সাইকেল ঠিক করা, কে কে যাবে তা ঠিক করা। ৮ জুন যতই কাছে আসতে লাগলো উত্তেজনা ততই বাড়তে লাগলো। সাইকেলে ভ্রমণের আনন্দটাই আলাদা। সব ঠিকঠাক হওয়ার পর সাইকেল নিয়ে যাওয়া নিয়ে শুরু হলো ঝামেলা আমরা যে বাসে যাব সেই বাসে সাইকেল নিয়ে যাওয়া যায় না, তাই এসএ পরিবহনে সাইকেল পাঠিয়ে দিলাম। ঠিক করা হলো ১০ তারিখ ভোরে সাইকেল চালানো শুরু করব। সঙ্গী হিসেবে প্রাথমিকভাবে ঠিক হলো, পর্বতারোহী নূর মোহাম্মদ ভাই, এছাড়াও শাওন ভাই, মহিউদ্দিন ভাই, এবং আমি। আর ঢাকা থেকে আরো দুজন সাইকেল নিয়ে যাবে বলে জানিয়ে দিল। এবং কুমিল্লা থেকে সৈকত নামে একজন যাবে যাকে আমি কখনো দেখি নাই ফেইসবুকে পরিচয়।
৯ তারিখে জানতে পারলাম ঢাকা থেকে আসা ইতি এবং শুন্য সাইকেল চালাবে না, তাঁরা ঢাকায় ফিরে যাবে।
১০ তারিখ সকালে উঠে নাস্তা শেষ করে রওনা দিলাম সবাই। বিদায় জানালেন মশিউর ভাই। আমাদের সঙ্গে ৬ জন ছাড়াও সঙ্গী হলেন কক্সবাজারে স্থানীয় সামির ভাই তাঁর প্রিয় মটর সাইকেল নিয়ে আর তাঁর পেছনে উঠে বসলেন মজা করে ছবি তোলার জন্য খ্যাত ইন্দ্রনীল কিশোর। তাঁর হাতে দুটি ক্যামেরা একটি আন্ডার ওয়াটার ক্যামেরা আরেকটি বিশাল লেন্স ওয়ালা ক্যামেরা। দূর থেকে কেউ যদি মেশিনগান বলে ভুল করে তবে তাকে সেই ভুলের জন্য দোষ দেওয়াটা হবে পাপের কাজ। সবাই যাত্রা শুরু করলাম, ১/২ কিলোমটার যাওয়ার পরেই শাহরিয়ার ঘোষণা দিয়ে দিলো এই সাইকেল নিয়ে আমি ৫ কিলোমিটারও চালাতো পারবো না, ৮০ কিলোমিটার তো অনেক দূর। আমাদের অঘোষিত ইঞ্জিনিয়ার/পর্বতারোহী নূর মোহাম্মদ ভাই নিজের সাইকেল শাহরিয়ার ভাইয়ের কাছে বিসর্জন দিয়ে ইতির নষ্ট সাইকেলটা নিয়ে নিজেই চালাতে লাগলেন এবং আস্তে আস্তে পিছিয়ে পড়তে লাগলেন, তাঁর সঙ্গী হিসেবে থাকলেন মহিউদ্দিন ভাই। আর আমরা কিছুক্ষণ পর পর তাঁর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। শাওন ভাই এসে বললেন এভাবে চলতে থাকলে অনেক সময় লাগবে আসেন আমরা ইনানী গিয়ে অপেক্ষা করি। তাই আমরা সবাই ইনানীর পথে চলে আসলাম পাহাড় আর সমুদ্র দেখতে দেখতে, আর শাহরিয়ার ভাইকে সাইকেলের গিয়ার সম্পর্কে জ্ঞান দিতে দিতে। আর শাহরিয়ার ভাইয়ের ১৪তম প্রেমের কাহিনী শুনতে শুনতে অনেক তাড়াতাড়িই ইনানী পৌঁছে তাঁদের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।
ইনানী পার হয়ে একটু সামনে যাওয়ার পরেই মহিউদ্দিন ভাইয়ের দেখা পেলাম। তাঁর কাছে জানতে পারলাম নূর ভাইয়ের কাছে যে সাইকেলটি আছে সেটির অবস্থা খুবই খারাপ এবং তা চালানোর উপযোগী না। তাই তিনি সিএনজিতে করে রওনা দিয়েছেন নিকটস্থ সাইকেল মেকারের কাছে। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম টেকনাফের উদ্দেশ্যেই রওনা দেব। এর মাঝে যদি উনি ফোন করে তো তাঁকে বলে দেব সে যেন টেকনাফের উদ্দেশ্যে চলতে থাকে। আর আমরা চলতে থাকলাম আমাদের একজন সঙ্গীবিহীন। তাঁর জন্য কিছুটা মন খারাপ করেই চলতে চলতে আশে-পাশের দৃশ্য দেখতে দেখতে এগুতে লাগলাম আর আমাদের ক্যামেরাওয়ালার সামনে পোস দিতে লাগলাম ছবি তোলার জন্য। পথে দেখা পেলাম মসজিদ থেকে বের হওয়া মুসুল্লিদের তাঁদের দেখে মনে পড়লো আজকে শুক্রবার, আমরা সাইকেল চালাতে চালাতে এতই ব্যাস্ত ছিলাম, বারের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। শামলাপুর বাজারের কাছে এসে আমাদের মেশিনগান সাইজের ক্যামেরাওয়ালা ইন্দ্রনীল ভাই ঘোষণা করলেন এখানে দুপুরের খাওয়া খেতে হবে। কারণ তাঁর পেটের নাড়ি-ভুড়ি জ্বলছে তাঁর কথা শুনে আমাদের পেটের নাড়ি-ভুড়িও জ্বলতে শুর” করেছে।
দুপুরের খাওয়া শেষ করে আবার রওনা দিলাম। চলতে চলতে এক ভিন্ন এক জগতে চলে এলাম একপাশে সাগর আর আরেক পাশে বিশাল বিশাল গাছ, জায়গার নাম জাহাজভাঙ্গা। সেখানে এসে দেখলাম আমাদের আগেই এসে ইন্দ্রনীল ভাই এক ঝাক বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হাতে ক্যামেরা নিয়ে, সেখানে দাঁড়িয়ে, বসে, শুয়ে যে যেভাবে পারে ছবি তুললাম। তারপর আবার সামনের দিকে এগিয়ে চলা সন্ধ্যা ৬ টার দিকে পৌঁছালাম টেকনাফে। সেখানে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম নূর ভাইয়ের জন্য, আর ভাবতে লাগলাম কিভাবে তাঁকে পাওয়া যায়। তাঁর মোবাইলও নেই যে তাঁকে ফোন করবো। এখানে সেখানে ঘুরাঘুরি করতে করতে এক ভদ্রলোকের কাছে জানতে পারলাম আমাদের মতই একজন টেকনাফের দিকে আসছে তিনি চিনতে পেরেছেন আমাদের গায়ের টি-শার্ট দেখে, কারণ আমাদের সবার পরনে ছিল একই রঙ্গের টি-শার্ট এবং পেছনে সেইফ লেখা। আমরা সঙ্গে সঙ্গে বুঝে গেলাম সে নূর ভাই ছাড়া আর কেউ না। প্রায় ১৫ মিনিট পর নূর ভাইকে পাওয়া গেল। তাঁকে পেয়ে তো সবাই খুশি প্রায় ৭৮ কিলোমিটার সাইকেল চালানোর ক্লান্তি পুরোটাই চলে গেল। মহিউদ্দিন ভাইতো ঘোষণাই করে দিলেন তিনি দই-মিষ্টি খাওয়াবেন এবং যে যত খেতে পারে।
যদিও সেই কথা তিনি রাখেননি শুধু এক কাপ করে দই খাইয়েই সবাইকে সন্তুষ্ট রেখেছেন। নূর ভাইকে পেয়ে সবাই রওনা দিলাম শাহ-পরীর দ্বীপের দিকে আমাদের ইচ্ছা শাহপরীতেই আমরা রাত কাটাবো এবং সেখানেই আমাদের সাইকেল ভ্রমণের সমাপ্তি করবো। রাত প্রায় ৭:৩০ টার দিকে পৌঁছালাম শাহপরীর দ্বীপে। সেখানে পৌঁছে রাতে থাকার জন্য জায়গা পেলাম এলজিইডির ডাক বাংলোতে। পরদিন সকালে উঠে নাস্তা শেষ করে চলে গেলাম স্থল পথে বাংলাদেশের শেষ প্রান্ত বোদরেমোকামে, সেখানে গিয়েই শেষ হয় আমাদের ‘বিশ্ব মহাসমুদ্র দিবস’ উপলক্ষ্যে সাইকেল ভ্রমণ। এর আগেই অবশ্য আমাদের সঙ্গে মোটরসাইকেলে ঘুরতে আশা সামির ভাই আর ইন্দ্রনীল ভাই বিদায় নিয়ে চলে যান টেকনাফের দিকে। ইন্দ্রনীল ভাইয়ের ইচ্ছা আগামী দুইদিন এদিকেই ঘুরাঘুরি করবেন এবং ছবি তুলবেন। পরে অবশ্য জানতে পেরেছিলাম, তিনি শুধু ছবিই তোলেননি ছবির সঙ্গে,
‘সাগর তীরে বৃষ্টি পরে,
কার কথা যে মনে পরে,
বসে আমি একলা ঘরে
কার অপেক্ষায়......!’
এই চার লাইনের কবিতাও তুলেছেন ফেইসবুকে।
এই লেখাটি কালেরকণ্ঠ পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল।
ছবি: Click This Link
(সকল ছবির ক্রেডিট @ ইন্দ্রনীল কিশোর)
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ২:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


