১ম পত্র
এ পথে যখন শব্দহীন মাছিরা পা ফেলতো তখনো আমরা কোরাস গালিগালাজ করতাম। ডাহুকচোখের মতো মালঞ্চ ফুলগুলোয় শরতের বিকেল গুঁজে রেখে শেষরাতে এসে উদ্ধার করতাম। বারোমাসি কুয়াশা তখন উমরোদের দৌড়ানি খাওয়ার প্রস্তুতি নিতো। মুয়াজ্জিনের গান শুরুর আগেই আমরা লালন বাজিয়ে শেষ করতাম। মসজিদের মুয়াজ্জিন আর ইমামের বড় স্ত্রী চোখ ছোট করে গালটাও খানিকটা বাঁকা করে চেয়ে থাকতো। তবে আমরা কখোনোই ইমামের বড় মেয়ে আর মুযাজ্জিনের সুন্দরী পুত্রবধূর দিকে ঢিল ছুঁড়ে মারিনি। শুধু একদিন প্রচুর ঢিল হযরত মিয়ার ঢাল পুকুরে জলবৃত্ত নির্মাণ করেছিলো। সেদিন সকালেই খবর এসেছিলো কোন অসুখ ছাড়াই মুয়াজের শরীরটা প্রাণ হারিয়েছে।
কেউই মুয়াজকে ইতিহাস বানানোর অপচেষ্টা করিনি। অবশ্য মুয়াজের মৃত্যুর পরদিন ভোরে আমাদের কালীবটের আড্ডায় গাছের গায়ে “মুয়াজ পাটী” সাইনবোর্ড দেখে বুঝতে পারি এটা পারভেজের কাজ। পারভেজ আর মুয়াজকে কখনোই পাশাপাশি বসতে দেখিনি। মুয়াজের মুখে গন্ধ বলে আমাদের আড্ডায় প্রায়ই মুখের গন্ধ নিরোধক প্রবন্ধ উপস্থাপিত হতো। এসব পারভেজেরই কাজ।
সরাসরি না বললেও মুয়াজ প্রতিরাতেই তার ছোটকাকার গাঁজার পুটলির এক অংশ শেষ করতো। পরানবাবুর মদের দোকানের গেইটে যেবার মুয়াজকে আবিষ্কার করা হয়েছিলো- আহারে! মুয়াজের বয়স কমে আসার দৃশ্য দেখে আমরা তাকে কুমড়া নাম দিয়েছিলাম। তবে গাঁজা বা মদ তাকে খেতে পারেনি। সম্ভবত মুয়াজই গাঁজা এবং মদ খেতে ভালোবাসতো।
আরো কয়েকটি মৃত্যু অথবা ভীবৎস বেঁচে থাকা আমাদের কারোরই একদিনের বেশি মনখারাপের কারণ হয়নি। জানি না এ বিষয়ে নিহত বা জীবাহত ব্যক্তি আত্মা কোন অভিযোগের জন্ম দিয়েছিলো কি না? বেঁচে থাকাদের কদর করতে অভ্যস্ত সবারই জীবনের প্রতি অশ্লীল টান দেখে একে অপরকে ভীষণ হিংসা করতাম। সেটা অভিনয়ই হোক আর বাস্তব হোক।
ওসব চিমচিমে মেঘ আর কটকটে আঁধারের ব্যবচ্ছেদ ঘটানোর মতো বীরত্ব কেবল মুয়াজই দেখাতো। প্রতিদিন সে একটা করে দর্শনের জন্ম দিতো। নিজেরটা নির্বাচন করার মতো ঝুঁকিতে যেতো না। কোন যুক্তিতে নয়, কেবল বিরোধিতা করার খায়েশে মুয়াজের দর্শন বাতিল করতে করতে নিজেরাই অস্তিত্বহীন হতে গিয়ে একবারও পেছন তাকাইনি। আমরা নিয়মিত মগজ ধোলাই করে নিতাম। এসব আমাদেরই স্বার্থে, বলা চলে হীনস্বার্থে!
আমরা যুক্তিতে বিশ্বাসী নই বলে আড্ডার বিতর্কে মুয়াজকে জিততে দিতাম না। আসলে বিচারের ভারটা আমাদের কাছেই থাকতো। একদিন কেবল কামড়ে বটগাছের ছাল ছেঁড়ানো ছাড়া আর কোন প্রতিবাদ করতে দেখেনি। তবুও আমরা নিত্যকার উপহাস থেকে তাকে বঞ্চিত করিনি।
২য় পত্র
: কে?
: তোমার ডান হাতের সবচে’ ছোট রেখা।
: পায়ের তালুয় কোন কাঁটার দাগ?
: ওসব বৃত্তাকার ভাবনায় কোন পন্ডিতই কেশ বিসর্জনের দায়িত্ব নেয়নি।
: তবে মাজিদার কোলের ওই শিশুটির পিতা কে?
: তুমি ঘুম থেকে উঠে চোখে পানি ছিটিয়েছো?
একটু কম আঁধারের রাতে আত্মার সাথে সংলাপের এ পর্যায়ে এসে “তোমার কন্ঠে প্রশ্ন কেন?” এরকমই একটি চিৎকারে পারভেজ ভয় পেয়ে গায়ে জ্বর বাঁধানোর পরদিনই মুয়াজ তার বিধবা মামীর কাছে আশ্রয় নেয়। পুরো নিখোঁজ হওয়া নিশ্চিত করে তিন আত্মীয় বাদে সবার বাড়ি খোঁজ নিয়েও তার পোকা ধরা শরীরটা আবিষ্কার করা যায়নি। বিধবা ওই মামীসহ অপর এক খালা আর বাবার ফুফাতো বোনের বাড়িতে কখোনোই মুয়াজ যাবে না বলে বুলি চালতো।
সেদিন শীতের সকল গাঢ় কুয়াশা ভেঙ্গে দিয়ে বরফ হয়ে আসা কানের সুড়ঙ্গে প্রবেশ করা একটি সংবাদ গ্রামের সকল আগুনপোহানো ছাইস্তুপ অনর্থক করে দিয়েছিলো। জমে যাওয়ার মতো বিষয়ে কেউই প্রস্তুত না থাকলেও আমাদের জমে যাওয়া দেখে সে দু:সংবাদকে যায়গা করে দিতে কুয়াশারা সরে যাচ্ছিলো। এক দু®প্রাপ্য বিণয় একটি দু:সংবাদকে চাপিয়ে মেনে নিয়েছিলো বিধবা মামীর বাড়ি আশ্রয় নেয়া মুয়াজের পুরো এক সপ্তাহ।
এসকল কথা আবিষ্কার করি অনাকাংখাতি মৃত্যুর প্রতাপে অসুস্থ হওয়া বিধবা মামীর সুস্থ্য হওয়ার পর। মুয়াজের সর্বশেষ জিতে যাওয়ার পর পারভেজ আরো একটি সাইনবোর্ড লেখার কাজে হাত দিয়েছিলো। মুয়াজের বলা একটি কথা কালো প্লেটের গায়ে সাদা হয়ে ফুটেছিলো।
শত্র“তার শেষদৃশ্যে মিত্রতা অবিশ্বাস্য নয়!
(এটি একটি গল্প)
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জানুয়ারি, ২০১০ বিকাল ৪:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


