১.
চাঁদের আলোর সাথে জলাশয়ের স্বচ্ছ জলরাশির মিলনে জন্ম নিতে পারে কোন স্মরণীয় মূহুর্তের। প্রেম, অপ্রেম, সুখ কিংবা হতাশা, কোন এক ধরনের অনুভূতিতে সেই মূহুর্ত সুর খুঁজে পেতে পারে নিশ্চতভাবে। মিলনের সন্ধিক্ষণের স্বাক্ষি হয়ে কোন যুবকপ্রাণ যদি সে জলের উপর নৌকারোহী হয়ে তুমুল প্রাণে ভেসে যায়, তবে তো তাতে শূন্যতা বা পূর্ণতা- সবকিছুরই জন্ম হতে পারে। ভারতবর্ষের অতীত যে কোন মুক্তির সংগ্রামের সাথে খাল, নদী, নৌকা আর রাতের সম্পর্কটা বেশ রোমাঞ্চকর। সেই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন বা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে যতো স্থির/চালিত প্রামাণ্য চিত্র, সিনেমা, নাটক তৈরি হয়েছে তার সবগুলোতেই সংগ্রামীর নৌকা করে গভীর রাতের যুদ্ধ বিলাসের বিষয়টি স্বার্থকভাবেই প্রাণ পেয়েছে। আর সাহিত্যতো তাকে ধারণ করেছে সৃষ্টি সুখে মাতৃ-মমতায়।
ঠিক এই মূহুর্তে রাত বারোটার পরে কৃষ্ণমহুরী খালের বুকে কলকাতা থেকে আসা জয়ানন্দ সেন জয়'র নৌকায় অবস্থান এবং নৌকার সাথে জলমিতালীতে সৃষ্ট সঙ্গম শব্দে অদেখা কোন সংগ্রামের গর্বিত অংশীদারিত্বের অনুভূতিতে শিহরিত হচ্ছে তার যুবপ্রাণ। রাতের আঁধারে গেরিলা দলের অপারেশনে শত্রুদলের আগমনের গন্ধে যেমন বাঁশঝাড় কিম্বা পাটিপাতা অথবা কাশঝাড়ে নৌকা লুকিয়ে কৌশলে আক্রমন করে বসতো, জয়'র মনও তেমন করে চাচ্ছে রূপালী জলের ফাঁক গলে একটু লুকিয়ে যেতে। সবচে' বেশি আলোড়িত হচ্ছে জলের শব্দে।
পশ্চিমবঙ্গের একটি গবেষনা সংস্থা থেকে নেয়া ফেলোশীপের সূত্র ধরে জয়'র আগমন এই বারীগ্রামে। এসেছে আজ ছ'দিন হলো। থাকবে পুরো ১ মাস। সনাতন ধর্মালম্বীদের মাঝে জাতবৈষম্যের উপর এই ফেলোশীপ। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে বাছাই করা শিক্ষানবীশ সংবাদকর্মীদেরকে এই ফেলোশীপ দেয়া হয়। ফেলোশীপ প্রাপ্তদের কাছে যা অত্যাকর্ষক।
পার্শ্ববর্তী নেপাল, ভূটান গেলেও নিজ পৈত্রিক ভিটের দেশ বাংলাদেশে আস হয়নি এর আগে একবারও। অথচ এই বারীগ্রামের পত্তন হয়েছিলো জয়'র দাদার হাতে। এই গ্রাম এই গ্রামের ভূমি, কৃষ্ণমহুরী খাল, সারি সারি পানের বরজ-সব কিছুই আজন্ম ঋণে ঋণী জয়'র দাদার কাছে। অথচ আজ জয়দের কোন স্বজনও এই বাংলাদেশে নেই। থাকবেই বা কেন? মানুষের প্রতারণা, অবহেলা, কোন পশুর হিংস্রতা মেনে নেয়া যায়। কিন্তু ভূমি? ভূমির প্রতারণা কি মেনে নেয়া যায়? হয়তো বা যায়ও। কিন্তু মেনে নিতে পারেনি জয়'র দাদা প্রিয়লাল সেন। আর পারেনি বলেই আজ নিজ দেশ ছেড়ে অন্যদেশে ভিত গড়েছেন। ভিন্ন মাটিকে মা' ডেকেছেন। খুঁজেছেনশীতলতা, যেমন খুজতেন এই দেশের এই মাটিতে।
জয়'র গ্রামে আসাকে কেন্দ্র করে গ্রামের প্রভাবশালী দাস বাড়িতে চিন্তার বলিরেখার সুস্পষ্ট রেখাপাত ঘটেছে। বাড়ির কর্তা চিরন্ময় দাস ও তার পুত্ররা মিলে বৈঠকের পর বৈঠক করেই যাচ্ছে। নানান প্রশ্ন তাদের মাঝে। এতোদিন পর প্রিয়লালের নাতি কেন বাংলাদেশ এলো? সম্পত্তি উদ্ধার করতে নয়তো? নাকি দাসবাড়ির চিরশত্রু পাল বাড়ির কুঁজোটা খবর দিয়ে আনিয়েছে? যদি তাই হয়, তবে কুঁজোর পিঠে পাথর পড়বে নিশ্চিত। ঐদিকে দাসবাড়ির অত্যাচারে যারা অতিষ্ট, তারা এবার আশার আলো খোঁজার চেষ্টা করছে। কেউ কেউতো জয়'কে সর্বাত্মক সাহায্য করার ঘোষনা দিয়েছে। কিন্তু এসবের কিছুই জয় জানে না। বিচ্ছিন্ন এসব ভাবনাগুলো জয়ের মাঝে অবস্থান নিতে পারেনি। জয় আছে তার ফেলোশীপ আর গ্রামের রূপদর্শনে ব্যস্ত। রাতের বেলা হোটেলে আর দিনের বেলা বারীগ্রামে, এভাবেই জয়'র সময় চলে যাচ্ছে। গতকাল রাতে অবশ্য এই গ্রামে অবস্থান নিয়েছিলো। এখানে এসার পর সমবয়সী এক ছেলের সাথে ভালোই সখ্যতা হয়ে গেছে। তাকে নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত জলে ভেসে বেড়িয়েছিলো জয়।
২.
আজ একটু তাড়াতাড়িই হোটেল থেকে বেরিয়ে এসেছে। বারী্গ্রামের কালী মন্দিরের গেইটে চা'য়ের দোকানে বসে চা খাচ্ছে জয়। আর দোকানের মালিকের সাথে কথা বলছে। এমন সময় একটা লোক এসে বললো, চিরন্ময় দাস নাকি জয়কে দাসবাড়িতে যেতে বলেছেন। লোকটি চলে যাবার পর দোকানী জয়কে একটু সাবধান করে দিলেন। কিন্তু সাবধনতা কেন? তাই জয় বুঝতে পারলো না।
চলবে...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

