কুখ্যাত বোর্ড হিসাবে যশোর বোর্ডের এমনিতেই অনেক দুর্নাম আছে।এবার যশোর বোর্ডের রেজাল্ট দেখে আঁতকে উঠেনি এমন মানুষ হয়ত কমই আছে।সারা দেশের তুলনায় যখন একটি বোর্ডের রেজাল্ট এত বেশি খারাপ হয় তখন ধরে নিতে হবে সেই ব্যাচে সমগ্র দেশের গাধা শিক্ষার্থী এক হয়েছে।হ্যাঁ আমি জানি সারা দেশের দূর্বল ছাত্রদের একটি বোর্ডে এসে জমা হওয়া সম্ভব নয়।তাহলে বুঝতে হবে এমন রেজাল্ট বিপর্যয়ের পেছনে অবশ্যই কোনো কারন আছে।নিশ্চয় এই বোর্ডটিতে পরীক্ষার প্রশ্ন, উত্তরপত্র মূল্যায়ন এবং ফল প্রকাশের জটিল প্রক্রিয়ার এক বা একাধিক ধাপে বড় ধরনের কোনো সমস্যা হয়েছে।সাধারণ মানুষ হিসাবে আমার পক্ষে বোর্ডের অন্দর মহলের গূঢ় তথ্য জানা সম্ভব না।কিন্ত সাধারন মানুষের লেভেল থেকে কিছু চিহ্নিত সমস্যার উল্লেখ না করে পারছি না।
নিজে যশোর বোর্ডে এস,এস,সি এবং এইচ,এস,সি দিয়েছি তাই এই বোর্ডের বিটকেল প্রশ্ন ফেস করার বিস্তর অভিজ্ঞতা আছে।অন্য বোর্ডের মেধাবীদের হেয় করার জন্য বলছি না কিন্ত এই বোর্ডের আজগুবি প্রশ্নের তুলনায় ঢাকাসহ বেশির ভাগ বোর্ডেরই প্রশ্ন বেশ সহজ হয়।
বিশ্বাস না হয় যেকোনো টেস্টপেপার খুলে তুলনা করে দেখুন।সোজাসুজি প্রশ্ন না এসে এখানে প্রায়শই ঘোরানো প্যাঁচানো বিটকেল বিদঘুটে প্রশ্ন আসে।এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে প্রস্তুতি যত ভালই হোক ছাত্রদের পক্ষে প্রায়ই আশানুরূপ ফল করা সম্ভব হয় না।আবার যারা যেকোনো মূল্যে ভাল কএতে চায় তাদের অমানুষিক পরিশ্রম করতে হয়।শেষ পর্যন্ত তারা হয়ত লক্ষ্যে পৌছাতে পারে কিন্ত সাধারন এবং দূর্বল ছাত্ররা পাশের গণ্ডি পেরুতে পারেনা।যার ফলশ্রুতিতে রেজাল্টে এমন ধ্বস নামে।
আমার মায়ের একজন কলিগের মেয়ে এবার বেমালুম ফেইল করে বসেছে।ভাল ছাত্রী রেজাল্ট খারাপ হলে আর কতই খারাপ হবে?তাই বলে অংকে ফেইল ইংলিশে সি গ্রেড!!মেয়েটি পরীক্ষা ভাল দিয়েছে তাই ফেইল করার কোনো সম্ভাবনাই ছিল না।এমন ঘটনা যে এবার একটাই না তা আপনারা নিশ্চয় অনুমান করতে পারছেন।তবে এটা শুধু এবারের চিত্র না।অনেক কাল ধরেই এমনটা চলে আসছে।কিন্ত কোনো প্রতিকার নেই।কারন খাতা চ্যালেঞ্জ বলে একটা জিনিশের কথা আপনারা জানেন।যেটা অন্য বোর্ডে কাজ করে বলে শুনেছি কিন্ত এই বোর্ডে খাতা চ্যালেঞ্জ মানে শুধু শুধু কিছু টাকা ঢালা।কারন এপর্যন্ত খাতা চ্যালেঞ্জ করে কারো রেজাল্টের উন্নতি হয়েছে বলে শুনিনি।তাহলে কি যশোর বোর্ডের মূল্যায়ন এতই নিখুঁত যে আবার মূল্যায়ন করলে কোনো ভুল পাওয়া যায় না?
না জনাব।ভেতরের চিত্রটা ভীষন ভয়ংকর।কলেজ শিক্ষিকার সন্তান হওয়ার সুবাদে ভেতরের কিছু তথ্য আমার জানা আছে যা যেমন ভয়ানক তেমনি হতাশাজনক।
কেস ১
তখন সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হয়নি।নমিতা(কাল্পনিক নাম) এইস,এস,সি পরীক্ষায় গোল্ডেন প্লাস পাবে বলে আশা করেছিল কিন্ত সে বাংলায় পেয়েছে সি গ্রেড।অন্যসব বিষয়ে এ প্লাস থাকলেও বাংলার গ্রেড তার রেজাল্টটিকে একটানে মাটিতে নামিয়ে দিয়েছে।নমিতা খাতা চ্যালেঞ্জ করে।থার্ড এক্সামিনার খাতা পরীক্ষা করে দেখেন তার লেখা চমৎকার রচনাটিতে বিশের মধ্যে দেয়া হয়েছে চার!যদিও সে চমতকার লিখেছে প্রতিটা পয়েন্ট যা কম দিলেও ১৬ পাওয়ার যোগ্যতা রাখে।ফার্স্ট এক্সামিনার একজন বয়স্ক অভিজ্ঞ শিক্ষক।থার্ড এক্সামিনার তাকে এত কম দেয়ার কারন জিগাসা করলে সে উত্তর দেয় তার মতে এই লেখা ১০ এর মধ্যে ৪ এর বেশি পাওয়ার যোগ্য না।হতভম্ব থার্ড এক্সামিনার আরো জিগাসা করে বুঝতে পারলেন যে অই শিক্ষক জানেন ই না যে রচনাতে ২০ নম্বর।কোন প্রাচীনকালে রচনাতে ১০ ছিল উনি তাই দেখে মূল্যায়ন করে যাচ্ছেন।বর্তমান পরীক্ষায় নম্বর বন্টন দেখে নেয়ার প্রয়োজন তিনি বোধ করেননি।অথচ এই লোক প্রতি বছর ৫০০ খাতা দেখেন।অর্থাৎ এই কাণ্ডজ্ঞানহীন মানুষটার জন্যে আরো অনেক নমিতারই জীবন নষ্ট হয়।
কেস ২
হানিফ সাহেবের(ছদ্ম নাম) মেজাজ ভীষন খারাপ।সেকেন্ড এক্সামিনার হিসাবে খাতা দেখতে গিয়ে তিনি আবিষ্কার করলেন একজন এক্সামিনার খুবই যাচ্ছেতাই মার্কিং করেছেন।অসংখ্য ভাল খাতাতে বাজে মার্কিং করার জন্য অনেক ছাত্রের মার্ক অনেক নীচে নেমে এসেছে।তিনি এক্সামিনার কে তলব করলেন।তাকে জিগাসাবাদ করার পর কোনো সদুত্তর পাওয়া গেল না।তিনি অসংখ্য খাতার মধ্যে কিছু খাতা সংশোধন করতে পারলেন কিন্ত রেজাল্ট প্রকাশের তাড়া আর স্বল্প সময়ের কারনে বেশির ভাগ খাতাই আবার মূল্যায়ন করতে পারলেন না।
এই ঘটনাগুলি সত্য।আপনারা হয়ত ভাবছেন এমন কেয়ারলেস এবং নীতি হীন শিক্ষকদের নিশ্চয় উপযুক্ত শাস্তি হয়েছে।কিন্ত না আপনি ভুল ভাবছেন।এধরনের ভুল যে কি মারাত্মক প্রভাব ফেলে তা আপনারা সবাই জানেন।এমন ভুল করার জন্য শাস্তির ব্যবস্থাও আছে কিন্ত বাস্তব ক্ষেত্রে কি হয় তা জানার জন্য আর একটি কেস।
কেস ৩
রফিক সাহেব প্রধান পরীক্ষক হিসাবে চ্যালেঞ্জ হওয়া একটি খাতা দেখতে বসেছেন।ইংরেজিতে যে ছেলেটা ভীষন ভাল তা তিনি ছাত্রটির লেখা দেখেই বুঝেছেন।ছেলেটি ৭২ পেয়েছে কিন্ত এর ৮০র উপরে পাওয়ার কথা।রিএরেঞ্জ এ এসে তিনি পুরো থ হয়ে গেলেন।ছাত্র পুরোটা ঠিক লিখেছে কিন্ত সেটা কেটে দিয়ে ০ দেয়া হয়েছে।তিনি রিএরেঞ্জ এ ১০ নম্বর দিয়ে দেন।কিন্ত তারপর অন্য উত্তর থেকে এক দুই নম্বর করে কেটে দিলেন যাতে গড় নম্বর একই থাকে।ইচ্ছা না থাকলেও তাকে কাজটা করতে হয় কারন এমন মারাত্মক ভুল ধরা পরলে এক্সামিনারের চাকুরি চলে যাবে।স্বজাতি কে বাঁচানোর জন্য এই অন্যায় কাজ তার বরাবরই করতে হয়।
সকলের জন্য জানাচ্ছি যে এসব ঘটনার পাত্রদের নাম কাল্পনিক হলেও ঘটনাগুলো বাস্তব।অন্য বোর্ডের কথা জানিনা কিন্ত যশোর বোর্ডে এমন ঘটনা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে।কনফিডেন্ট ছাত্ররা খাতা চ্যালেঞ্জ করে ঠিকই, মূল্যায়ন এর ভুলও ধরা পড়ে কিন্ত শিক্ষকদের বাঁচানোর জন্য বলী হতে হয় ছাত্রদের।কতজনের কত স্বপ্ন অধরা থেকে যায় এর ফলে।আমার নিজের বেলায়ও আমি কোনো প্রতিকার পাইনি।এই না পাওয়া মার্কসটুকুর কারনে আমি আমার স্বপ্ন ছুঁতে পারিনি।এই ব্যার্থতা সত্যিকার অর্থেই আমার জীবনটা একদম বদলে দিয়েছে।সেসব যদিও বেশ আগের কথা কিন্ত এবারের রেজাল্ট দেখে নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে হয়েছে।উফ!হাজার হোক ফেইল তো করিনি।
যশোর বোর্ডের খারাপ রেজাল্টের কিছু কারন হচ্ছে-
১। অযৌক্তিক রকম কঠিন আর ফালতু প্রশ্ন।
২।খাতা মূল্যায়ন এর জন্য স্বল্প সময়।যার ফলে পরিক্ষকরা অনেকসময় হেলাফেলা করে খাতা দেখে।এভারেজ মার্কস দেয়ার জন্য ভাল ছাত্ররা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৩।খাতা চ্যালেঞ্জ করলে কোনো লাভ হয় না কারন ভুল থাকলেও শিক্ষকদের বাঁচাতে ছাত্রদের বলী দেয়া হয়।
৪।অযোগ্য পরীক্ষকের কাছে খাতা দেয়া।এরা খাতা ভালমত না দেখেই নম্বর দেয়।
৫।আমার জানামতে একজন পরীক্ষক ২০০ খাতা দেখতে পারেন কিন্ত অনেকে টাকার লোভে অসাধু উপায়ে ৫০০ বা তারো বেশি খাতা নেন।অল্প সময়ে এত খাতা দেখা যে সম্ভব নয় তা আপনারা বুঝতে পারছেন।ইনারা যে শুধু হেলাফেলা করেই খাতা দেখে না তারা অন্য মানুষকে দিয়েই খাতা দেখায় যেটা আইনত দন্ডনীয়।
৬।দায়িত্ব অবহেলার জন্য শাস্তির বিধান থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই।
এস,এস,সি এবং এইচ,এস,সি একজন মানুষের জীবনের খুবই গুরুত্বপূর্ন পরীক্ষা।বলা যায় এখান থেকেই একজন মানুষ তার সমগ্র জীবনে কি করবে বা ক্যারিয়ার কি হবে তা নির্ধারিত হয়ে যায়।এই দুই পরীক্ষার জিপিএ দিয়েই মানুষ সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে।তাই অন্য বোর্ডের তুলনায় যশোর বোর্ডের খারাপ ফলাফলের কারন যথাযথ ভাবে নির্ণয় ও তার প্রতিকার করা খুবই দরকার।প্রশ্ন ফাঁস আর ঢালাও মার্কস এর যুগে কঠিন প্রশ্ন করে এই বোর্ডের সাথে অন্যগুলোর ফলাফলের যদি এত পার্থক্য হয় তখন ভয় জাগে,এটাই বর্তমানের শিক্ষার্থীদের স্ট্যান্ডার্ড এর আসল চিত্র নয়ত?এমন প্রশ্ন হলে অন্য বোর্ডের অবস্থাও কি এমন হতো?
এ প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নেই তবে আমি মনে করি প্রশ্ন এমন হওয়া উচিত যাতে সব মানের শিক্ষার্থী কিছু না কিছু উত্তর দিতে পারে যেহেতু প্রশ্নটা শুধু অনেক মেধাবীদের জন্যই করা হয় না।আর একেক বোর্ডে একেক রকম প্রশ্ন করার দরকার কি?সারাদেশে কি একই প্রশ্নে মূল্যায়ন হওয়াই যুক্তিযুক্ত নয়?
খাতা চ্যালেঞ্জে শিক্ষকের ভুল পাওয়া গেলে তাকে যথাযথ শাস্তি দেয়া উচিত।হাজার হাজার মেধাবীর জীবন নষ্ট হবে কিন্ত শিক্ষকদের কোনো সাজা হবে না বরং পরের বছর তারা আবার সেই একই সু্যোগ পাবে এ কেমন বিচার?
আমি মনে করি না একটা বোর্ডে ফেইল করার মত এত বিশাল পরিমান ছাত্র থাকতে পারে।না জানি কত মেধাবী শিক্ষার্থী অভিমান করে আত্মহননের পথ বেছে নেবে।তাদের অসীম হতাশার মধ্যে ঠেলে দেয়া মানুষগুলো কি চিরকাল ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবে???

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

