এই হলে থাকতে আর সব জিনিসের সঙ্গে রাখতে হয় ছাতা, লাঠি আর লণ্ঠন। হলের বিচ্ছিন্ন এক ব্লক থেকে আরেক ব্লকে যেতে বর্ষাকালে লাগে ছাতা, সাপের উপদ্রব থেকে বাঁচতে দরকার লাঠি আর জঙ্গলে ভরা হল চত্বরে রাতে পথ চলতে সঙ্গে রাখতে হয় লণ্ঠন। খুব আক্ষেপের সঙ্গে কথাগুলো বলছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিহার হলের ঢ ব্লকের ছাত্র মনসুর রহমান। শুধু মনসুর নন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন টিনশেড এই হলের আড়াইশ ছাত্রের প্রায় সবারই রয়েছে এই হল নিয়ে নানান অভিযোগ। অনেক সমস্যা আর উৎকন্ঠায় হলে রয়েছে ছাত্ররা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের 15 টি আবাসিক হলের মধ্যে সবচেয়ে জরাজীর্ন অবস্থা মতিহার হলের। টিনশেড এই হলে বর্তমানে প্রায় 254 জন ছাত্র থাকে। হলের জরাজীর্ন অবস্থার জন্য আবাসিকতা পেলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রই মতিহার হলে উঠতে চায় না। যারা থাকে তাদের অবস্থা অনেকটা অনুরোধে ঢোক গেলার মতো। কোনমতে যেন ছাত্র জীবনটা শেষ হলেই বাঁচা যায়।
হলে ঢুকতেই চোখে পড়ে 2/3 টি পুরাতন পানির ট্যাংক। পলেস্তর খসে পড়েছে। পাইপে স্থায়ী আসন গেড়ে নিয়েছে সবুজ শ্যাওলা। সেই সঙ্গে পাইপ দখলের চেষ্টা করছে জংলী লতা। কোন কোন ট্যাংক থেকে অবিরাম চুইয়ে পড়ছে পানি। ট্যাংক থেকে একটু দূরে খোলা আকাশের নিচে গোসল করছেন ইতিহাস বিভাগের ছাত্র আহসান উল্লাহ। আহসান থাকেন হলের ছ ব্লকের 5 নম্বর রুমে। বাথরুম ছেড়ে হলে কেন গোসল করছে জানতে চাইলে আহসান জানান, বাথরুমে সাপ্লাইয়ের পানি যে নোংরা তাতে গোসল করার কোন উপায় নেই। তবুও সেই পানিও নিয়মিত থাকে না। প্রায়ই সকালে টয়লেট সেরে পানির অভাবে বসে থাকতে হয় ছাত্রদের। খাবার পানিও আনতে হয় পাশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হল থেকে।
হলের আরো বিভিন্ন সমস্যার কথা জানালেন আহসান। স্থানীয় এলাকাবাসির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, তারা যদি গরুর জন্য হলের ঘাস না কেটে নিয়ে যেতো তাহলে হাটু সমান ঘাস নিয়ে হলে হাটতে হতো ছাত্রদের। অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধুমাত্র মতিহার হলেই ঘাস কাটার জন্য আলাদা কর্মচারী আছে।
আরো অনেক সমস্যার সঙ্গে বিভিন্ন প্রাণীর উপদ্রবের কথা জানালেন হলের ছাত্ররা। জ ব্লকের ছাত্র আশরাফ বললেন, 10/15 দিন পরপরই বিষাক্ত গোখরো সাপ মারতে হয় আমাদের। অনেক রুমেই বাচ্চা দেয় বিড়াল। সেগুলোও পরিস্কার করতে হয়। তাছাড়া প্রায়ই পড়ার টেবিল, বিছানা নোংড়া করে রাখে বিড়াল।
ঢ ব্লকের ছাত্র মনসুর রহমান। রুমের সামনে বারান্দায় দুটো ইট জড়ো করে তার উপর আয়না রেখে শেভ করছিলেন। সমস্যার কথা জানতে চাইতেই বললেন, সমস্যা যে কয়টার কথা বলবো। গরমে ঘামি আর বৃষ্টিতে ভিজি। ঝড় হলে আতঙ্কে থাকি কখন যেন টিনের চালে ভেঙ্গে পড়ে গাছের ডাল।' মনসুরের সঙ্গে কথা বলতে নাকে আসছিল দুর্গন্ধ। উৎস খুঁজতেই তিনি দেখিয়ে দিলেন রিংস্লাবে বানানো ডাস্টবিন। নিয়মিত পরিস্কার না করার জন্য উৎকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে সেখান থেকে। মনসুরের রুমে ঢুকে দেখা গেলো খসে পড়েছে দেয়ালের প্লাস্টার। মেঝের প্লাস্টার উঠে গিয়ে বেরিয়ে পড়েছে মাটি। রুমের ভেতর উড়ছিল বেশকিছু ভীমরুল। এদের কামড়ে যে কোন সময় মারাত্মক আহত হতে পারে ছাত্ররা।
মতিহার হলের টিভি রুম ও পেপার রুম নিয়ে ছাত্রদের অভিযোগ রয়েছে দীর্ঘদিন ধরেই। চ ব্লকের ছাত্র চন্দন অভিযোগ করে বললেন, হলে ছোট্ট একটা টিভি। সেটিও কখনো নষ্ট হলে সহজে ঠিক করা হয় না। পেপার রুম খোলা হয় দেরিতে। বেলা 11 টার আগে পেপারই পড়তে পারে না ছাত্ররা। আবার রাত 10 টা বাজতেই বন্ধ করে দেয়া হয় পেপার রুম। হলের বাথরুমগুলোর দুরাবস্থার কথাও জানালেন চন্দন। বাথরুমগুলোর একটির দরজাও ঠিক নেই। প্রায় সবগুলোই ভাঙ্গাচোরা। বেশির ভাগ বাথরুমে তো দরজাই নেই।
হলের কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে ছাত্রদের। তারা নিয়মিত হল পরিস্কার করে না এবং ছাত্রদের সঙ্গে ঔদ্ধত্যপূর্ন আচরন করে বলে ছাত্ররা জানান। এতো সমস্যা থাকার পরও হলের ছাত্ররা মনে করেন, কর্তৃপ একটু নজর দিলেই বেশ নিশ্চিন্তে থাকা যেতো হলে।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৬ সকাল ৭:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


