একবার-দু'বার নয়। বারবার প্রমান হয়েছে। অসংখ্যবার প্রমান হয়েছে। কিন্তু আমরা অক্ষমতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করিনা। আমরা দুর্ঘটনা কবলিত বিপদগ্রস্থ মানুষদের জীবন্ত উদ্ধারে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর কথা ভাবিনা।
দুর্ঘটনা পরবর্তি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলাই যে আমরা মোটেও পারদর্শী নই, তা কেবল রানাপ্লাজায় নয়, পদ্মার বুকে পিনাকী ০৬ লঞ্চ ডুবির ঘটনায় প্রমান হয়েছে। লঞ্চডুবি, আগুণ লাগা, ভুমিকম্প বা ভবনধস, রেলদুর্ঘটনা, সড়ক দুর্ঘটনাসহ কোন বিপর্যয় বা দুর্ঘটনায় আমরা চালাতে পারিনা আশানুরুপ উদ্ধার তৎপরতা। কারণ আমাদের ফায়ার সার্ভিসকে যুগপোযোগী হিসাবে গড়ে তোলা হয়নি। অথচ দেশপ্রেম প্রকাশের নামে আমরা দেদারসে খরচ করে গেছি রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা। কেবল রাষ্ট্র নয়, বেসরকারি পর্যায়েও চলে দেশপ্রেম প্রকাশের প্রতিযোগিতা। চলে ৭১ এর চেতনাকে পুজিঁ করে এক শ্রেণীর সুবিধাবাদী রাজনীতিকদের জমজমাট ব্যবসা।
ছোট্ট একটি উদাহরণ দেই। আমরা গ্রিনিজবুক অব রেকর্ড গড়তে সর্বোচ্চ মানবপতাকা বানিয়ে ছিলাম ১৩ সালের ১৬ ডিসেম্বর। ওই বছর সর্বাধিক কন্ঠে জাতীয় সঙ্গিত পরিবেশন করে আমরা ভেঙে ছিলাম ভারতের রেকর্ড। কিন্তু পরের বছর পাকিস্থান আমাদের মানবপতাকার সর্বোচ্চ রেকর্ড ভেঙে ফেলে। প্রশ্ন হলো এই দুটি রেকর্ড গড়তে কত টাকা খরচ করেছে রাষ্ট্র? এটি নিয়ে কোন তর্ক-বিতর্কে যেতে চাইনা। তবে সহজ কথা হলো, ভারত বা চীন যদি মনে করে মানব সম্পদ ব্যবহার করে যত ধরণের রেকর্ড গড়া যায়, তত ধরণের রেকর্ড তারা প্রতিদিনই করতে পারে। এটি নিয়ে আমরা যতই লাফালাফি করিনা কেনো, ওদের ওপরে রেকর্ড গড়া সম্ভব না। তাছাড়া সর্বোচ্চ মানবপতাকা বানালে বা সর্বাধিক কন্ঠে জাতীয় সঙ্গীত গাইলে কি প্রমান হবে আমরা দেশ প্রেমিক।
কেউ কি বিশ্বের কোন রাষ্ট্রের নাম বলতে পারেন, যারা নিজের দেশকে ভালবাসেন তা বোঝাতে "গলাবাজি" করেন, নানা অানুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে তা প্রমানের চেষ্টা চালান। আমি নিশ্চিত, এ উদাহরণ কেবল বাংলাদেশে সম্ভব।
মূল প্রসঙ্গে আসি। শাহাজাহানপুরের জিহাদকে আমরা জীবিত উদ্ধার করতে পারলাম না। জনগণের ট্যাক্স ও ভ্যাটের টাকায় যাদের বেতন হয়, তারা পরিস্কার বলে দিলেন, সেখানে কোন শিশু নেই। ভাবতে অবাক লাগে একজন মন্ত্রী কিভাবে বিষয়টিকে গুজব বলে উড়িয়ে দিলেন! তাঁর নিজের সন্তান ওই পাইপের মধ্যে আটকে থাকলে তিনি কি তা গুজব বলে চালাতে পারতেন?
বাস্তবতা হলো, আমাদের কাছে এমন কোন প্রযুক্তি নেই, যেটি ব্যবহার করে আমরা ঘটনাস্থলের কেন্দ্রবিন্দুতে পৌছাতে পারি, তথ্য উপাত্ত পেতে পারি। অথবা বলা যায়, প্রযুক্তি থাকলেও ব্যবহার জানার মত দক্ষকর্মী বাহিনী নেই সরকারের। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ২৬ ডিসেম্বর রাতে শুনলাম ফায়ার ব্রিগেডের পাঠানো জুস খেয়েছে শিশুটি। অথচ সকালে জানানো হলো ঘটনাটি গুজব!
এই গুজব যখন আকাশে-বাতাসে ঘুরছে, তখন নিজেদের জ্ঞানবুদ্ধি দিয়ে তৈরি করা খাচার সাহায্যে মৃত জিহাদকে উদ্ধার করলো কয়েকজন যুবক। এটি কি রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিদের জন্য চরম লজ্বা নয়!
স্পেক্ট্রাম ভবন ধস, রানা প্লাজা ধস এবং বিভিন্ন সময়ে নৌযান দুর্ঘটনার পর উদ্ধার কাজে সীমাবদ্ধতার বিষয়গুলো ফুটে উঠেছে অসংখ্যবার। আমার মত সবাই হয়তো ঘটনার পর দু-পাঁচ দিন আলোচনা করবেন, লেখালেখি করেবেন এবং একপর্যায় আমাদের এই অক্ষমতার বিষয়টি ভুলেও যাবেন।
আসুন আমরা দেশপ্রেম প্রকাশের নামে লাখ লাখ কোটি কোটি টাকা ব্যায় না করে উদ্ধার তৎপরতার সক্ষমতা বাড়ায়। আমাদের ফায়ার ব্রিগেড বাহিনীকে দক্ষ করে তুলি। আমরা তো আমাদের দেশকে ভালবাসি। আমরা আমাদের ৭১ নিয়ে গর্ববোধ করি, যুদ্ধে নিহত-আহত সকল মুক্তিযোদ্ধাকে শ্রদ্ধা ভোরে লালন করি বুকের ভেতর। এ নিয়ে তর্ক-বিতর্ক বা সন্দেহ প্রকাশের কিছু নেই। এই দেশে বসবাসরত প্রতিটি নাগরিক রাষ্ট্রের মঙ্গল চাই। কে মুক্তিযোদ্ধা, কে রাজাকার, কে আই এস এর চর, কে ভারতের দালাল, কে কার বিয়াই, এ নিয়ে বাকবিতন্ড ছাড়ুন, দেশপ্রেমের নামে উৎসব-আনন্দের বাজেট কমিয়ে ফেলুন। ফায়ার সার্ভিসকে বিশ্বমানের করে গড়ে তুলুন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

