somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সংবিধান সংস্কার ও ঐকমত্য কমিশন: জনগণের কণ্ঠস্বর কোথায় হারিয়ে গেল?

০৩ রা নভেম্বর, ২০২৫ দুপুর ১২:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
“সংবিধান সংস্কার ও ঐকমত্য কমিশন: জনগণের কণ্ঠস্বর কোথায় হারিয়ে গেল?”[/su



বাংলাদেশের রাজনীতিতে আজ সবচেয়ে আলোচিত বিষয় সংবিধান সংস্কার। বছরের পর বছর ধরে নানা সময় এই শব্দ দুটি এসেছে রাজনৈতিক আলোচনায়, তবে এবার বিষয়টি এক নতুন পরিপ্রেক্ষিতে সামনে এসেছে — “ঐকমত্য কমিশন” নামে একটি উদ্যোগের মাধ্যমে। এই কমিশন সংবিধানের নানা দিক পর্যালোচনা করে বেশ কিছু প্রস্তাব দিয়েছে, যেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হলো গণভোটের প্রস্তাব এবং নির্বাহী ক্ষমতার কাঠামো পুনর্বিন্যাসের সুপারিশ।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় জনগণ কোথায়? গণভোটের নামে যদি জনগণের কণ্ঠস্বরকে আবারও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তাহলে সেটা গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করবে না, বরং আরও দূরে ঠেলে দেবে।

গণভোট আসলে গণতন্ত্রের এক বিশেষ অস্ত্র—যেখানে জনগণ সরাসরি সিদ্ধান্ত দেয়। কিন্তু সেই অস্ত্র যখন রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হয়ে পড়ে, তখন সেটি জনগণের কণ্ঠস্বর নয়, বরং ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশে অতীতে গণভোটের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমানের গণভোট, ১৯৮৫ সালে এরশাদের গণভোট—দুটিই ছিল শাসক পক্ষের বৈধতা অর্জনের কৌশল মাত্র। এখন যদি আবারও গণভোটকে সেই একই পথে চালানো হয়, তাহলে “গণভোট” নয়, “গণনাটক” তৈরি হবে।

ঐকমত্য কমিশন বলছে, সংবিধান সংস্কারের মাধ্যমে একটি “নতুন ঐক্য” গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ঐকমত্যের জায়গায় দ্বিমতই বাড়ছে। ক্ষমতাসীন দল কমিশনের বেশিরভাগ সুপারিশকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করছে, আর বিরোধী পক্ষ বলছে—এটা আসলে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার ব্লুপ্রিন্ট। এমন পরিস্থিতিতে জনগণের প্রকৃত মতামত, উদ্বেগ বা অংশগ্রহণ কোথায় প্রতিফলিত হচ্ছে?

একটি রাষ্ট্র তখনই গণতান্ত্রিক হয়, যখন নাগরিকদের কণ্ঠ শুধু ভোটের সময় নয়, নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াতেও গুরুত্ব পায়। অথচ বর্তমান আলোচনায় নাগরিক সমাজ, আইন বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক—এমনকি সাধারণ জনগণের অংশগ্রহণও সীমিত। কমিশনের সভা, খসড়া প্রতিবেদন—সবই সীমিত পরিসরে হয়েছে। এতে তৈরি হয়েছে “অংশগ্রহণের সংকট”—যা গণতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ সংকেত।

সংবিধান সংস্কার মানে শুধু আইনের ধারা বদল নয়; এটি মানসিক ও রাজনৈতিক সংস্কারেরও প্রশ্ন। রাষ্ট্রের মৌল কাঠামো, ক্ষমতার ভারসাম্য, নাগরিক অধিকার—এসবই এর অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু যখন এই সংস্কারের আলোচনাই ক্ষমতার কেন্দ্রিক রাজনীতির ভেতর সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন তা জনগণের জন্য নয়, বরং দলের জন্য হয়।

অন্যদিকে, গণভোটের ধারণা নিয়ে আশাবাদও আছে। কেউ কেউ বলছেন, এটি জনগণকে সরাসরি সিদ্ধান্তে অংশ নিতে দেবে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত সমাজে গণভোট অনেক সময় আরও বিভাজন তৈরি করতে পারে। তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ভুয়া প্রচার, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা—এসবও জনগণের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে “গণভোট” তখন গণতান্ত্রিক নয়, বরং নিয়ন্ত্রিত এক প্রদর্শনীতে পরিণত হয়।

বর্তমান সময়ে রাজনীতি ও বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা, এবং জনঅসন্তোষের প্রেক্ষাপটে সংবিধান সংস্কারের আলোচনা এক নতুন মাত্রা পেয়েছে। জনগণ পরিবর্তন চায়, কিন্তু তারা আবার ভয় পায়—এই পরিবর্তন যেন ক্ষমতার পালাবদলের অজুহাত না হয়ে যায়। ঐকমত্য কমিশন যদি সত্যিকার অর্থে ঐকমত্য চায়, তবে প্রথমে তার নিজের প্রক্রিয়াকে উন্মুক্ত করতে হবে। জনগণের কাছে এর খসড়া প্রকাশ করতে হবে, নাগরিক আলোচনার সুযোগ দিতে হবে, এবং বিশেষ স্বার্থের বাইরে এসে একটি “জাতীয় সংলাপ” আয়োজন করতে হবে।

গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো তার দ্বন্দ্ব ও সংলাপ। যখন সংলাপ বন্ধ হয়, তখনই চরমপন্থা জন্ম নেয়। আজ আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সংবিধান সংস্কার নয়—বরং সেই সংস্কারের প্রক্রিয়াকে কতটা জনগণমুখী করা যায়, সেটাই আসল প্রশ্ন।

জনগণের কণ্ঠস্বরকে পুনরুজ্জীবিত না করলে কোনো সংস্কারই টেকসই হবে না। ইতিহাস বলছে—যখন জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া সিদ্ধান্ত হয়, তখন সেটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই আজ প্রয়োজন “কমিশনের ঐকমত্য” নয়, “জনগণের ঐকমত্য”।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা নভেম্বর, ২০২৫ দুপুর ১২:২৮
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

স্বর্গময়

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ১৫ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৫৩


ওরা জান্নাত দেখে না
পুড়তে পুড়েই তো ছাই-
কতখানি জান্নাত দেখো
ঘরের ভিতর আছি কি?
নাকি মাটিতে থাক ঘুম;
যতক্ষুণ আছো নিঃশ্বাস
ততক্ষুণ জান্নাত দেখো
পরিবারে কিংবা চারপাশ!
পরকাল কে দেখে শান্তিময়
এখানে রচনা করো স্বর্গময়;

১৫-৬-২৬ ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘র’-এর কৌশল, প্রভাব ও গুপ্তচরবৃত্তির প্রকৃতি , পর্ব ০১

লিখেছেন মেহেদী আনোয়ার, ১৫ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৭

'র'-এর গুপ্তচরবৃত্তির প্রকৃতি সম্পর্কে আলোচনা করার পূর্বে স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন ও তৎপরবর্তী পরিচালিত কয়েক ধরনের স্ট্র্যাটেজি ও বাংলাদেশ বিরোধী তৎপরতার বিবরণ দেয়া প্রয়োজন । ১৯৬৮ সালে 'র' গঠিত হয়েছিল মূলত বৈদেশিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবনের গল্প- ১০১

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৫ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৫০



১। একজন মা (কোহিনূর) সারারাত ঘরের দরজা খুলে বসে থাকেন।
কারণ কেউ একজন এসে তাকে বস্তা ভরতি টাকা দিয়ে যাবে। গতকাল রাতের কথা। আমার বাসায় ফিরতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৬ জুনের বিশ্বকাপ কড়চা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১৬ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:২৩

দারুণ একটা ম্যাচ হয়ে গেলো একটু আগে। মিসর দারুণ খেলেছে আজ। সালাহ নেমে যাওয়ার পরে তাদের খেলার ধার বেশ বেড়ে গিয়েছিলো বলে মনে হলো! কিন্তু, বেলজিয়ামের ফরোয়ার্ডদের পাসিং আর ড্রিবলিং... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমন্ত্রন পত্র থাকলে ভিসার দরকার কী! আপনি জানেন আমি কে?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১৬ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০০



ভারত বাংলাদেশের কোনো একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানাতে চাইলে সেই আমন্ত্রণপত্র ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ হাইকমিশনে পাঠাবে। সেখান থেকে আমন্ত্রণপত্র যাবে সেই রাজনৈতিক ব্যক্তির ডিপার্টমেন্টে, তারপর তার কাছে। এরপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×