দেশের জন্য সর্বনাশা চুক্তি ঠেকাতে ঐক্যবদ্ধ হোন। নীরবতা দেশের ধ্বংস ডেকে আনবে।
দেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে ৩ জুলাই সকাল ৬টা থেকে ১২ টা ঢাকা মহানগরীতে
হরতাল পালন করুন।
একই দিন জেলা শহরগুলোতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ। দেশের সর্বত্র, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নারী-পুরুষ-শিশু-বৃদ্ধ ৩ জুলাই সকাল ১১টা থেকে ১২টা পর্যন্ত কর্মবিরতি পালন করবেন। এবং দেশবিরোধী চুক্তি বাতিল, জাতীয় সম্পদ রক্ষা, ও জনগণের স্বার্থে তার সর্বোত্তম ব্যবহারের দাবিতে নিজ নিজ উদ্যোগে প্ল্যাকার্ড-ফেস্টুন-ব্যানার হাতে প্রধান সড়কে দাঁড়াবেন।
দুর্বৃত্ত, দুর্নীতিবাজ, কমিশনভোগী ছাড়া দেশের সকল মানুষ এসব কর্মসূচিতে শামিল হয়ে দেশ ও জনগণের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে গণরায় প্রকাশ করবেন।
কেন এই আন্দোলন কর্মসূচি?
সংগ্রামী বন্ধুগণ,
বাংলাদেশের ইতিহাসে গত ১৬ জুন ২০১১ এক কলঙ্কিত কালো অধ্যায়ের সূচনা হোল। এদিন জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে, দেশের জ্বালানী নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তাকে হুমকির মধ্যে নিক্ষেপ করে বাংলাদেশ সরকার বঙ্গোপসাগরের দু’টো গ্যাস ব্লকের (১০ ও ১১) গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য কনোকোফিলিপস নামের একটি মার্কিন কোম্পানির সাথে চুক্তি সম্পাদন করেছে। ১৯৯৭ থেকে ২০০৩ সময়কালে মার্কিন কোম্পানি ইউনোকালের গ্যাস রফতানির প্রস্তাবের পক্ষে যারা সোচ্চার ছিলেন তারাই এই চুক্তির কাঠামো অর্থাৎ রফতানিমুখি পিএসসি- ২০০৮ প্রণয়নে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।
* এটাই শেষ নয়, সমুদ্রের গ্যাস-তেল লুণ্ঠনের শুরু মাত্র।
এই চুক্তি সম্পাদনের মধ্য দিয়ে শুধু যে এই দু’টি ব্লকের উপর মার্কিন কোম্পানির দখলিস্বত্ব প্রতিষ্ঠিত হল তাই নয় বরং এরই পথ ধরে বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরের গ্যাস সম্পদের উপর মার্কিনসহ আরও অন্যান্য দেশের বিভিন্ন কোম্পানির দখলিস্বত্ব প্রতিষ্ঠিত করার পথ পরিষ্কার করা হল। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের নতুন পর্বে প্রবেশ করলো। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীন ও রাশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশকে ভাগবন্টন করবার পথে আরেক ধাপ অগ্রসর হলো শাসকগোষ্ঠী। আর নিজেদের দেশকে নিজেদের জন্য নিজেদের হাতে রাখার জনগণের সংগ্রামের বৃহত্তর তাগিদও জোরদার হল।
* কী আছে চুক্তির কাঠামোতে (পিএসসি ২০০৮) তে যা দেশের স্বার্থের পরিপন্থী?
পিএসসি ২০০৮ এর অধীনে যে চুক্তি করা হয়েছে তা এখনও গোপন। তবে মুল দলিলের *১৫.৫.৪ ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ যদি সমুদ্রের ১৭৫ মাইল দূরের গ্যাস ক্ষেত্র পর্যন্ত প্রয়োজনীয় পরিবহণ ব্যবস্থা (পাইপলাইন) স্থাপন করে তাহলেই কেবল বাংলাদেশের পক্ষে পেট্রোবাংলা তার অংশের প্রফিট গ্যাস রাখার অধিকার প্রাপ্ত হবে, তবে তা কোনো মতেই মোট প্রাপ্ত গ্যাসের ২০% এর বেশী হবে না। উল্লেখ্য যে, পাইপলাইন তৈরি করতে বাংলাদেশের যে খরচ লাগবে তা কনকো ফিলিপসএর প্রাথমিক বিনিয়োগের তিনগুণ বেশি।
* ১৫.৫.১, ১৫.৫.৪, ১৫.৫.৫, ১৫.৬ ধারায় বর্ণিত শর্তসাপেক্ষে কন্ট্রাক্টর ১৫.৫.২ ধারায় বর্ণিত হিসাব অনুসারে কন্ট্রাক্টর চুক্তিকৃত এলাকায় উৎপাদিত যেকোন পরিমাণ মার্কেটেবল গ্যাস বাংলাদেশের অংশসহ এলএনজি বা তরলায়িত করে রফতানির অধিকার পাবে।
* ১৬ নং ধারায় বলা আছে, পাইপ লাইন নির্মাণ করার অধিকার তাদের থাকবে। প্রাকৃতিক গ্যাস কেবলমাত্র নয়। পেট্রোলিয়াম এর বিষয়টিও আছে। তার মানে তারা ধরে নিচ্ছে একসময় নির্দিষ্ট ব্লকে তেল পাওয়ার একটা সম্ভাবনা আছে। বাংলাদেশকে তার প্রাপ্য বা ক্রীত গ্যাস পৌঁছে দেওয়ার দায়-দায়িত্ব কোম্পানির থাকবে, এরকম কোন নিশ্চয়তা নেই।
* কনকো ফিলিপস দুর্ঘটনার রাজা হিসাবে ইতিমধ্যে কুখ্যাতি অর্জন করেছে। তার কর্তৃত্বের মধ্যে বঙ্গোপসাগর, তার সম্পদ ও প্রাণবৈচিত্র, এক ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে পড়লো। মাগুড়ছড়া ও টেংরাটিলার অভিজ্ঞতা থেকে আমরা নিশ্চিত যে, যেভাবে সরকার চলছে তাতে যতই ধ্বংসযজ্ঞ হোক তার ক্ষতিপূরণের কোন সম্ভাবনা নাই।
* এই চুক্তির মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে সীমানা নিয়ে ভারত ও মায়ানমারের দাবি একভাবে মেনে নেয়া হল। আর বাংলাদেশের অংশ তুলে দেয়া হল মার্কিন কোম্পানির হাতে।
* কীভাবে গ্যাস রপ্তানির ক্ষেত্র তৈরি করা হচ্ছে?
কনকো ফিলিপস বাংলাদেশকে গ্যাস কেনার আহবান জানাবে ঠিক, কিন্তু যে দামে গ্যাস রফতানি করতে পারবে তা বাংলাদেশে গ্যাস বিক্রির দামের কমপক্ষে প্রায় তিনগুণ হবে। এমতাবস্থায় গ্যাস রফতানির এধরনের লাভজনক প্রস্তাব অনুমোদনে তারা যা দরকার তাই করবে। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা মন্ত্রী উপদেষ্টা তাদের স্বার্থ রক্ষার্থেই নিয়োজিত থাকে। এখন যারা বলছে, রপ্তানী আমরা করব না; তারাই তখন বলতে থাকবে, হিসাব দিতে থাকবে রপ্তানী করলে কীভাবে তা লাভজনক হবে। কিছু কনসালট্যান্ট তৈরী হবে, তখন আমরা সেমিনার দেখব, ওয়ার্কশপ দেখব, বিভিন্ন মিডিয়ার মধ্যে কথাবার্তা শুনব। তারা বলতে থাকবে, হিসাব দিতে থাকবে রপ্তানী অধিক লাভজনক উল্লেখ করে। বাংলাদেশের এই সম্পদ যা ভবিষ্যতের জন্য অত্যাবশ্যক তা আর আমাদের হাতে থাকবে না।
রফতানির চাপ তৈরি হবে আরও এই কারণে যে, ১৫.৪ ধারা অনুযায়ী সাধারণভাবে অনুমোদিত সীমার (প্রমাণিত মজুতের ৭.৫ ভাগ) অতিরিক্ত গ্যাস উত্তোলনে কোম্পানিকে অধিকার দেয়া আছে। অতিরিক্ত গ্যাস উত্তোলন করলে এই পরিস্থিতি তৈরি করা সম্ভব যে, তা বাংলাদেশের চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি হবে, অতএব রফতানিই যৌক্তিক হয়ে দাঁড়াবে।
* তীব্র গ্যাস সংকট মোকাবিলার জন্য সমুদ্রের ব্লক ইজারা দেয়া হয়েছে এটা কি সত্য?
গ্যাস যদি দেশেই না থাকে তাহলে এই চুক্তি কীভাবে গ্যাস বা বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলা করবে? সরকারি তথ্য অনুযায়ী স্থলভাগে বর্তমানে গ্যাস রিজার্ভ আছে ৭.৩ টিসিএফ, সমপ্রতি আরও ৫ টিসিএফ বেশি সন্ধান পাওয়া গেছে। বর্তমানে প্রতিদিন ঘাটতি ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট, গ্যাসের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে ১০% হারে। জ্বালানী চাহিদা পূরণ হয় ৭০% গ্যাস থেকে, ২৫% আমদানীকৃত তেল থেকে, ৫% কয়লা এবং জলবিদ্যুৎ থেকে।
অর্থনীতির সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি অনুযায়ী আমাদের ৫০ বছরের গ্যাসের চাহিদা পরিমাপ করলে তা নিম্নরূপ চিত্র দেয়:
জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৫০ বছরে গ্যাস প্রয়োজন (টিসিএফ)
যদি ৩% প্রবৃদ্ধি হয় ৪০-৪৪ টিসিএফ
যদি ৪.৫৫% প্রবৃদ্ধি হয় ৬৪-৬৯ টিসিএফ
যদি ৬% প্রবৃদ্ধি হয় ১০১-১১০ টিসিএফ
যদি ৭% প্রবৃদ্ধি হয় ১৪১-১৫২ টিসিএফ
আমরা কয়লাকে যদি গ্যাসের পরিমাপে হিসাব করি তাহলে বাংলাদেশের মোট জ্বালানী ৪৫/৫০ টিসিএফ গ্যাসের সমান হয়। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি শতকরা ৭ ভাগ ধরলে ঘাটতি থাকে প্রায় ১০০ টিসিএফ। এই গ্যাসের জন্য, যেটা বর্তমান মজুদের প্রায় ১০ গুণ, আমাদের পুরোপুরি এই বঙ্গোপসাগরের উপর নির্ভর করতে হবে। সুতরাং এই গ্যাস যেহেতু আগামী ৫০ বছরের জ্বালানী নিরাপত্তার জন্য একমাত্র অবলম্বন, সুতরাং যেকোন ধরনের রপ্তানীমুখী চুক্তি দেশের জন্য ভয়ংকর রকমের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বহুজাতিক কোম্পানি সবসময় চাইবে রপ্তানী করতে কারণ আন্তর্জাতিক বাজারে এই গ্যাস পাঠালেই তাদের জন্য বেশী লাভ। কিন্তু আমাদের জন্য তা সর্বনাশা।
* 'আমাদের পুঁজি নাই, প্রযুক্তি নাই' একথা বলে সম্পাদিত আগের চুক্তিগুলো কী ফলাফল এনেছে?
দ্রব্যমূল্য নিয়ে মানুষ চিন্তিত, বিপর্যস্ত। কিন্তু এই দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির একটা অন্যতম কারণ, অতীতের বিভিন্ন সরকারের আমলে বিদেশি কোম্পানির সাথে তেল-গ্যাস চুক্তি। এসব চুক্তির কারণে অর্থাৎ আন্তর্জাতিক তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর হাতে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো তুলে দেওয়ার ফলে, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে যে দামে আমরা গ্যাস কিনতাম (৭ টাকা, সমপ্রতি তা ২৫ টাকা হয়েছে), তার চেয়ে ৩০ গুণ বেশী দাম (গড়ে ৩ ডলার বা ২১০ টাকা) দিয়ে একই গ্যাস বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে কিনতে হয়েছে, এখনও হচ্ছে ১০ গুণ বেশি দামে। সমপ্রতি দাম আরও বেড়েছে। উপরন্তু তাদের কর্পোরেট ট্যাক্সও পরিশোধ করে পেট্রোবাংলা। আর্থিক চাপ ছাড়াও যেহেতু বিদেশী মুদ্রায় তা কিনতে হয়, এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপরও চাপ পড়ে। পুঁজির অভাবের কথা বলে বহুজাতিক কোম্পানি ডেকে আনা হলো, আর তাদের হাতে যত বেশি গ্যাস ক্ষেত্র যাচ্ছে তত পুঁজি পাচার হচ্ছে। এখনই তাদের মুনাফার স্বার্থে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে প্রতিবছর ২০০০ কোটি টাকারও বেশী। রাজস্ব ঘাটতি বাড়ছে। এরফলে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির চাপ বাড়ছে। গ্যাসের দাম বাড়ার কারণে বিদ্যুতের দাম বেড়ে যায়। উৎপাদনশীল সমস্ত কিছুর উপরই তার প্রভাব পড়ে। শিল্প কারখানা কৃষিতে সবকিছুতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে। জনগণের প্রকৃত আয় কমে। দারিদ্র্যের একটি চক্র তৈরী করে এবং পুরো অর্থনীতির উপর বিরূপ চাপ তৈরী করে।
বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর মূল লক্ষ্য মুনাফা। ফলে মুনাফার জন্য বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, জাতীয় সম্পদ কিংবা পরিবেশের ভারসাম্য ইত্যাদি বিসর্জন দেয়া এসব ‘দক্ষ ও অভিজ্ঞ’ বহুজাতিকের জন্য কোন সমস্যার ব্যাপার নয়। ফলে অক্সিডেন্টাল ও নাইকোর মতো ’উন্নত প্রযুক্তি’সম্পন্ন কোম্পানিগুলোর হাতে মাগুরছড়া ও টেংরাটিলার মত পরিবেশ ও সম্পদ বিনাশী দুর্ঘটনাগুলো ঘটেছে। অথচ পুরাতন ও জীর্ণ যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করলেও বাপেক্স/পেট্রোবাংলা বা দেশীয় কোন কোম্পানির হাতেই এ ধরনের ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেনি। একই ভাবে সাংগু গ্যাস ফিল্ডের মত তড়িঘড়ি করে ক্যাপাসিটির বেশী গ্যাস উত্তোলন করতে গিয়ে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস উত্তোলনের অনেক আগেই গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন নষ্ট করার ঘটনাও পেট্রোবাংলা/বাপেক্সের নেই।
* সরকারের পার্থক্য আছে কিন্তু জনস্বার্থ বিরোধী নীতিতে তারা ঐক্যবদ্ধ
বাংলাদেশে বিদ্যমান গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট, দারিদ্র ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান হারে গ্যাস ও বিদ্যুৎখাতে ভর্তুকি বৃদ্ধি, শিল্পখাতে সংকট, কৃষি ও শিল্পখাতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, খনিজ সম্পদ ঘিরে দেশি বিদেশি মাফিয়া গোষ্ঠীর তৎপরতা বৃদ্ধির পেছনে গত দুই দশকে বহুজাতিক কোম্পানির সাথে বিভিন্ন চুক্তি ও তাদের দখলিস্বত্ব আরও সমপ্রসারণের অপতৎপরতাই দায়ী। সরকার পরিবর্তন হয়, কিন্তু জাতীয় স্বার্থবিরোধী নীতি ও চুক্তির ক্ষেত্রে কোন পার্থক্য দেখা যায় না। কনোকোফিলিপস-এর সঙ্গে চুক্তি এই অপতৎপরতারই অংশ। বাংলাদেশকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর তার সাথে ভারত, চীন, রাশিয়া সহ বিভিন্ন দেশি বিদেশি লুটেরাগোষ্ঠী ভাগবণ্টন করে নেবে আর দেশের মানুষ দারিদ্র আর গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বিপর্যস্ত হবেন এটা আমরা মেনে নিতে পারি না।
* তেল-গ্যাস কমিটির আন্দোলন ও প্রধানমন্ত্রীর ভুলে যাওয়া তথ্য
গত ১৮ জুন এই হরতাল সহ আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণার এক ঘন্টার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় কমিটিকে কটাক্ষ করে বক্তব্য দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, দেশের সংকটকালে জাতীয় কমিটির লোকদের কখনোই দেখা যায়নি। সকলেই জানেন জাতীয় কমিটিতে প্রবীণ অনেকেই আছেন যারা ৫২র ভাষা আন্দোলন, ৬০ দশকের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার পর বিভিন্ন ধরনের স্বৈরশাসন ও সামরিক শাসনসহ অন্যায় নিপীড়নের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন, স্বয়ং জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক দু’বছরের অধিককাল জেল খেটেছেন। জনগণের অধিকার আদায়ের লড়াইএ শরীক রাজনৈতিক দলগুলো সবসময়ই সক্রিয়। জাতীয় কমিটির মধ্যে অনেক বিশেষজ্ঞ ও লেখক আছেন যারা দেশের জ্বালানী ও বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান, উন্নয়ন, দারিদ্র ও বৈষম্য থেকে জনগণের মুক্তির অধিকার নিয়ে যথাসাধ্য কাজ করছেন।
প্রধানমন্ত্রী আরো বলেছেন, বিএনপি আমলে জাতীয় কমিটির কোন তৎপরতা দেখা যায়নি। এর চেয়ে বিস্মরণ আর কিছুই হতে পারে না। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকারের আমলে বিবিয়ানা কূপ থেকে ভারতে গ্যাস রফতানি, উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন ও পাচার এবং চট্টগ্রাম বন্দর মার্কিন জালিয়াত কোম্পানির হাতে তুলে দেয়া প্রতিরোধ করতে জাতীয় কমিটি একাধিক লংমার্চ করেছে। জাতীয় কমিটির এই আন্দোলনের কারণে তিনটি ভয়াবহ পরিণতি থেকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা পেয়েছে।
২০০৫ সাল থেকে ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত খনি করে এশিয়া এনার্জির হাতে বাংলাদেশের কয়লা সম্পদ তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে জনগণ জাতীয় কমিটির নেতৃত্বে রক্তক্ষয়ী গণআন্দোলন গড়ে তুলেছেন। সেই গণঅভ্যুত্থানের সময় দেশব্যাপী যে হরতাল আহ্বান করা হয়েছে সেই হরতালের প্রতি শেখ হাসিনা সমর্থনও জানিয়েছিলেন। তিনি মনে রাখতে না চাইলেও তাঁকে বার বার মনে করিয়ে দিতে হবে যে, ২০০৬ সালের ৩০ আগষ্ট জনগনের সাথে ৪ দলীয় জোট সরকার উন্মুক্ত খনি নিষিদ্ধ ও এশিয়া এনার্জি বহিষ্কার সহ যে ৬ দফা চুক্তি করতে বাধ্য হয়েছিল শেখ হাসিনা তার প্রতি পূর্ণ সংহতি জানিয়েছিলেন। তিনি তৎকালীন সরকারকে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন যে, ‘এই চুক্তি না মানার পরিণতি হবে ভয়াবহ।' কিন্তু তিনি ক্ষমতাসীন হওয়ার পরে প্রায় ৩ বছর হতে চলেছে। চুক্তি বাস্তবায়ন করা দূরে থাক তা ভঙ্গ করে চলেছেন, অর্থাৎ বাস্তবে ৪ দলীয় জোট সরকারের মতোই দেশি বিদেশি লুটেরাদের স্বার্থে গ্যাস-কয়লা সম্পদ পাচারের ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছেন।
প্রধানমন্ত্রী ব্যঙ্গ করে বলেছেন, গ্যাস বিদ্যুৎ সংকট সমাধানে জাতীয় কমিটিকে দায়িত্ব নিতে। জ্বালানি মন্ত্রণালয় এখন যেভাবে বিদেশি কোম্পানি ও লুটেরাদের আস্তানায় পরিণত হয়েছে তাকে এই রাহুগ্রাস থেকে মুক্ত করা আমাদের অন্যতম দাবী। দুর্নীতিবাজ ও বহুজাতিক কোম্পানির লবিষ্টদের হাত থেকে মুক্ত করলে অনেক কম সময়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট দূর করা সম্ভব এবং তাতে সমগ্র অর্থনীতিও নতুন করে জীবন পাবে। প্রধানমন্ত্রী এই কাজে সম্মত হলে বাকী দায়িত্ব নেবার যোগ্য লোক দেশে অনেক আছে।
* গ্যাস আমাদের দরকার। তাহলে এধরনের চুক্তির বিকল্প কী হতে পারে?
প্রাপ্তির তুলনায় পুঁজির পরিমাণ নগণ্য। কনকো পিলিপস প্রথম ৫ বছরে যা বিনিয়োগ করবে তার পরিমাণ ১১০ মিলিয়ন ডলার বা ৭৭০ কোটি টাকা। এই টাকা বাংলাদেশের জন্য কিছুই নয়। পেট্রোবাংলা প্রতিবছর এর কয়েকগুণ অর্থ সরকারের কোষাগারে জমা দেয়। প্রযুক্তি বা দক্ষ জনশক্তির অভাব আছে ঠিকই। কনকো ফিলিপসও সবকাজ নিজে করবে না। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে তারা সাবকন্ট্রাক্ট দেবে। বাংলাদেশ গ্যাসব্লকের উপর তার পূর্ণ কর্তৃত্ব রেখে প্রয়োজনে নির্দিষ্ট কাজের জন্য সাবকন্ট্রাক্ট দিতে পারে, প্রবাসী বা বিদেশি বিশেষজ্ঞদেরও কাজে লাগাতে পারে। বাংলাদেশ তার মালিকানাতে, জাতীয় প্রতিষ্ঠানের কর্তৃত্বেই যদি এই কাজ শুরু করে তাহলে প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস উত্তোলন সম্ভব হবে, এই গ্যাস নিশ্চিতভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতির নতুন জীবন দান করবে, দুর্ঘটনার সম্ভাবনা কম থাকবে, জ্বালানী ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, সর্বোপরি হীনমন্যতা থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ তার প্রতিষ্ঠান ও দক্ষ জনশক্তির ভিত্তি নির্মাণ করতে সক্ষম হবে।
অতএব দেশ ও জাতীয় সম্পদ রক্ষায় জাতীয় কমিটির এই হরতাল ও আন্দোলনের কর্মসূচি ক্ষমতা নিয়ে কামড়াকামড়ি বা সহিংসতার হরতাল নয়। অনিচ্ছায় বা ভয়ে নয়, জনগণ এসব কর্মসূচি পালন করবেন তার নিজের স্বার্থে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থে, বাংলাদেশের অস্তিত্বের স্বার্থে, স্বত:স্ফূর্তভাবে, স্বউদ্যোগে|
তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি
২০ জুন ২০১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


