(উৎসর্গ : বড়আপুকে, এমনই এক বৃহস্পতিবার রাতে আমার কলম ধরার সাহসকে মাটির ঘরে ঘুম পাড়িয়েছিলাম)
একজিমা ভালো হওনের পর পায়ের পাতার দাগ শুকায় যাওনের কথা থাকলেও বাপ মা সুদ্ধা ম্যালা ডাবের জল ঢালতে ঢালতে অন্য অংশ সাদা হইলেও একজিমার কালা দাগটার কিছুই হইলো না। বেবাকের বেবাক বুদ্ধি ধরতে ধরতে মাথার ভিতরে বুদ্ধি রাখার ভান্ডটাতে জায়গার অকুলান দেখা দিছিলো। সব বুদ্ধিরে টঙ্গে ওঠাইয়া সেই দাগ এখন আমার অবসরের সঙ্গী হইছে। পার্কের বেঞ্চিতে বইসা দাগের ওপরে হাত বুলাইতে বুলাইতে মনে হইলো নিজের কপালের ওপর বুলাইতাছি। কপাল আমারে টানতে টানতে কোথায় যেন নিয়া যাইতাছে। খেয়ালে কোন মন্দির মসজিদ না থাকলেও একখান পরশপাথরের জোরে আমার হাঁড় থেইকা জন্মশক্তি লোপ পায় নাই। সাইকেল ধইরা সুবহে সাদেকের সময় বের হওনের পর ২০০ খান পত্রিকা আমার লগে লগে চলে। সালামত সাবের বাসায় পয়লা পত্রিকা দিয়া সারাদিন ম্যালা আলামত মাড়ানোর পর জেসমিন ভাবীর ছোট পোলার হাতে কমিকস একখান ধরাইয়া ছুটি ঘরে রাইখা আসা বৌয়ের দিকে।
দাদা আছিলো গেরামের ইয়াবড় ভূমিদার। ম্যালা দৌলতের মালিক হইয়াও শ্যাষকালে ঘরের ভিটি আর খালপাড়ের দুই বিঘা ধানী জমি আর বড় আইলের পাতা ছড়ানো ছয়টা মান্দার গাছ দেইখ্যা মরার সুযোগ হইছিলো। মার কাছে শুনছি ওই দৌলতদার কাঁদতে কাঁদতে মরছিলো। আমার বাপের বুদ্ধি হওনের পরই নাকি গাঁজায় ধরছিলো। পরে সেই গাঁজা তারে জুয়ার ঘরে এমন আছাড় মারছিলো যে, তার ছাওয়াল এই আমারে পথের মানিক বানাইয়া ছাড়লো। বাপের পকেটখানা যক্ষারোগীর কইলজার মতোন ঠনঠনে হইলেও বরাবরই জমিদারি ভাব নিয়া চলতো। মায়ে প্রবাসী ভাইর থেইকা পয়সা আইনা সংসার চাইতো আবার সেই পয়সা থেইকা প্রতিদিন পেপার কিইন্যা সিতানে বইসা বইসা সোয়ামীরে শুনাইতো। আমার বাপ সত্যিই বহোত আজিব চিজ আছিলো।
মায়ের মরনের ক’দিন পরই বাপেও মরে। ছোট একটা বইন আছে, যারে আমার বন্ধুর থেইকা বিয়া দিয়া বড়ই শান্তিতে আছি। বন্ধু আমার কথা রাখছে। বইনের বিয়ার ক’দিন পর ছোট মামা জোর কইরা তার মাইয়ার লগে আমার বিয়া পড়ায়। বিয়ার পর পরিবার থেইকা বাপের রাইখা যাওয়া শুইয়া খাওনের খাসলৎ ভাইস্যা গ্যাছিলো। বৌয়ের আঁচলের বাতাসে বংশের শরীর থেইকা লম্বা লম্বা নবাবী ক্যাঁশ খইসা পড়ছিলো। নিজের কপালখানা বাপের মতন হওনের আগেই বৌ আমার হাতে ধরাইলো সাইকেলের ব্রেকশো, পকেটে গুঁজাইলো টাকা। লক্ষী অলক্ষীর হিসাব না কইষা বৌয়ের কপালে ঠোট ডইলা পেপার বেচনের কামে নাম লিখাই। আইজকা আমি শহরের নাম করা হকার।
একটা ঘর একটা দুনিয়া, সে দুনিয়ায় একটাই চাঁন একটাই সুরুজ। আমার চাঁনের মুখ একটা ভেজা তুলসী পাতার চাইতেও কাঁচা। বৌটারে আমি হৃষ্টপুষ্ট খরখোশের মতো রাখতে ভালোবাসি। কুয়াশার মতো শীতল আর সাবানের ফেনার মতো কোমল হাসিতে আমার সকল ব্যাথা ধুয়ে যায়। তারে বুকে জড়াইলেই নিজেরে শাহেনশাহী কইলজাটা দাদার খালপাড়ের ধানী জমিটার মতো বড় হইয়া যায়। তারে মাটির সাথে মিশাইয়া রাখি, পিষাইয়া দিই বুকের পাজরে। সারাদিন রোদে দৌড়াইয়া দৌড়াইয়া গায়ের যে রং হইছে তারে আমি তামা বলি, আর বৌয়ের গায়ের রঙরে বলি রূপা। সোনা বৌয়ে তখন কতোভাবে যে রূপার চাইতে তামারে দামী বানাইতে চায়! ইচ্ছামতো বৌয়ের কপালে চুমু খাই। একটা কবুতরের বাচ্চার মতো বৌ আমার বুকে জড়াইয়া থাকে। চোখের পলকে ঘরের ভেতর ফুল পাখি আর চন্দনের ঘ্রান নাইমা আসে।
সেই বিয়ান বেলা থেইকা দৌড়াইয়া দৌড়াইয়া ঘরের সকল কাম শ্যাষ কইরা বৌ আমার গায়ে ফুল চন্দন মাখে আর সারাদিনের যতো হয়রান আর বুকধপানি থুইয়া আসে স্নানঘরের চৌকাঠে। গাছের থেকে এক্ষুনি পাইড়া নেয়া ধোয়া আপেলের মতো নিজেরে সাজাইয়া সন্ধ্যার দিকে চুলায় চা চড়ানোর পর তা ফ্লাক্সে ভইরা মুড়ির বৈয়ামটা একবার মুইছা রাখবো। আমারে ভালোবাসার পর এটাই তার দিনের সবচে’ হাউসের কাম। ম্যালা যতœ কইরা চা বানাই খাওনের যদি ভালো না লাগলে তা ফালাইয়া আবার চড়াইবো। মুড়ির বৈয়ামে কোন বালু পড়তে দিবো না, বৈয়ামের মুখে একটা পলিথিনের টুকড়া দিয়া তারপর মুখ লাগাইবো বাতাস ধরার ভয়ে। এ টুকটাক কাজগুলা তার কাছে এবাদতের মতো।
পেপার বিলির পর সন্ধ্যায় বাড়িতে ফিরলে একটি হুরটুকটুকে মুখ দেখবো এই আশায় বিয়ান থেইকা সন্ধ্যা পর্যন্ত কাম করতে হয়রানি আমারে ছুঁইতে পারে না, আমার গলা থেইকা গান নামে না। এই সাধের জীবনের প্রতি বিচ্ছিরি মায়া জইমা গ্যাছে। একদিন আমারে মরতে হইবো এইটা ভাইবা দমের পাত্রটা নাকের ওপর চইলা আসে। চোখ দুইটা ঠেইলা বার হইতে চায়। স্বজনগো কারো মরার খবর শুনলেই বৌটা হাউমাউ কইরা কাইন্দা ওঠে। আমার পুরা বুক পিঠ বাসাইবো তার চৈত মাসের বৃষ্টির মতো চোখের জলে। কোনভাবেই মরতে চায় না রাতের গাঙ্গের পানিতে জ্যোৎস্নারে একা থুইয়া। খোদার কসম কইরা কই ভরা আষাঢ়ে শ্যামা মেঘের ঘন দিনে আকাশের দিকে তাকাইয়া বৌয়ের কথা মনে ওঠলে মেঘগুলান পাট্টা পাট্টা হইয়া খইসা পড়ে, নাইচা ওঠে বৌয়ের দিলের মতো বড় একটা নীলামনপরী।
২.
যেইবার আমরা গেরাম থেইকা এই জেলা শহরে ওইঠা আসি- গেরামের মানুষরা সেবার গোলার ভেতর কোঁচায় ভইরা ভাগ্য ওঠাইছিলো। ঘরে ঘরে মাইয়া মানুষগো ধানফুটানো ভোর-সন্ধ্যা বৌয়ের চোখে মুক্তোদানা থুইয়া রাখতো। গেরামে সেবার যে পরিবার ধান পায়নি, সেও দশ বারো মন কইরা পাইছে। মাটি সেবার চাষার লগে গাদ্দারি করে নাই। কিন্তু আমার বৌয়ের সুখের লগে গাদ্দারি করছিলো তার শশুর। বাপের দিন্না জমিন বেইচা বেইচা ফকির হওয়া মাইনষের পোলারে বিয়া কইরা গোলায় স্বপ্ন ওঠানোর আশার আগুনে পানি পড়ছিলো। সেই রাগে বৌ আমারে শহরে নিয়া আসে। বৌয়ের খায়েশ টাকা জমাইয়া গেরামে একটুকরা মাটি কিইন্না স্বপ্ন ফলাইবো। বৌয়ের মতোই বৌয়ে স্বপ্নগুলান আমারে ম্যালা যত্ন দেয়, আদর দেয়।
দুপুরের এ বেলায় পার্কে জিরাইতে গিয়া সাইকেলটারে প্যান্টের বেল্টের লগে শিকলে জড়াইয়া তালা লাগাই। বৌয়ের কেনা এই সাইকেল হারাইতে দিমুনা, মাস্তান কও আর ক্যাডার কও কাওরে নিতে দিমু না। এইটা আমার বৌয়ের উপহার। ম্যালা মানুষ আমার এই কান্ড দেইখ্যা হাসে, ঠাট্টা করে! আমার গায়ে সেইটা বাতাসে ওড়া ধূলির মতোও লাগে না। মনের ভেতর ভাবনার মাচানঘরে বৌ, চোখের মনির মধ্যিখানে বৌ; যার দিলের থোড়ে অমন সম্পত্তি জড়াইয়া আছে তারে কি আর পাছে লোকের কিছু কথায় ধরতে পারে?
শুরু থেইকা সন্ধ্যা পর্যন্ত, সালামত সাবের বাড়ি থেইকা জেসমিন ভাবীর ছেলের হাত পর্যন্ত কি ঘটলো আর কি রটলো- এটাই আমার বৌয়ের কাছে নাটক সিনেমা দেখনের আনন্দ। কতো কইরা কইছি ঘরে একটা টিভি কিইন্যা দিই, বৌ এইটা শুনতেই পারে না। কি যে একখান টানটান মুখ নিয়া হাজার রাতের অপেক্ষার সুর চোখে আইনা একটা নবজাতকের মতো অনড় হইয়া দাড়াইয়া থাকে দরজার পাশের বাঁশের খুঁটিটা ধইরা আর ঠোটে কোণে চোখের কোণে সুখ টাঙাইয়া রাখে- সেই সুখ দেইখা বৌরে জড়াইয়া আদর করতে মন চায় বইলাই গলির মুখে পানির ট্যাপ থেইকা হাতমুখ ধুইয়া আসি। বৌ আমার তখন অল্পজলের পুঁটি হইয়া যায়। হাত ধইরা টাইনা স্নানঘরের দিকে নিয়া যাওনের আগেই স্নানঘরের ভেতরে সাবান তোয়ালে আর তার গালের গোশতের মতো পরিষ্কার পানি রাইখ্যা আইবো। এসব একটু পর সিনেমা দেখনের বহুত খায়েশী আয়োজন। এই সিনেমা কাহিনী শুইনা কাজল মাখানো চোখের সামনে একখান সোনার পর্দা টাঙাইয়া দেখন লাগে।
রশিদ কলোনীর গিয়াস কাকার বৌ ক’দিন আগে আমারে কইলো কোন পেপারে মাইনষের বৌ পালানোর খবর বেশি আসে তা জানানোর জইন্য। পরদিন তার হাতে সেরকম একখান পেপার ধরাইয়া জিগাইছিলাম এই পেপার ক্যান দরকার। এক আজিব কথা শুনাইলো আমারে- খবরগুলা বেলেডে কাইট্যা কাকার সিগারেটের এ্যাষট্রের ওপর রাখবো। যাতে কইরা বৌ পালানোর ভয়ে ঘরের ভেতর একটু মাথা নোয়াইয়া চলে। কাকীর এ কাহিনী শুইনা বৌ হাসতে হাসতে আমার কোলের কাছে খাট ধইরা বইসা পড়ে। তার হাসির লগে লগে পড়া মুক্তাগুলান যদি ধইরা রাখতে পারতাম তবে সেই মুক্তা বেচনের টাকা দিয়া তাজমহলের মতন একখান দালান বানানো যাইতো।
প্রতিদিন সন্ধ্যায় ঘরে আইসা খেলার খবর পইড়া মিঠু কতোদূর লাফাইছে, নতুন রেসিপি পাইয়া মতিন মামার পোলার নয়া বৌ হাঁসলো কিনা, রাজনীতির খবর পইড়া চমকাইয়া মোস্তাফিজ সাবের চশমা পড়ার গল্প, সিনেমার ম্যাগাজিনে ইন্ডিয়ান নাটকের আলোচনা দেইখা মাস শেষে বিল দেওনের কথা ভুইলা রহিম ভাইর বৌয়ে আমারে কতোক্ষণ দরজায় দাঁড় করাইয়া রাখছিলো অথবা পত্রিকায় নিজের নাম দেইখা মিন্টু সারেং গলা কতোটা মোটা কইরা বখসিস দিতে চাইছিলো- এরকম গল্প জমাইয়া রসাইয়া বৌরে শুনাইতে আমার চান্নি হাতে পাওনের মতন আনন্দ। আয়ু ফুরানোর আগেই আমার মরন হইবো যদি কোন কারণে এই আনন্দ মইরা যায়।
সামনের রবিবার নতুন চাকরীতে জয়েন করুম। এক অফিসের পিয়নের চাকরী। ভালা বেতনের চাকরী পাইয়া বৌয়ের কপালে চান্দের মতন জ্বলতে থাকা একটুকরা মাটিতে স্বপ্ন ফলানোর কথা মনে পড়ছিলো। মনে হইলো বছর খানেক পরই মাটি সাজাইয়া স্বপ্ন রোপা যাইবো। বৌয়ের মুখের সুখের হাসি আমার ঘরে আরেকখান স্বর্গ বাড়াইয়া দিবো। কিন্তু বাড়িতে যাইয়া বৌয়ের দুইগালে হাত নিয়া নাকি ডলা দিতে দিতে যখন নতুন চাকরীর খবর শুনাই বৌয়ের মুখে মাইঝরাইতের আন্ধার নামছিলো। বিয়ার পর এই প্রথম আজগুবি এক ডর তার মুখে নাইচা ওঠলো। দুইহাত তারে টাইন্যা আইনা বুকে জড়াইলো আর জিগাইলো- বৌরে, মুখটারে ক্যান মরাবড়ির মতন বানাইলি? তোর কি হইছেরে? বৌ আমার বুকের ক্যাঁশগুলা নাড়াইতে নাড়াইতে কইলো- কি হইছে, ক্যান হইছে কইতে পারুম না। তুমি কোন অফিসের পেটমোটা ব্যাটাগোরে স্যার ডাকনের কাম পাইছো তা জানি না, জানার দরকারও নাই। আমি খালি সাঁজের বেলায় ফ্লাক্সভর্তি চা আর মুড়ির বৈয়াম নিয়া বইসা থাকতে চাই আর গেরামে এক আধুলি মাটি কিইন্যা স্বপ্ন ফলাইতে চাই। সেই স্বপ্ন তোমার কাছে বন্ধক দিছি, মনের ভেতর জাইগা থাকা আমাগো প্রথম সন্তানের মতন পবিত্র এই স্বপ্নের মালিক তুমি। জানি তার কোন অমর্যাদা হইবো না।
একটু দম নিয়া শ্যাষে আমার বুক থেইকা মাথাটারে কিঞ্চিত ওঠাইয়া চোখ দুইটারে টানটান কইরা কইলো- ফ্লাক্সভর্তি চা আর মুড়ির বৈয়াম নিয়া বইসা থাকতে চাই, চাই গেরামে এক আধুলি মাটি কিইন্যা স্বপ্ন ফলাইতে, আর তোমারেতো সব্বার আগেই চাই।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে ডিসেম্বর, ২০০৯ ভোর ৪:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


