দ্বৈত সত্ত্বার ঈদ
সোহরাব রাব্বি
ধুলায়-মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে কান্নারত একটি শিশু,মাঝে মাঝে উঠে বসে অপলক দৃষ্টি নিক্ষেপ করছে ঘরের দাওয়ায় বসা ভ্রু-কুঞ্চিত খায়রুলের দিকে । যে ছেলেটা সকাল থেকে না খেয়ে কেঁদে-কেঁটে বুক ভাসিয়ে ঘুমিয়ে পরেছে ভাঙা চাটাইয়ের দেয়াল ঘেঁসে পাতা অর্ধেক খসে যাওয়া মাদুরটায় -সে রবি। বড় মেয়েটাও প্যান-প্যানের প্রতিদানস্বরূপ কষে দুটো থাপ্পর খেয়ে ঘরের কোনে দাঁড়িয়ে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। হঠাৎ দাওয়া থেকে দাড়িয়ে গর্জে ওঠে খায়রুল।
চেঁচিয়ে মেয়ের উদ্দেশ্যে বলে,‘অই....কানবিনা কইতাছি ,কানদা ডুহে না;ব্যা-ব্যা না কইরা কেরাইচ্চারে (ছোটকে ) ওডাইয়া খাওয়া ,খাইবার পায়না বাত (ভাত) ,ফহিন্নিরবাচ্চারা ট্যা ট্যা করে ঈদের কাফরের লাইগ্যা..’
এ পর্যন্ত বলে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না খায়রুল। ব্যর্থ পিতার চোখ ফেঁটে বেরিয়ে আসে নোনা জল। তবুও এই জল সে দেখাতে চায়না কাউকে। বেরিয়ে আসে জরা-জীর্ণ ঘরটার ভেতর থেকে। ধীরে ধীরে মিলিয়ে যায় বস্তির সরু গলিতে।
‘ড্যাড,আমরা রেডি,চলো’-মেয়ের ডাকে সম্বিত ফিরে পায় রাশেদুল হক। রাশেদ সাহেবের ছোট মেয়ে মৌসুমি।বয়স দশ কি বার। আজ ও বাবা-মার সাথে শপিং এ যাবে। আর তাই মহানন্দে বাবা – মাকে শশব্যস্ত রেখেছে সকাল থেকে। রাশেদ রেডি হয়ে,চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে খবরের কাগজে চোখ বোলাতে বোলাতে অপেক্ষা করছিলেন মা আর মেয়ের জন্যে। এরই মধ্যে সে হারিয়ে যায় খায়রুলের নিগূঢ় বাস্তবতা আর তার ভাবনার অচিন জগতে। আজকের মতোই গত ঈদের দিন তিনেক আগে শপিং এর জন্য শাহ্বাগ থেকে বসুন্ধরা সিটিতে আসতে খায়রুলের রিক্সায় চড়েছিল রাশেদ।কাঁদো কাঁদো হয়ে অভাবের সংসারের কথা বলেছিল সে। গাল্পিক বলেই কিনা সেদিন রাশেদের কোমল মনকে ভিষনভাবে নাড়া দিয়েছিল সে,আজ যেমন সকল চিন্তা প্রচ্ছন্ন করে সে নিজেকে আবিষ্কার করে খায়রুলের সত্ত্বায়। মেয়ের অনেক জোড়াজুরি সত্ত্বেও দ্বৈত সত্ত্বার বদ্ধশিকল হতে মুক্ত হতে পারে না রাশেদ। তাই মা-মেয়েকে শপিং এ পাঠিয়ে দিয়ে সে বেশ কিছুণ তাকিয়ে থাকল নির্মেঘ সুনীল আকাশের দিকে। মনের অজান্তেই তার গন্ডদেশ বেয়ে নেমে এল দু’ ফোটা অশ্র জল।
তারপর তিনি বিষন্ন মুখে বেরিয়ে পরলেন একজন খায়রুলের খোঁজে.....
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই ডিসেম্বর, ২০১০ রাত ৯:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


