মার্কেস অনুবাদেও ভীষণ আনন্দদায়ক বোধকরি এই গল্পের শক্তির কারণে। আবার ভাষা তো একই সঙ্গে অনুবাদ অযোগ্য, ভাষাভঙ্গি অনুবাদ অসম্ভব। তবু একটি বা দুইটি ভাষার অনুবাদের বেড়া ডিঙিয়েও মার্কেস উপাদেয়ই থাকে। চলচ্চিত্রে রূপান্তরিত হলেও সেই একই অনুবাদ বা রূপান্তরের নতুন এক বেড়া দাঁড়িয়ে যায়। তবু চলচ্চিত্র হয়েছে জেনে নতুনভাবে মার্কেসকে পাঠ করার সুযোগ হলো ভেবে পুনর্বার আপ্লুত হয়েছি। সাহিত্য থেকে রূপান্তরিত চলচ্চিত্র দেখতে দেখতে তুলনা চলে আসে স্বাভাবিকভাবে। কিন্তু মার্কেস এমনই এক ব্যাপার কখন চলচ্চিত্র ও অনুবাদের ভাষার দেয়াল টপকে তার গল্প আপনার জীবনে চলে এসেছে তা আপনি বুঝতেও পারবেন না। লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা সিনেমাটি দেখতে গিয়ে আমার তাই হলো। সিনেমাটি দেখতে দেখতে গোপনে বার বার আমার ব্যক্তিগত ক্রন্দনের সঙ্গে মিশে গেল ফ্লোরেন্তিনো আরিজার ক্রন্দন।
প্রেম এমন এক অসুখ রূপে ফারমিনাকে আক্রান্ত করেছিল যার তুলনা চলে শুধু কলেরা নামের ব্যাধির সঙ্গেই। টেলিগ্রাফ অফিসের কর্মচারি ফ্লোরেন্তিনো একদিন ফারমিনা দোজাকে দেখে তৎক্ষণাত তার প্রেমে পড়ে যায়। তার বেঁচে থাকার অর্থভেদ হয় তৎক্ষণাত। এক সময় ফারমিনাও তার প্রতি আকৃষ্ট হয়। তারা ঠিক করে বিয়ে করবে। কিন্তু ফারমিনার বাবা মেয়ের বিয়ে বিষয়ে নিজের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে প্রাধান্য দেন। ফ্লোরেন্তিনোর হাত থেকে ফারমিনাকে বাঁচাতে তিনি পরিবার নিয়ে স্থানন্তরিত হন। প্রেমিক প্রেমিকার যোগাযোগ থাকে। কিন্তু বছর গড়িয়ে আবার যখন তাদের দেখা হয় তখন ফারমিনা অনুধাবন করে যাদু কেটে গেছে। ফ্লোরেন্তিনো ছিল স্রেফ একটা ইলিউশন। ঘটনাক্রমে ফারমিনার সঙ্গে এক ডাক্তারের বিয়ে হয়। সংসার হয়, সন্তান হয়। আর ফ্লোরেন্তিনো রোগগ্রস্ত প্রেমিকের মতো তাড়িত হতে থাকে ৫০ বছরের অধিক সময় ধরে। একের পর এক নারীর সঙ্গে রহস্যময় সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। আবার নিজের কাছে ফিরে আসে, কেননা সেখানে ফারমিনা ছাড়া আর কেউ নেই। ফারমিনার স্বামীর মৃত্যু হলে তার কাছে যায় ফ্লোরেন্তিনো। তার দীর্ঘ অপেক্ষার কথা বলে। তাকে গ্রহণ করতে বলে। এবারও তার ভাগ্যে জোটে প্রত্যাখ্যান। একের পর এক চিঠি লিখে সে তাকে রাজি করায়। তাদের দেখা হতে থাকে, কথা হতে থাকে। শেষ পর্যন্ত ছোট একটা জাহাজে করে তারা ভ্রমণে বের হয়। ফারমিনার সঙ্গে বিছানায় ফ্লোরেন্তিনো মিথ্যা করে বলে, তার জন্য এই দীর্ঘ বচরগুলোতে সে নিজেকে কুমার রেখেছে। তার উপলদ্ধি হয়, আসলে মৃত্যু নয়, জীবনই অনন্ত, অনিঃশেষ।
মার্কেসের গল্পের পরতে পরতে থাকে কূটাভাস, কূটানুসঙ্গ। অনেক পরের অনুসঙ্গে চকিত রেফারেন্স। প্রত্যেক পৃষ্ঠায় থাকে আপ্তবোধ। মার্কেস গল্পের বহুমাত্রিক এক বলয়ে পাঠককে আটকে ফেলেন। যার বর্ণনা করা প্রায় অসম্ভব। প্রেম কী? এ প্রশ্নের উত্তর যদি কেউ জানতে চান তবে আমি বলবো একটি অসুখ, কলেরা। আর যদি কেউ প্রেম সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চান তবে তাকে বলবো লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা উপন্যাসটি পড়ুন। আর যদি সংক্ষেপে জানতে চান তবে বলবো লাভ ইন দ্য টাইম অব কলেরা চলচ্চিত্রটি দেখুন।
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই এপ্রিল, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


