somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ: প্রয়োজন ছাত্র গণ-আন্দোলন

২৯ শে আগস্ট, ২০১১ সকাল ১১:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

শিক্ষা কোন পণ্য নয়, শিক্ষা প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠা হওয়ার পূর্বে ও পরে শিক্ষা নিয়ে চলছে নানারকম টালবাহানা। শিক্ষাকে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশের দালাল, শাসক, শোষক গোষ্ঠী শিক্ষাকে একটি বাণিজ্যিক পণ্যে রূপান্তরের আপ্রাণ চেষ্টা করছে। তাই শরীফ শিক্ষা কমিশন থেকে শুরু করে মুনিরুজ্জামান শিক্ষা কমিশন পর্যন্ত সকল শিক্ষা নীতিতেই শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের চিত্র প্রতিফলিত হয়েছে। এসকল চক্রান্তের বিরুদ্ধে তীব্র ছাত্র গণ-আন্দোলন সংঘটিত হয়েছে বারবার। কিন্তু আজ পর্যন্ত বাংলাদেশে রাষ্ট্র চরিত্রের আমূল কোন পরিবর্তন না হওয়ায় শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের চক্রান্ত অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ প্রণীত ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে শিক্ষাকে বাণিজ্যিক রূপদানের চেষ্টা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়েছে। শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণের লক্ষ্যে গ্রহণ করা হচ্ছে বিভিন্ন পদক্ষেপ, চলছে শিক্ষাসহ সেবা খাতগুলোকে বেসরকারিকরণের চক্রান্ত।
শিক্ষাকে বাণিজ্যিক করার লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে ইউ.জি.সি’র বিভিন্ন কৌশল ধাপে ধাপে ছাত্র বেতন বৃদ্ধি, ছাত্র রাজনীতি বন্ধের চেষ্টা, বিভিন্ন রসিদের মাধ্যমে নানা রকম ফি আদায়, নাইট শিফ্ট চালু, শিক্ষা খাতকে পি.পি.পি (Public Private Partnership)’র আওতাভুক্তকরণ, ক্যাম্পাসে স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন প্রভৃতি।
শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ:
বাংলাদেশ সরকার পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত তথা প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক এবং অবৈতনিক করেছে। কিন্তু সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর পক্ষে সকল শিক্ষার্থীর জন্য আসন সংকুলান না হওয়ায় বা শিক্ষার মান যথাযথ না হওয়ায় সকল শিক্ষার্থীরা বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে ঝুকছে। তাই অবৈতনিক শিক্ষা কাগজে পত্রেই রয়ে গেছে, বাস্তব চিত্র ভিন্ন। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে সংকট আরো তীব্র। শিক্ষার এই স্তরে তীব্র আসন সংকটের সাথে সাথে বেসরকারী শিক্ষা আরো ব্যাপকভাবে বিরাজমান। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষা সংকটের এই রূপ আরো ভয়াবহ। বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলো তথা পাবলিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আসন সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। অন্যদিকে উচ্চ শিক্ষা ক্ষেত্রে বাণিজ্যিকীকরণের নীতি কার্যকর করা হচ্ছে ধাপে ধাপে।
বাংলাদেশ একটি নয়া উপনিবেশিক দেশ হওয়ায় এদেশের সকল নীতি নির্ধারিত হয় সাম্রাজ্যবাদের ইশারায় শিক্ষা ক্ষেত্রও এর ব্যতিক্রম না হওয়ায় সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব সংস্থা, বিশ্ব ব্যাংক, আই.এম.এফ’র দ্বারাই নির্ধারিত হয় শিক্ষা সংক্রান্ত সকল নীতি। বর্তমান পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী বিশ্ব দিন দিন গভীর মন্দা অবস্থায় পতিত হওয়ার কারণে নয়া উপনিবেশিক দেশ সমূহে সেবা খাত থেকে ব্যয় কমানোর নীতি গ্রহণ করছে। এরই অংশ হিসেবে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ-এর প্রেসক্রিপশনে বাংলাদেশের দালাল সরকারগুলো সেবা খাতগুলোকে বেসরকারীকরণের নীতি বাস্তবায়নে উঠে পড়ে লেগেছে। তাই শিক্ষাকে বাণিজ্যিক রূপদান করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে বাংলাদেশ সরকার তথা শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
ইউজিসি’র কৌশলপত্র:
২০০২ সালের ২ ডিসেম্বর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (U. G. C.) শিক্ষাকে বাণিজ্যিক রূপে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ২০০৬-২০২৬ সাল মেয়াদী কৌশলপত্র প্রণয়ন করে। সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বসংস্থা, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ-এর প্রণীত ২০ বছর মেয়াদি এই কৌশলপত্রের উদ্দেশ্য হচ্ছে শিক্ষাকে সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক রূপদান করা তথা বেসরকারীকরণ করা। কেননা কৌশলপত্রে উল্লেখ রয়েছে যে, ২০০৬ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজস্ব আয়ের খাত থেকে চলতে হবে। ২০ বছর মেয়াদি এই কৌশলপত্রকে মোট চারটি মেয়াদে বাস্তবায়িত করার পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে, এই সময়ের মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হতে সরকারী ভর্তুকি প্রত্যাহার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আভ্যন্তরীণ আয়ের খাত বৃদ্ধি করা হবে। আভ্যন্তরীণ আয়ের খাতের মধ্যে রয়েছে ছাত্র বেতন ফি, আবাসন ভাড়া, যাতায়াত ভাড়া, বিভাগীয় উন্নয়ন ফি, ডাইনিং চার্জ প্রভৃতি। এছাড়াও নাইট শিফ্ট চালু ও সেমিস্টারের সংখ্যা বৃদ্ধির মত কিছু নতুন আয়ের খাত সৃষ্টির প্রচেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে, কৌশলপত্র বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে ধাপে ধাপে বেতন ফি বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এমতাবস্থায় ছাত্র সমাজ যখনই প্রতিবাদী হয়ে আন্দোলনে নামছে তখনই তাদের কঠোর হস্তে দমন করা হচ্ছে আইনি বেআইনি প্রক্রিয়ায়। সরকারী বেসরকারী অংশীদারিত্ব (PPP):
পি.পি.পি’এর মানে হচ্ছে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় সরকারী বেসরকারী অংশীদারিত্ব। বাংলাদেশ সরকার উচ্চ শিক্ষা খাতসহ সেবাখাত এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে পিপিপি’র আশ্রয় নিচ্ছে। সরকার বলছে যে, পিপিপি’র মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় এর অবকাঠামোগত উন্নতি সাধিত হবে এবং এতে করে সরকারী ও বেসরকারী উভয় প্রতিষ্ঠানই লাভবান হবে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে সরকার প্রকৃত সত্যকে আড়াল করতে চাচ্ছে। পিপিপি’র মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো নির্মিত হলে একদিকে যেমন রাষ্ট্রের দায় এড়াতে পাড়বে অন্যদিকে বেসরকারী প্রতিষ্ঠান লাভবান হবে। আবার সকল বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন। তাই বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিনিয়োগের অর্থ হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে মুনাফা তৈরীর ক্ষেত্রে পরিণত করা। এই মুনাফার একমাত্র উৎস হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ আয়ের খাত তথা বেতন ফি বৃদ্ধিসহ ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে আদায়কৃত নানা ধরনের ফি। তাই পিপিপি’র পরিকল্পনাকে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ থেকে পৃথক করে দেয়ার কোন সুযোগ নেই। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ-এর নির্দেশে শিক্ষার মত সেবাখাতকে বেসরকারী খাতে ছেড়ে দেয়ার যে চক্রান্ত তারই অংশ হিসেবে শিক্ষা ক্ষেত্রে পিপিপি’র বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশের দালাল সরকারগুলো।
শিক্ষা বাণিজ্যের স্বরূপ:
শিক্ষাকে বাণিজ্যিকীকরণের নানাবিধ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বেতন ফি বৃদ্ধির প্রক্রিয়াসহ নানা প্রক্রিয়া চলছে। শিক্ষাকে বাণিজ্যিক করার ইউজিসি’র ২০ বছর মেয়াদী কৌশলপত্রকে বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে প্রতি বছরই বেতন ফি বৃদ্ধি করা হচ্ছে সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। এমনকি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও টিউশন ফি বৃদ্ধি করা হচ্ছে ধাপে ধাপে। এর কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে বর্তমান পণ্য বাজারকে (!)। পূর্বে বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে ইয়ার (ণবধৎ) সিস্টেম চালু থাকার কারণে বছরে একবার বেতন ফি প্রদান করতে হত এবং সেমিস্টার সিস্টেম চালুর প্রথম দিকেও এই ব্যবস্থা চালু থাকলেও বর্তমানে প্রত্যেক সেমিস্টারে পৃথকভাবে বেতন ফি প্রদান করার কারণে তা পূর্বের চেয়ে বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উন্নয়ন ফি’র নামে প্রচুর অর্থ প্রদান করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের যা পূর্বে ছিলনা বললেই চলে। শিক্ষার্থীরা যাতে ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ করতে না পারে সেজন্য কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নয়ন ফি আদায় করার দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে প্রত্যেকের স্ব-স্ব বিভাগের উপর। বাণিজ্যিকীকরণের আর একটি অপচেষ্টা হচ্ছে নাইট শিফট চালুর প্রক্রিয়া। নাইট শিফ্টের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক রূপের হওয়ায় তা শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত হুমকি স্বরূপ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নাইট শিফ্ট চালুর চক্রান্ত এই পরিকল্পনারই অংশ। অন্যদিকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সরকারদলীয় লেজুড়বৃত্তিকারী প্রতিক্রিয়াশীল সংগঠনগুলোর দ্বারা সৃষ্ট অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে উৎসাহিত হচ্ছে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা পদ্ধতি। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের এসকল চক্রান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় উঠলে দমনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তথা সরকার। এসকল আন্দোলনকে চিরতরে স্তব্ধ করার জন্য ছাত্র রাজনীতি বন্ধের মত ঘৃণ্য চক্রান্ত করতেও পিছপা হয় না বর্তমান সরকারগুলো।
বলির পাঁঠা ছাত্র রাজনীতি:
ছাত্র রাজনীতি আজকে কলুষিত, ছাত্ররা কলম ছেড়ে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছে, ছাত্রসমাজ আজ ক্ষমতার লড়াইয়ে ব্যস্ত এরূপ নানা প্রচার সামনে এনে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের চক্রান্তকে সামনে নিয়ে আসছে সাম্রাজ্যবাদের দালাল সরকারগুলো। অথচ এসব অভিযোগে অভিযুক্ত ছাত্র সংগঠনগুলো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকারী মদদপুষ্ট। সরকার বদলে যাওয়ার সাথে সাথে বদলে যায় ক্ষমতার হাত, পবিবর্তন আসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে, রাতের আধারে চলে হল দখল প্রতিক্রিয়াশীল লেজুড়বৃত্তিকারী ক্ষমতাসীন দলগুলো টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অনৈতিক কাজে লিপ্ত হয়। এসকল ঘটনাই ঘটে প্রশাসন ও সরকারের মদদে, এটা কারো অজানা নয়। তাই এসকল দালাল সরকারগুলোর মুখে ছাত্র রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করার কথা অনেকটা ভূতের মুখে রামনামের মতই।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যূত্থান, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনসহ বাংলাদেশের ইতিহাসে সকল প্রগতিশীল আন্দোলনে ছাত্রসমাজে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এমনকি বর্তমান সময়ের বিভিন্ন আন্দোলনেও ছাত্রসমাজের ভূমিকা সাম্রাজ্যবাদ ও তার এদেশীয় দালালদের জন্য অত্যন্ত হুমকি স্বরূপ। আগামীতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ সেবা খাতগুলোকে বেসরকারীকরণের চক্রান্ত বাস্তবায়নের পথে বৃহৎ বাধা হচ্ছে প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতি। তাই প্রগতিশীল ছাত্র সমাজকে দমিয়ে রাখার জন্য ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করার আওয়াজ তুলেছে বর্তমান সরকারগুলো।
আইনি লাঠিয়াল ক্যাম্পাস পুলিশ:
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কৌশলপত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিরাজমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অস্ত্রের ঝনঝনানি বন্ধ করতে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রক্টরের নেতৃত্বে ক্যাম্পাস পুলিশ গঠন করার কথা উল্লেখ আছে। কিন্তু ইতিহাস ঘাটলে দেখা যাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল অস্থিরতার জন্য দায়ী ক্ষমতাসীন বা বিরোধী দলীয় প্রতিক্রিয়াশীল দলগুলোর লেজুড়বৃত্তিকারী ছাত্র সংগঠনগুলো। লেজুড়বৃত্তিকারী এসকল সংগঠন ক্ষমতার অপব্যবহার করে ক্যাম্পাসে অস্থিরতার সৃষ্টি করে। অন্যদিকে এসকল ছাত্রসংগঠন কর্তৃক সৃষ্ট সংঘর্ষের ক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা নীরব, এমনকি বিভিন্ন সময় সরকার দলের সংগঠনের হয়ে সংঘর্ষে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকে। তাই শিক্ষাঙ্গনে বিরাজমান অস্থিরতা দমনে ক্যাম্পাস পুলিশ গঠন করার বক্তব্য যে ভিত্তিহীন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাহলে ক্যাম্পাস পুলিশ গঠনের প্রকৃত কারণ কি? চলুন একটু তলিয়ে দেখা যাক।
পূর্বের ও সা¤প্রাতিক কালের কিছু ঘটনা খেয়াল করলে দেখা যায় যে, যখনই ছাত্র সমাজ অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করতে মাঠে নেমেছে তখনই রাষ্ট্রীয় লাঠিয়াল পুলিশ, আর্মি, র‌্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনী আন্দোলনকে দমানোর জন্য নির্মম নির্যাতন চালিয়েছে ছাত্রসমাজের উপর। সাম্রাজ্যবাদের দালাল সরকারগুলোর কাছে এটা অজানা নয় যে, শিক্ষাকে বাণিজ্যিক রূপ দিতে গেলে ছাত্রসমাজ অধিকার সচেতন হয়ে আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আর এই আন্দোলনকে দমন করার পূর্ব প্রস্তুতি হচ্ছে ক্যাম্পাস পুলিশ। সা¤প্রতিককালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত আন্দোলনে পুলিশের নির্যাতন তারই সাক্ষ্য বহন করে।
বিদ্যমান সংকটের বিপরীতে ছাত্রসংগঠনগুলোর অবস্থান:
শিক্ষা ক্ষেত্রে বিদ্যমান এরূপ সংকটময় পরিস্থিতির বিপরীতে বর্তমান ছাত্রসংগঠনগুলোর গৃহীত পদক্ষেপ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় সরকারদলীয় প্রতিক্রিয়াশীল লেজুড়বৃত্তিকারী ছাত্র সংগঠনগুলো ছাত্রসমাজের স্বার্থ বিরোধী এই পদক্ষেপ নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে না। বরং তারা ব্যস্ত নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থ করার কাজে, হল দখল, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি করার কাজে। বিভিন্ন সময় এসব সংগঠনগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে প্রশাসন তথা সরকারের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে। ছাত্র অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংগঠিত বিভিন্ন আন্দোলনে বাধা প্রদান করা ও নির্যাতন করার মাধ্যমে তার প্রশাসনের পক্ষের শক্তি হিসাবে নিজেদের উপস্থাপন করছে। অপরপক্ষে প্রগতিশীল বাম সংগঠনগুলো ছাত্র অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে। লড়াই করে যাচ্ছে শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণের সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের বিরুদ্ধে। কিন্তু এসকল আন্দোলনকে ধামাচাপা দেবার জন্য সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালালদের চক্রান্তের অংশ হিসেবে প্রগতিশীলতার লেবাস নিয়ে আত্মপ্রকাশ করছে বাম নামধারী অনেক সংগঠন। তারা ছাত্র সমাজের শ্রেণীগত সীমাবদ্ধতাকে আড়াল করে ছাত্রদেরকে সমাজতন্ত্রের প্রলোভন দেখিয়ে প্রগতিশীল ধারা থেকে বিচ্যুত করছে। এসকল বাম নামধারী অনেক সংগঠন শিক্ষার আর্থিক দায় রাষ্ট্রের নেয়া উচিত বলে বেড়াচ্ছে। অথচ শিক্ষার শুধু আর্থিক নয়, বরং সকল দায়িত্বই রাষ্ট্রের। তাই এই বক্তব্য প্রদানের মাধ্যমে তারা সরকারের দায়িত্বকে সংকুচিত করছে। এসকল বাম নামধারী সংগঠনগুলো রাজনীতি থেকে বিচ্যুত হয়ে প্রগতিশীলতাকে আশ্রয় করে সাম্রাজ্যবাদের দালাল বিভিন্ন ঘএঙ এর পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। তাই ছাত্র অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের সাথে সাথে এসকল বাম নামধারী তথাকথিত প্রগতিশীলদের বিরুদ্ধে লড়াইকে পৃথক করে দেখার কোন সুযোগ নেই।
প্রয়োজন গণ-আন্দোলন ও গণ-অভ্যূত্থান:
কোন একটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা তার রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারেনা। বাংলাদেশ একটি নয়া উপনিবেশিক-আধা সামন্ততান্ত্রিক দেশ হওয়ায় তার শিক্ষা ব্যবস্থাও রয়ে গেছে অবৈজ্ঞানিক, অগণতান্ত্রিক ও উৎপাদন বিমুখ। এই দেশে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন তারা সকলেই সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থ রক্ষা করে চলে। তাই বর্তমানে বিশ্বময় বিরাজমান অর্থনৈতিক মন্দার কারণে সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বসংস্থা, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বাংলাদেশের মত নয়া উপনিবেশিক দেশগুলোতে শিক্ষাখাতসহ সেবাখাতগুলোকে বেসরকারীকরণের চেষ্টা চালাচ্ছে। এবং এসকল অনুৎপাদনশীল খাতগুলোতে লগ্নী পুজি বিনিয়োগের পায়তারা করছে। তাই শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ রুখে দাঁড়ানোর সংগ্রাম তথা শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম আর সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রাম আজ এক সূত্রে গাঁথা। এজন্য প্রয়োজন সাম্রাজ্যবাদ ও তার দালাল শাসক-শোষক শ্রেণীর উচ্ছেদ করে জাতীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সাথে শিক্ষার সংগ্রামকে একীভূত করা। আর তাই আজ শিক্ষার সংগ্রামকে অগ্রসর করার জন্য ছাত্র সমাজের উচিত দালাল, বিভ্রান্তিকর লেজুড়বৃত্তিকারী সংগঠন বর্জন করে মূল ধারার প্রগতিশীল ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে ছাত্র অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণ-আন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থান গড়ে তোলা।
৩টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×