somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

শহিদুল ইসলাম সাজু
সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলায় বাড়ি। সিলেটের এমসি কলেজে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত আছি। শখ হিসেবে সংবাদকর্মী হিসেবে কাজ করছি। রক্তের গ্রুপ- 'ও' পজেটিভ (একজন নিয়মিত রক্তদাতা)।

কিশোর রায়হান-এ বসবাস একজন পরিণত বিজ্ঞানী!

১২ ই অক্টোবর, ২০১৮ বিকাল ৪:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



কিশোর বয়সে পরিণত বিজ্ঞানীদের মতো যন্ত্র উদ্ভাবন করে এলাকা হৈচৈ ফেলে দিয়েছেন আবু রায়হান। তার প্রতিবেশি ও সহপাঠীরা বিজ্ঞানী রায়হান বলে ডাকেন। রায়হানও এসব ডাকে বিরক্ত না হয়ে সাড়া দেন। এলাকার গন্ডি পেরিয়ে রায়হান এখন জাতীয় পর্যায়ে ক্ষুদে বিজ্ঞানী স্বীকৃতি পেতে আগ্রহী। শীঘ্রই ৩৯তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহ প্রতিযোগিতায় বিভাগ সেরাদের সাথে সেও অংশ নেবে। অথচ অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর পরিবারের কারণে প্রতিযোগিতার জন্য বিভিন্ন যন্ত্রপাতি এখনো প্রস্তুতই করতে পারেনি রায়হান। অমিত সম্ভাবনার দুয়ারে প্রতিবন্ধক হয়ে দাড়িয়েছে পরিবারের আর্থিক অস্বচ্ছলতা!

বিজ্ঞানের নতুন আবিস্কারের নেশায় দিনের অর্ধেক সময় ব্যয় করলেও সে লেখাপড়া করছে মানবিক বিভাগে। মৌলভীবাজারের বড়লেখা সরকারি কলেজের মানবিক বিভাগের একাদশ শ্রেণি শিক্ষার্থী আবু রায়হান। সিলেটের বিয়ানীবাজার উপজেলা মোল্লাপুর ইউনিয়নের আব্দুল্লাহপুর গ্রামের হাবিবুর রহমান ও রীনা বেগম দম্পতির দ্বিতীয় পুত্র।

আবু রায়হান ৩৯তম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহে বিয়ানীবাজার উপজেলার মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে। জলঢুপ বিজ্ঞান ক্লাবের হয়ে উপজেলা প্রতিযোগিতা সে অংশ নিয়েছিলো। একই প্রতিযোগিতায় জেলা ও বিভাগ পর্যায়ে সেরা হয়ে জাতীয় পর্যায়ে অংশ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে এলাকায় বিজ্ঞানী বলে পরিচিত এ কিশোর রায়হান। তার শোবার ঘরে যন্ত্রপাতির সাথে নিজের উদ্ভাবিত যন্ত্র যেমন আছে তেমনি আছে উপজেলা, জেলা ও বিভাগ পর্যায়ে পাওয়া সনদ ও পদকগুলো। অথচ রায়হানের সাথে প্রতিযোগিতায় সেরা হওয়া (উপজেলা ও জেলা) দলগুলো জাতীয় পর্যায়ে যেতে পারেনি!

কিশোর রায়হানের চিন্তা পুরো বিশ্বকে নিরাপদ রাখতে সময় উপযোগী প্রযুক্তি আবিস্কার করা। আগামী বিশ্ব জ্বালানি সংকটে পড়বে বলেই সে জ্বালানি (তরল ও গ্যাস) ছাড়া যন্ত্র আবিস্কার করতে চায়। বলা চলে এই কিশোর বয়সে সে অনেকটা সফল হয়েছে। ক্ষুদ্র আকারে জ্বালানিবিহীন নয়টি যন্ত্র আবিস্কার করে পরিচিত মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে সে। তার আবিস্কারগুলো মানুষের কল্যাণে সহজতর জীবনযাপনের জন্য উপযোগী হবে বলে বিশ্বাস করে রায়হান।

রায়হানের সাথে আলাপকালে সে জানায়- ঘর্ষণ শক্তি দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিপনন যন্ত্র, সৌরশক্তিকে কাজে লাগিয়ে পানির পাম্প, ফায়ার সার্ভিস ও জরুরী প্রয়োজনে তার উদ্ভাবিত ড্রোন সংক্রিয়ভাবে কাজ করে। দুর্গম অঞ্চলে চলবে চার চাকার গাড়ি, বিশাল এলাকা আলোকিত করবে রায়হানের উদ্ভাবিত লেজার লাইট। তার উদ্ভাবিত এসব যন্ত্র স্বচল থাকবে সোলার প্যানেলের মাধ্যমে।

নয় বছর বয়সে যন্ত্রপাতির দিকে রায়হানের ঝোঁক দেখে প্রথমে তাঁর পিতা-মাতাও আতংকিত ছিলেন। কখন কি অঘটন ঘটে যায়! কিন্তু তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে রায়হান কোকাকোলা ও পেপসির বোতল কেটে তাতে ছোট্ট মোটর ও ব্যাটারি যুক্ত করে হেলিকপ্টার তৈরী করে ফেলে। হেলিকপ্টারটি স্বচল হলেও প্রথম পর্যায়ে এটি ওড়াতে পারেনি সে। নয় বারের চেষ্টায় বাড়ির উঠোনে হেলিকপ্টার উড়িয়ে বাবা হাবিবুর রহমান ও মা রীনা বেগমকে বিষ্ময় উপহার দেয় কিশোর রায়হান।



আবু রায়হান জানায়, তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় টিভিতে হেলিকপ্টার দেখে তার মনে কৌতুহল জাগে। এর কয়েকদিন পর বারইগ্রামের একটি বিয়ের সেন্টারে হেলিকপ্টারে করে বর আসলে প্রথমবারের মতো স্বচক্ষে হেলিকপ্টার দেখে। এরপর শুরু করে হেলিকপ্টার তৈরী। পেপসি ও কোকাকোলার প্লাস্টিক বোতল দিয়ে বডি এবং টিন দিয়ে পাখনা তৈরী করে। ছোট্ট প্লাস্টিকের টুকরো কেটে লেজের ব্লেড তৈরী করে ছোট মোটর জুড়ে দেয়। মোটরটি একটি ব্যাটারির সাথে যুক্ত করে।

রায়হান বলে, আমার ড্রোনটি চলবে জ্বালানি ছাড়া। এটি আগুন নিয়ন্ত্রণে সংক্রিয়ভাবে কাজ করবে এবং এর সাথে সেন্সর যুক্ত থাকায় হামলা থেকে নিজেকে রক্ষা করতে দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করতে পারবে। এছাড়া মোবাইল ট্রাকের মাধ্যমে দুর্গম এলাকায় ত্রাণ, ঔষধ বা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সয়ংক্রিয়ভাবে বহন করতে পারবে। তার উদ্ভাবিত ঘর্ষণ বিদ্যুৎ যন্ত্রটি ২ হাজার কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে। বিশেষ করে দুর্গম এলাকা ও দ্বীপ অঞ্চলে এ যন্ত্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ খুব কাজে দেবে। চার চাকার মোটরযানে চারটি মোটর সংযুক্ত থাকবে। এটি খুব শক্তিশালী। সেনাবাহিনীসহ দেশের দুর্গম এলাকায় মানুষ ও পণ্য পরিবহনে এ যান কাজে লাগবে। যানটি চলবে সৌরশক্তি দিয়ে। আক্ষেপ করে রায়হান বলে, বর্তমানে যে অবস্থায় যন্ত্রপাতি আছে সেগুলো দিয়ে জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় সাফল্য নিয়ে আসা কঠিন। আমি এসব যন্ত্রপাতির আরও উন্নয়ন করতে চাই। এতে লাখ খানেক টাকা প্রয়োজন। বেশ কয়েকটি মোটর, হালকা ওজনের শক্তিশালী ব্যাটারি, সৌরশক্তির প্যানেলসহ অনেক কিছু লাগবে। আব্বুর কাছে এতো টাকা নেই। অসহায় হাসি মুখে টেনে রায়হান বলে, যদি কেউ এগিয়ে আসেন- চির কৃতঞ্জ থাকবো।

একপর্যায়ে কথা হয় এ কিশোর বিজ্ঞানীর মা-বাবার সাথে। রায়হানের পিতা চিত্র শিল্পী (হাবিব আর্ট) হাবিবুর রহমান বলেন, বিদ্যুতের তার, মোটর নিয়ে ৮/৯ বছর বয়স থেকে পড়ে থাকতো রায়হান। কখন কি হয়ে যায় এই আশংকা থেকে এসব হাতে না নিতে বকাঝকা করতাম। কিন্তু একটু বড় হওয়ার পর তার এদিকে ঝোঁক দেখে কিছুই বলিনী। শুধু লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার জন্য চাপ দিয়েছি। মা রীনা বেগম বলেন, পুরো ঘর খুটিনাটি যন্ত্র, তার, সার্কিটে ভরে রেখেছে। পড়ার টেবিল, বিছানায় উপর নীচে লোহালক্ষড়ে ঠাসা। পড়ার বই ঘরে এক কোনায় রেখে এসব যন্ত্র নিয়ে সারাদিন তার ব্যস্ততা। অথচ এক সময় তাকে নিয়ে খুব ভয়ে ছিলাম। সারাদিন চোখে চোখে রাখতাম- তারপরও চোখ ফাঁকি দিয়ে বিদ্যুতের তারের সাথে মোটর সংযোগ দিয়ে ফ্যান বানিয়ে চালাতো। একদিন দেখি হেলিকপ্টার বানিয়ে ফেলেছে। উঠোনে উড়িয়ে আমাদের দেখিয়ে বলে আর যেন তাকে বারণ না করি।

আমার পরিচিতজন ও রায়হানের শিক্ষক চান্দ্রগ্রাম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল লতিফ কথা প্রসঙ্গে বলেন, লেখাপড়া সে খুব অমনোযোগী। তবে ছাত্রদের কাছ থেকে তার আবিস্কারের গল্প শুনে দেখার আগ্রহ দেখালে সে কয়েকটি যন্ত্র স্বচল করে দেখায়। এরপর নতুন কোন যন্ত্র উদ্ভাবনের পূর্বে আমার কাছে আসতো। প্রয়োজনমতো তাকে আর্থিক সহযোগিতার পাশাপাশি উৎসাহ প্রদান করেছি।

পরে লতিফ স্যারের কাছে জানতে পারলাম জলঢুপ বিজ্ঞান ক্লাবের কথা। যথারীতি আগ্রহ থেকেই সেখানে যাওয়া হলো। সেখানকার বিজ্ঞান ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা শিক্ষক মুছব্বির আলী বলেন, কিশোর রায়হান একটি বিষ্ময়ের নাম। সরকার তার পৃষ্ঠপোশকতায় এগিয়ে আসলে সে দেশের জন্য অমূল্য সম্পদ হবে। তিনি বলেন, তার উদ্ভাবিত প্রযুক্তি কাজে লাগাতে পারলে দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে।

বিস্ময়কর এ কিশোর তাঁর স্বপ্নগুলোকে নিয়ে আকাশ ছুঁতে চায়। সে চায় তাঁর শোবার ঘরের স্বপ্নগুলোকে বহির্জগতের বাস্তবরূপ দিতে। কিন্তু তাঁর মধ্যে একটাই দুশ্চিন্তা এখন কাজ করছে- অর্থনৈতিক অসচ্ছলতাই কি তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রম ও সম্ভবনাময় এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে?
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই অক্টোবর, ২০১৮ বিকাল ৪:২৬
৯টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

FIFA বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ এর ফাইনাল খেলা নিয়ে আমার সামান্য কিছু কথা

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:২৮

গতকালের FIFA বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ এর ফাইনাল খেলায় মেসি অত্যন্ত নিষ্প্রভ ছিলেন। দর্শকদের তাকে মাঠে খুঁজতে হয়েছে, তিনি তার চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে, মাঠের সর্বকোণে বল... ...বাকিটুকু পড়ুন

চেতনা, ৭১ , পাকিস্তান ঘৃনা ও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:০৫


যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত বাংলাদেশ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনাম দুটো দেশের অর্থনৈতিক যাত্রা শুরু হয় প্রায় একই সময়ে কিন্তু তুলনামূলক ভিয়েতনামের চেয়ে বাংলাদেশের অবস্থান অনেক ক্ষেত্রে ভালো ছিল। বাংলাদেশে ছিল অনেক ভারী... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকে আমার মন ভালো নেই

লিখেছেন সামিয়া, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:০৯



দুঃখের সময়ে নানান মানুষের কথা মনে পড়ে। খুব কাছের মানুষের কথা মনে পড়ে আবার অনেক দূরের মানুষের কথাও মনে পড়ে। রক্তের আপন মানুষের কথা তো মনে পড়েই তবু একদিন কীভাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৭ জুনে বিয়ে, অথচ ২২ জুনের সিভিতে ‘অবিবাহিত’? এমপি সাহেবের এই গণিত কে মেলাবে?

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৮



ধরা খাইলেই “দ্বিতীয় বিবি”! কিন্তু ১৭ জুনের বিয়ার পর ২২ জুনের সিভিতে মাইয়া 'আনম্যারিড' থাকে কেমনে?
সাতক্ষীরার এমপি সাবের এই ভণ্ডামির জট ছাড়াইতে পারবেন তো, নাকি এআই (AI) এর ওপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি 2G এর আমলে ফিরে যেতে চাই।

লিখেছেন ইমরোজ৭৫, ২১ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ৮:২০


আমি 2G এর আমলে ফিরে যেতে চাই। ইন্টারনেট এর স্পিড খুবই কম। ফেসবুকে কেউ ভাইরাল হতে আসবে না। অল্প লেখায় নিজের মনোভাব ফেসবুকে পোস্ট করবে। কেউ আর পাকনা পাকনা কথা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×