার খবর আমাদের এ পৃথিবীতে পৌঁছাতেই পারে না। ঠিক এ জায়গাতেই আফসোস। এ জায়গাতেই বিনম্র মন খারাপের সূচনা।

ওপরের কথাগুলো মনে পড়ল সুমন, আপনার কাব্যগ্রন্থ 'পতন ও প্রার্থনা' দেখার পর। মাসুদ ভাই বইটা দেওয়ার পর থেকে অনেকবার আমি বইটার প্রচ্ছদ দেখেছি। যতবার প্রচ্ছদটা দেখেছি, ততবার আনমনা হয়েছি, একটু একটু করে হলেও। আর যখন পড়লাম প্রচ্ছদের স্কেচগুলো, সুমন আপনারই আঁকা, তখন মনটা খারাপ হলো আরো বেশি।
সুমন, আপনি লিখেছেন,
কুয়াশা যাপিত জ্যোৎস্নায়
সবুজের অন্ধকার পাহারা দু'পাশে
সাথে বাঁকে বাঁকে বাতাসের আপ্যায়ন
মাঝখানে আমি পথ, পথে-
নিকোটিন আহ্বানে সিগারেট নিই
বারবার জ্বালাতে নিয়েও জ্বলছে না
ভাবছি,
দিয়াশলাইয়ের প্রথম কাঠিতে আগুন জ্বলে ক'জনার!
(আগুন ভাগ্য)
প্রথম দাবিতে আগুন জ্বালানো ভাগ্যবানদের তালিকায় আর কে কে আছেন, তা হয়তো জানি না? কিন্তু এটা জানি, সেসব ভাগ্যবানের মতো আপনি একজন। আপনার কাব্যগ্রন্থটি হাতে পাওয়ার পর তাই মনে হলো। যখন দেখলাম বইটির প্রকাশক হিসেবে লেখা আছে 'সুমন প্রবাহন স্মরণ প্রয়াস'। তার মানে বইটা বন্ধু-বান্ধবরাই করেছে, তাই না? এতটুকু ভাবার পর, আরো একটা কথা মনে এলো, বন্ধু-বান্ধবরাইবা এত গুছিয়ে কেন আপনার বইটা করবে সুমন? বলেন তো দেখি? যাই হোক, নিশ্চয়ই আপনার প্রতিটা বন্ধুর অশেষ স্মৃতি রয়েছে আপনাকে ঘিরে। একসঙ্গে অনেকটা পথ পাড়ি দেওয়ারও প্রতিশ্রুতিও হয়তো ছিল, কারো সঙ্গে? তাই না? এই যে স্মৃতি, এই যে প্রতিশ্রুতিগুলো, যা বহন করছে আপনার বন্ধুরা, এ বইটাও আসলে সেসব স্মৃতি, প্রতিশ্রুতি, আবেগ, কান্না ও প্রেমের প্রামাণ্য সংকলন।
মানে জাগতিকভাবে আপনার শরীরটা হয়তো আপনার কোনো একজন বন্ধু অথবা একজন পাঠককে ফাঁকি দিতে পারবে, কিন্তু আপনার মেধা, মনন ও কবিতা, কোনোদিন কি পারবে আর এড়াতে কাউকে? পারবে না! কারণ 'পতন ও প্রার্থনা' মানেই আপনি। আর সুমন প্রবাহন মানেই 'পতন ও প্রার্থনা'। আর ঠিক এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আপনিও যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকবেন সুমন প্রবাহন।
এই এক নিয়তিতাড়িত জীবন আমাদের। আমরা যা চাই, তা মোটেও পাই না। আপনি অন্ধকারকে নিজের বউ ভেবেছিলেন। আরো ভেবেছিলেন, কোনো এক পাখির কান্না ঠিকই আপনার জীবন হয়ে ঝরে যাবে। আর এসব ভেবে একদিন খুব করে লুকাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু লুকিয়ে গিয়ে, দূরের কোনো চায়ের দোকানে বসে, বন্ধুদের দিকে মুচকি হাসি ছুড়ে দেওয়ার যে খেলাটা আপনি খেললেন, সেখানেও তো ধরা খেয়ে গেলেন সুমন? পারলেন কই হারাতে। বন্ধুরা তো ধরে-বেঁধে ঠিকই এই শহরেই ফিরিয়ে আনল 'পতন ও প্রার্থনা'য়।

একজন কবির অথবা লেখকের পরিণত লেখাগুলোর জন্য কতদিন বেঁচে থাকা উচিত? ধরি যে কমসে কম হলেও ২০ কি ২৫ বছর? তাই না? একজন কবি অথবা লেখকের এই সময়টুকু লাগেই। নিজের জন্যই। নিজেকে পাওয়ার জন্যই। অনুশীলনে অনুশীলনে নিজেকে পাকিয়ে, নিজের আসলটুকু তুলে আনার জন্য। অথচ কেউ যদি এ সময়টুকু না পায়? তাহলে?
তাহলে আর যাই হোক, আমরা কবির জীবিতকালের সেই ক্ষুদ্র সময়টুকুতেই হাত চালাব।'পতন ও প্রার্থনা' কবি সুমন প্রবাহনের সেই ক্ষুদ্র কবি জীবনেরই একটা গুরুত্বপূর্ণ দলিল। কখনো কবি ছোট ছোট বাক্যেই বলার চেষ্টা করেছেন। নিজের অনুভূতিকে প্রকাশের তাড়নায় সবসময় কবির কণ্ঠ, কী আশ্চর্যরকম নমিত, ভাবি আর অবাক হই। সুমন যেন নিজের কথাগুলো বলতে চাইতেন নির্জনেই, নীরবেই। আর এই নীরবতার কারণেই বোধহয় তিনি বলেছিলেন, 'বুঝি কাকও অনুভব করে আমাকে?' আর এই অনুভূতিশীল নির্জনতাই কি এভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিল, নিজেকে শেষ করে ফেলার শক্তি অর্জনে।

একটা কবিতা কবি উৎসর্গ করেছেন, এভাবে, মিরাজ, তসলিম, ভালোবাসায় [১২ অগ্রহায়ণ : ১৪১২] এবং 'ইমাম' নামের কবিতাটা উৎসর্গ করেছেন অনেকটা এভাবে, 'মাঝি, ইবন, রিপন, মুয়ীয, অভিজিৎ, আমি এখনো বেঁচে আছি'। 'ইমাম' নামের কবিতাটা এভাবে উৎসর্গ করার মানেটা কী? ভাবি? ভেবে অবাক হই? কেনইবা এই কথা, আমি বেঁচে আছি এখনো? কেনইবা এত সংশয়ে ছিলেন সুমন? এক টাকার নিজের কবিতাটাকেই অস্ত্র হিসেবে কেন তুলে ধরলেন না আপনি?

তবে সুমন আপনার যা যা হওয়ার কথা ছিল, আর যা যা হওয়া হয়নি আপনার, এ রকম সব অপূর্ণতা ভোগাবে আমাদেরও। আর অজস্র শ্রদ্ধা সুমন প্রবাহন আপনার প্রতি। আপনার কবিতার প্রতি। আপনার একান্ত নৈসঙ্গের প্রতি!
বিজয় আহমেদ
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ দুপুর ১২:৩১
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শাহ সাহেবের ডায়রি ।। কালবৈশাখী

লিখেছেন শাহ আজিজ, ১৭ ই এপ্রিল, ২০২৪ রাত ৮:২৪



গত পরশু এমনটি ঘটেছিল , আজও ঘটলো । ৩৮ / ৩৯ সে, গরমে পুড়ে বিকেলে হটাৎ কালবৈশাখী রুদ্র বেশে হানা দিল । খুশি হলাম বেদম । রূপনগর... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন খাঁটি ব্যবসায়ী ও তার গ্রাহক ভিক্ষুকের গল্প!

লিখেছেন শেরজা তপন, ১৭ ই এপ্রিল, ২০২৪ রাত ৯:০৪


ভারতের রাজস্থানী ও মাড়ওয়ার সম্প্রদায়ের লোকজনকে মূলত মাড়ওয়ারি বলে আমরা জানি। এরা মূলত ভারতবর্ষের সবচাইতে সফল ব্যবসায়িক সম্প্রদায়- মাড়ওয়ারি ব্যবসায়ীরা ঐতিহাসিকভাবে অভ্যাসগতভাবে পরিযায়ী। বাংলাদেশ-ভারত নেপাল পাকিস্তান থেকে শুরু করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইরান-ইজরায়েল যুদ্ধ

লিখেছেন মঞ্জুর চৌধুরী, ১৭ ই এপ্রিল, ২০২৪ রাত ৯:০৮

আমরা সবাই জানি, ইরানের সাথে ইজরায়েলের সম্পর্ক সাপে নেউলে বললেও কম বলা হবে। ইরান ইজরায়েলকে দুচোখে দেখতে পারেনা, এবং ওর ক্ষমতা থাকলে সে আজই এর অস্তিত্ব বিলীন করে দেয়।
ইজরায়েল ভাল... ...বাকিটুকু পড়ুন

নগ্ন রাজা কর্তৃক LGBTQ নামক লজ্জা নিবারনকারী গাছের পাতা আবিষ্কার

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ১৭ ই এপ্রিল, ২০২৪ রাত ১১:৪০

LGBTQ কমিউনিটি নিয়ে বা এর নরমালাইজেশনের বিরুদ্ধে শোরগোল যারা তুলছেন, তারা যে হিপোক্রেট নন, তার কি নিশ্চয়তা? কয়েক দশক ধরে গোটা সমাজটাই তো অধঃপতনে। পরিস্থিতি এখন এরকম যে "সর্বাঙ্গে ব্যথা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছিঁচকাঁদুনে ছেলে আর চোখ মোছানো মেয়ে...

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৮ ই এপ্রিল, ২০২৪ সকাল ১১:০৯

ছিঁচকাঁদুনে ছেলে আর চোখ মোছানো মেয়ে,
পড়তো তারা প্লে গ্রুপে এক প্রিপারেটরি স্কুলে।
রোজ সকালে মা তাদের বিছানা থেকে তুলে,
টেনে টুনে রেডি করাতেন মহা হুলস্থূলে।

মেয়ের মুখে থাকতো হাসি, ছেলের চোখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×