[রং=#660033] [সাইজ=5]প্রিয় আইল্যান্ড, বলছি তোমার কথা আজ... [/সাইজ] [/রং]
হয়তো কেউ কেউ কবিতা ভেবে লেখাটির শিরোণামে ক্লিক করবেন। কিন্তু না, আজ আর কবিতা নয়, আসুন আজ একটু অন্যদিকে চোখ ফেরাই। আজ থেকে শুরু করছি [গাঢ়] 'ফিরে দেখি শহর তোমাকে'[/গাঢ়] শিরোণামে আমার একটি সিরিজ কলাম, যেখানে নগরীর নানা সমস্যার দিকে আমি মাঝে মাঝে একটু 'অন্যচোখে' আলোকপাত করার চেষ্টা করবো (সবার সহযোগিতা পাবো তো?)।
হ্যাঁ, বলছিলাম আজ আর কবিতা নয়। 'প্রিয়া'র আনন্দ সুখ নিয়ে অনেক কবিতা হয়েছে, আজ একটু প্রিয় শহরের কথা বলি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে প্রিয়ার অবয়ব 'কল্পনা'য় যতোটা সুন্দর হয়ে ওঠে , প্রিয় শহরের রূপ ততোটাই অসুন্দর আর কদর্য হয়ে ধরা পড়ে নির্মম নির্জলা কঠিন 'বাস্তবতা'য়। অবহেলা, অনিয়ম আর স্বার্থের টানা-পোড়েনে এ শহর আসলে প্রতিনিয়ত সরে যায় আমাদের শুদ্ধ অনুভব থেকে বহু দূরে। আর সেই অশুদ্ধ অনুভবের আস্থাহীণ অপূর্ণ বাতাসে 'বেদনার নিরব নিঃশ্বাস' গোপন করে একা একা সব কষ্ট নিঃশব্দে মাথায় তুলে নেয় নগরীর বিষন্ন নাগরিক। সহজে বলতে চায় না সে নিয়মের বাইরে কোন কিছু ,তবু অপূর্ণ প্রাপ্তির হত-বিহ্বল উপলব্ধির তীব্রতা একদিন তাকে বলাতে শুরু করে। প্রেমের কবিতা সব শিকেয় তুলে রেখে হয়তো সে একদিন লিখতে বসে পড়ে- 'ফিরে দেখি শহর তোমাকে'.......।
কঠোর বাস্তবতার তপ্ত-রোদে পুড়ে পুড়ে এ শহর আজ খুব নির্মম-কালচে-কঠিন হয়ে পড়েছে। শহরকে ভালবেসে মুগ্ধ হতে চাই, কিন্তু শহর আমাকে বলে- "দেখো, কী ভীষণ জমানো ক্ষত ! দেখো, কতো শত বছরের জমানো ক্ষত আজ আমার সর্বাঙ্গ জুড়ে, এই আমাকেই ভালবেসে টানতে চাও কাছে ?...এই আমাকেই টানতে চাও তোমাদের প্রীতির ছোঁয়ায়, তোমাদের সুন্দর এক নগরী দেখার বহুকাল লালিত স্বপের সমৃদ্ধ চূড়ায় ?" আমি বলি -তোমার সীমানা থেকে ঠেলে আমি সব অসুন্দর সরাবো, তুমি সুযোগ দাও হে ঐতিহ্য নগরী, আমি তোমার আনন্দ শরীর থেকে শব্দের শক্তিতে সরাতে চেষ্টা করবো নিরানন্দময় সব নিন্দ্যনীয় অনিয়ম। সুযোগ দাও হে নগরী....। একবার দেখতে দাও ফিরে, পুনশ্চ তোমায় !
কথা কি আবার কবিতা হয়ে যাচ্ছে? নাহ্ , কিছুতেই আজ আর কবিতা লিখবোনা।। অঙ্গীকার নিয়ে বসেছি আজ 'শহরের সুকঠিন গদ্য' লিখবো। আজ নগরীর 'নির্জনতা' না দেখে 'নির্লজ্জ সব অনিয়ম'গুলো দেখবো। আজ শহরের 'কৃষ্ণচূড়া'র আড়ালের 'কৃষ্ণপক্ষ'কে টেনে আনবো বিক্ষুব্ধ শব্দের সুতীব্র আলোয়। আজ কিছুতেই কবিতা লিখবোনা। আজ আমি শহর নিয়ে জমানো সব ক্ষোভ- শহরের অলিতে গলিতে ছড়িয়ে দেবো -সুতীব্র ঘৃণায়। আজ আমি লিখে ফেলবো সেই 'জমে জমে পাথর হয়ে যাওয়া' নগরীর নীরব অভিব্যক্তির অন্তরালের সব অযুত নীল-কষ্ট! বৃষ্টির স্বচ্ছ ফোঁটা, আকাশের শুদ্ধ আলোক আর নগরীর সুসচেতন নাগরিকেরা-- একটু 'সমর্থন' শুধু আজ, আমাকে দাও!
কি সমস্যা নিয়ে লিখবো প্রথম দিনে? কতো সমস্যাতেই না জর্জরিত হয়ে আছে এ শহর! কি নিয়ে লিখবো 'ফিরে দেখি শহর তোমাকে'-র প্রথম কিস্তি? আচ্ছা আজ না হয় আমার একেবারে শৈশব থেকে দেখে আসা নগরীর একটি সমস্যার কথাই তুলে ধরি। সমস্যাটি হয়তো অনেকেই উপলব্ধি করেছেন, কিন্তু ঠিক সেভাবে কেন জানি এটা নিয়ে এ যাবৎ তেমন আলোচনা হয়নি। এ সমস্যাটির পেছনের কারণগুলোও হয়তো অনেকের জানা, তবুও বহুকাল ধরে এ সমস্যাটি আমাকে ভাবিত করেছে বলেই সমাধান আছে কি নেই সেই জটিলতায় না গিয়ে শুধু সমস্যাটির উপরেই আলোকপাত করি।
সমস্যাটিকে চিহ্নিত করা যায় নগরীর উপর চাপিয়ে দেওয়া 'অহেতুক' অপচয়ের একটি 'অপ্রয়োজনীয় বোঝা' হিসেবে। চিহ্নিত করা যায়- চিরন্তন চাঁদের জ্যোৎস্নার আলোর নীচে লুকানো কলঙ্কের কালো আঁধার হিসেবে। বলা যেতে পারে - একেবারেই অপ্রত্যাশিত অপচয়ের পুনরাবৃত্তি দেখার বিস্ময়কর এক অভিজ্ঞতা এটি। বারবার নীরব নিশ্চুপ দৃষ্টিতে এ 'অভিজ্ঞতা'কে আমরা অবাক হয়ে 'অবলোকন' করি। কেউ প্রশ্ন তুলি না তেমন। তবে ভাবি, কেউ কেউ নিশ্চয়ই খুব ভাবি- এ নিরবে বয়ে চলা 'নিরবধী অনিয়ম' নিয়ে! এ 'অনিয়ম' আবার দৃশ্যতঃ লুকানো থাকে 'লোক দেখানো সব চমৎকার কাজ আর উন্নয়নে'র ঝলকানো আলোর ঝিকিমিকি চোখ-ধাঁধানো বিভ্রান্তির মাঝে...। বারবার চরম অস্বস্তির সঙ্গে এ 'অনাকাংখিত' তথাকথিত উন্নয়নকে আমরা কষ্টকরভাবে 'স্বাগত' জানাই ....।
না, আর কোন অষ্পষ্টতা নয়, সুস্পষ্ট করেই বলি, আজ আমি লিখবো - শহরের প্রধান প্রধান সড়কের মাঝখানের আইল্যান্ডগুলোর 'কারণে-অকারণে' তৈরী অথবা মেরামত জনিত 'ইচ্ছাকৃত' অপচয়ের কথা। যেহেতু চিরকাল জেনে এসেছি, অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই, তাই আজ এ লেখা লিখছি সাধারণ নাগরিক দায়িত্ববোধ থেকেই। যেভাবে এই আইল্যান্ডগুলোর 'চেহারা-সুরত' ও 'মধ্যখানের বেড়াখানি' ক'দিন পরে পরেই কারণে অকারণে বদলে যায়, যেভাবে এর ভিত্তি অংশটিকে একবার তৈরী করা হয় 'চওড়া/প্রশস্ত' করে, তারপর কিছুদিন যেতে না যেতেই আবার 'সরু/চিকন' করা হয়, তারপর আবার 'চওড়া/প্রশস্ত' , তারপর আবার সরু-সংকীর্ণ, তারপর আবার হঠাৎ মিডিয়াম সাইজের...তাতে করে এই খাতের 'অকারণ অপচয়' এর বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন না হয়ে পারা যায়না। অবস্থা এমন যে, কখনো কখনো দেখা যায়, পরিবর্তনের কয়েকটি ধাপ পেরিয়ে- পুরনো সব ভেঙ্গে-চূড়ে নতুন করে....অবশেষে সেই পুরনো সাজেই......অর্থাৎ 'পুরাতন অবয়বে'ই ফিরে যায় চরম পরিবর্তিত সেই আধুনিক 'অবাক আইল্যান্ড' (!) । আর এতো পরিবর্তন আর খরচের মধ্য দিয়ে পুনরায় সেই পুরনো ধাঁচেই ফিরে যাওয়া দেখে খুব অবাক হয়ে যাই আমরা। ভীষন তিক্ততায় তিল তিল করে ভেঙ্গে পড়ে তিলোত্তমা শহর দেখার আমাদের সব অতিষ্ট স্বপ্ন!
হ্যাঁ .... এভাবেই..... যেভাবে এই শহরের আইল্যান্ডগুলো ক'দিন পরে পরেই তাদের নিত্য নতুন আঙ্গিক, উচ্চতা আর 'মধ্যখানের ব্যারিয়ার' এর বিভিন্ন সব উপাদান (কখনো লোহার গ্রীল, কখনো ছোট ছোট গাছের ব্যারিয়ার, কখনো ষ্টীলের রেলিং, কখনোবা শুধু মূলি বাঁশের কঞ্চি) দেখিয়ে দেখিয়ে আমাদের 'বিস্মিত অবাক' করে দেয়- সেই 'অসংখ্য পরিবর্তন' দেখা বিস্ময়ে অবাক অথবা হতবাক হয়ে যাওয়া (নাকি স্তব্ধ হয়ে যাওয়া?) আমার একান্ত অনুভূতিগুলিই আজ 'শেয়ার' করতে চাচ্ছি আপনাদের সঙ্গে।.... আপনারা প্রস্তুত আছেন তো, আপনার এলাকায় আপনার দেখা রাস্তার আইল্যান্ডটি গত 25/30 বৎসরে কতবার 'অকারণে'ই উন্নয়নের নামে পরিবর্তন করা হয়েছে, সেই বিশাল বিরাট অপচয়ের রেকর্ড তথা 'নিজ চক্ষে' দেখা 'অনাকাংখিত পরিবর্তনের' অপ্রত্যাশিত 'অসুখকর স্মৃতি'টুকু সঙ্গে নিয়ে, আমার সাথে কিছুক্ষণ?
অবশ্য আইল্যান্ডের এই এতো দ্রুত ও অপ্রয়োজনীয় পরিবর্তনের বিষয়টিকে অনেকেই ঠিক 'সমস্যা' বলতে রাজী নন, তাঁরা এটিকে চিহ্নিত করতে চান একটি 'নিরবচ্ছিন্ন উন্নয়ন' বা 'তিলোত্তমা ঢাকা নগরী তৈরীর অন্তহীণ প্রচেষ্টা' হিসাবে। কিন্তু আমার 'দেখে দেখে ক্লান্ত হয়ে যাওয়া চোখ' আজ আর তা মানতে রাজী নয়। আমাকে এখনো যদি কেউ বলে যে, স্বাধীনতার পর গত 34/35 বৎসরে এ শহরের কোন বিষয়টিকে আপনি 'সবচেয়ে বেশী বার' সবচেয়ে বেশী 'অকারণে' পরিবর্তিত হতে দেখেছেন, তবে আমি অবশ্যই নগরীর আইল্যান্ডগুলোর কথাই বলবো। কেন জানিনা কখনো কখনো আমার শৈশবের স্মৃতিগুলো সব জড়ো হয়ে শুধু 'বিচিত্র আঙ্গিক/অবয়বের আইল্যান্ড দেখার স্মৃতি'তে পরিণত হয়ে যায়।
শুধু সাইন্স ল্যাবরেটরীর মোড় থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত রাস্তাটিতে সংযোজিত আইল্যান্ডটি স্বাধীনতার পরের 35 বৎসরে যে কতোবার কতো আঙ্গিকে কতো আকারে কতো বিচিত্র ধরণের ব্যারিয়ারে সমৃদ্ধ হয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে, আমার নিজের দেখা স্মৃতি থেকে সারাদিন হাতড়ে হাতড়ে খুঁজলেও আমি তার সঠিক সংখ্যাটির তল খুঁজে পাইনা। এককথায় তাই শুধু বলবো- 'অসংখ্য'- অসংখ্যবার পরিবর্তিত হয়েছে সাইন্স ল্যাবরেটরীর মোড় থেকে নিউমার্কেট পর্যন্ত রাস্তাটিতে সংযোজিত আইল্যান্ডটি গত 35 বৎসরে। এবং আমার দেখা যদি ভুল না হয়ে থাকে, সেই পরিবর্তনের শতকরা পঁচাত্তর ভাগই ছিল একেবারেই 'অপ্রয়োজনে অহেতুক পয়সার অপচয়' মাত্র, ছিল ফালতু কোন কারণ দর্শিয়ে নতুন বানানো আইল্যান্ড ভেঙ্গে আবার আইল্যান্ড বানানোর মতই বিস্ময়কর সব 'অবাক দৃশ্য' সম্বলিত 'রহস্য আধাঁর ঘেরা' উল্টো-পাল্টা সব খেলা। যে খেলা দেখতে দেখতে আজ ভীষণ ক্লান্ত এ নগরী, ক্লান্ত ঢাকার আকাশ আর ক্লান্ত নিউমার্কেটের দুপাশের ফুটপাত দিয়ে নীরব স্বাক্ষীর মতো হেটে যাওয়া পরম ত্যক্ত-বিরক্ত- সাদা-সিধা সরল কিছু দেশপ্রেমিক মানুষ...।
অবশ্য এর পরেও আমরা কেউ কেউ এ ধরণের অপচয়মূলক কাজের যৌক্তিকতা খুঁজে খুঁজে নিজেদের নানাভাবে শান্ত করি। ভালো লাগুক আর না লাগুক, আমরা 'আত্মপ্রসাদ' খুঁজি এই ভেবে যে, তবুতো নগরীর থমকে পড়া সৌন্দর্য্যের কিছু অংশের 'অনন্য বিকাশ' ঘটছে। আমরা 'উৎফুল্ল' হয়ে যাই এই ভেবে যে, তবুতো ধাবিত হচ্ছি আমরা 'অসংখ্য পরিবর্তন' আর 'পরিমার্জনে'র কঠিন সব স্তর পেরিয়ে চোখ-ধাঁধানো সৌন্দর্য্যের দিকেই। বিরাট অংকের পয়সা এতে খরচ হচ্ছে তা সত্যি, কিন্তু নগরীর 'আইল্যান্ড'-এর মতো একটি মহা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের 'লক্ষবারের লক্ষ্যবিহীণ' উন্নয়ন ও 'সহস্রবারের সাফল্যহীণ' গবেষণার (!) জন্য বারবার এতো জরুরী 'ব্যাপক খরচ'-এর দরকার পড়লে কি আর করা যাবে? খরচ তো করতে হবেই! খরচ না হলে কিছু লোকের আবার 'খরচ-এর সংস্থান' হয় না। তাই অন্ততঃ এই খাতে টুয়েন্টি ফোর আওয়ার সবসময়ই খরচ 'চালু ও সক্রিয়' থাকবে। অন্ততঃ এই একটি ক্ষেত্রে ভুলে থাকতে হবে আমরা তৃতীয় বিশ্বের খুব দরিদ্র একটি দেশ। অন্ততঃ এই একটি ক্ষেত্রে যেন ভুলে থাকতে হবে- বারবার আইল্যান্ডের স্ল্যাব এর ডিজাইন পাল্টিয়ে 'রাস্তাটা কেমন দেখাচ্ছে' সে গবেষণা চালানোর মত 'বিলাসিতা' অন্ততঃ আমাদের সাজে না।
জানি, বিপরীত কথাও কেউ কেউ বলবেন। হয়তো কেউ কেউ বলবেন আইল্যান্ডের 'সৌন্দর্য্যের বৈচিত্রময়তা' আর নানান আঙ্গিকের 'ক্রিয়েটিভ অ্যাপিয়ারেন্স' বা 'ভ্যারিয়েশন' সৃষ্টির জন্য কিছু পয়সা তো খরচ হবেই। সারাদেশেই তো এরকম কতো খাতে কতো পয়সা খরচ হচ্ছে! হ্যাঁ, সত্যিই তাই। আমিও স্বীকার করি সে কথা। জনগণের দেওয়া করের অংশ থেকে যখন খুব 'স্বতস্ফূর্ত আনন্দে'র সাথেই খরচ করা সম্ভব হচ্ছে সেই পয়সা, তখন আর 'সমস্যা' কিসের? কার কী আর এমন 'আসবে যাবে' এই অলিখিত উৎস থেকে উপচানো অপচয়ের নিশানাহীণ খরচে ? হ্যাঁ, খরচের এই নিশ্চুপ নিশ্চিন্ত অবাধ প্রবাহ অব্যাহত আছে বলেই সকল সময়ে কারণে, অকারণে , প্রয়োজনে- অপ্রয়োজনে- অন্ততঃ এই খাতটির কর্মকান্ড থাকবে সদা-জীবন্ত, সদা-তৎপর, সদা-সজীব। বলা যায়- This attempt must be always
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



