
প্রতিবারের মতোই হই হই করে আবারো একটা নারী দিবস চলে গেলো ।এই নিয়ে সামুতেও বেশ ভালো ভালো লেখা দেখলাম । মনেহল প্রতিক্রিয়া মিশ্র ।আদৌ কি নারী দিবসের কোনো প্রয়োজনীয়তা আছে ? যা এমনিতেই প্রাপ্য ছিলো , তা যদি জোড় করে ছিনিয়ে নিতে হয় , তখন তো মনে হয় এর প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই আছে । তবে , শাড়ি বা গয়নার দোকানে বিশেষ ছাড় নিয়ে অথবা ঠান্ডা ঘরে বসে বিধিবদ্ধ আইন নিয়ে গতানুগতিক আলোচনা করে নয় । ভাবনার সময় হয়েছে , সহনাভূতি ও সহমর্মীতার সাথে সমাজকে বোঝার ।
নারীদের বিরোধ কোনো পুরুষের বিরুদ্ধে নয় । পুরুষতান্ত্রিতারক বিরুদ্ধে । এই পুরুষতান্ত্রিতারকতার জগতে অবিশ্বাস - ধস্ত নারী , পুরুষের প্রতিপক্ষে একা নারী , তার মন সেখানে অস্বীকৃত - উপেক্ষিত । শুধুই আছে তার শরীরটুকু , আর তাকে ঘিরে আদিমতার উল্লাস । ভোগের সেই উৎসবে সামিল শত , সহস্র জন । এখানেই শেষ নয় । এরপরেও কিছু মহিলা আছেন , যারা ধর্ষিতার পেশা , জীবনযাত্রা বা বিবাহজনিত সুলুকসন্ধান করেন এবং শেষ পর্যন্ত সেই নারীটিকেই দোষী সাবস্ত্য করেন । এরাও কিন্তু ঐ পুরুষতান্ত্রেরই মুখ । কথাটা বোধহয় তাঁরা বোঝেন না ।
আবার কেউ কেউ আছেন যারা , কি করলে এমন ঘটনা ঘটবে না সে বিষয়ে সুচিন্তিত মতবাদ দেন । তাদের কথা শুনে ও চারপাশের পরিবেশ দেখে কিছু কথা মাথায় আসে । যেমন ধরুন -------
রাতে বেরোনো যাবে না । বেরোলে নিশাচরের হাত থেকে বাঁচাবার গ্যারান্টি কেউ দেবে না ।
দিনের বেলা বেরোনো যাবে না । বেরোলে রাস্তার ছেলেরা ইভটিজিং করবে ।
পাবলিক ট্রান্সপোর্টে ওঠা যাবে না । প্যাসেঞ্জার শ্লীলতাহানী করতে পারে ।
প্রাইভেট কার বা ট্যাক্সীতেও ওঠা যাবে না । সেখানেও তো পুরুষ ড্রাইভার ।
কখনোই দেরী করে বাড়ী ফেরা যাবে না । কিছু ঘটলে দর্শক-পাবলিকর বিনোদনের বিষয়বস্তু হয়ে যেতে হবে ।
আবার সবার আগে বাড়ী ফেরাও যাবে না । তাহলে , দারোয়ান , লিফটম্যান ,প্রতিবেশী যদি কিছু করে তবে সেই দায় কেউ নেবে না ।
জিন্স বা স্কার্ট পরলে গায়ে অপসংস্কৃতির ধারক , বাহকের ট্যাগ লেগে যাবে । আর কিছু নেহাতই দূর্বল , অসহায় পুরুষকে উত্তেজিত করার অপরাধের শাস্তি পেতে হবে ।
কিন্তু শাড়ি পরলেও তো কিছু অংশ তো নগ্ন থেকেই যায় । তখন আবার কেউ বলবে না তো যে , শাড়ী পরে সিডিউস করছে ।
বালিকা হলে বিপদের সম্ভাবনা বেশী । কারন কচি মাংসে লোভ বেশী ।
বয়স্কা হলেও নিস্তার নেই । কারন কেউ , কেউ আছে সর্বভূক । কোনো কিছুতেই অরুচি নেই ।
বিয়ে করলে একজনের সম্পত্তি হয়ে যেতে হবে ।
আর বিয়ে না করলে , যে কোনো কারোর । বারোয়ারি । সহজলোভ্যা ।
পড়াশুনা করা যাবে না । কোথাও যদি পুরুষ টিচার হয় ?
অফিসে যাওয়া যাবে না । যদি পুরুষ বস হয় ?
আর তো ভাবে পাচ্ছি না । আচ্ছা কেউ কি বলতে পারেন , আর কি কি করা যাবে না ? বা ঠিক কি করা যাবে ?
কিন্তু এই সমাজ কি পুরুষদেরও রেহাই দেয় ? তাদের ছোটো থেকে গড়েই তোলা হয় অতিমানব হিসাবে । যেমন - তারা ব্যথা লাগলে বা কষ্ট হলে কাঁদতে পারবে না । তাহলে শুনতে হবে মেয়েদের মতো কাঁদছিস কেনো ? দশজনের কাছে মার খেয়ে বাড়ী ফিরলে শুনতে হবে - কেমন ছেলে তু্ই ? হাতে কি চুড়ি পরা ছিলো ?
এহেন ছেলে যদি কোনোভাবে তথাকথিত পুরুষ ( কখনো নারীও হতে পারে ) দ্বারা নিগৃহীত হয় , তবে আইনি সাহায্য নেওয়া তো দূরের কথা সে কাহিনী বাতাসও টের পায় না । কারন তাহলে তো তার পুরুষকারে প্রশ্নচিহ্ন লেগে যেতে পারে ! এখানে দেখা যা্য় ঐসব ছেলেদের যন্ত্রণা অনেক বেশী । পুরুষতন্ত্র এদের কি শান্তনা দেবে ?
এবারে বলি প্রগতিশীল পুরুষদের কথা । এঁরা স্মিত হাস্যে মেয়েদের মেয়েলিপনা সহ্য করেন । যেমন ধরুন টিভিতে সিরিয়াল বা মনোরঞ্জকমূলক অনুষ্ঠান কেবলমাত্র হাস্যস্পদ প্রাণীরাই দেখে অর্থাৎ কিনা মেয়েরা । তাদের সাংস্কৃতিক রুচিবোধ নেই । তাই বাড়ীতে
কোনো মহিলা যদি একমনে টিভিতে কিছু দেখেন , ঠিক তখন ঐ বাড়ীর পুরুষ চ্যানেল চেঞ্জ করে দিতেই পারেন । কারন ঐসব মাথামুন্ডু অনুষ্ঠান দেখা আর না দেখা সমান । এই নির্বোধ অনুষ্ঠানগুলির স্ক্রিপ্ট রাইটারদের দু , একটা উদাহরণ দেই এবার ।
হিমাংশু শর্মা - ইনি একতা কাপূরের অনেক সিরিয়ালের লিড রাইটার ছিলেন । ইনিই কিন্তু ' তনু ওডেস মনু ' , ' তনু ওডেস মনু রিটার্নস ' , রানঝনা প্রভৃতি অনেক সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখেছেন ।
বরুন গ্রোভার --ইনিও অনেক জনপ্রিয় টিভি অনুষ্ঠানের স্ক্রিপ্ট লিখেছেন এবং এখনও লেখেন । উনি একটা সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন ' কাহানী ম্যঁয় দিল সে লিখতা হু অর লিরিক দিমাগ সে ।' ওঁর লেখা ' মোহ মোহ কে ধাগে / তেরি উংগলিয়ঁ সে জা উলঝে ... ' গানটি শুনে মনে হয় , এরকম গানের শব্দ মাথা দিয়ে বেরোলে , হৃদয় দিয়ে কি হবে ? আবার ওঁর লেখা ' মাসান ' ছবিটি দেখলে মনে হবে এই কাহিনী শুধু হৃদয় দিয়েই লেখা যা্য় ।
টিভি দেখা বিষয়ে আরেকটি উল্ল্যেখযোগ্য কথা বলি । এটা তো মানবেন যে , এই অনুষ্ঠানগুলিতে অনেক অভিনেতা অভিনেত্রী থেকে শুরু করে টেকনিসিয়ানরা করেন । তাই পরোক্ষে মহিলারা অনেক মানুষের রুজি রোজগারে সাহায্য করছেন ।
সমঝদার এইসব পুরুষরা যারা ক্রিকেট খেলা দেখাটাকে অনেক যুক্তিযু্ক্ত মনে করেন , তারা কেনো ক্রিকেট দেখেন ? নিশ্চয়ই বিনোদনের জন্য । টিভি অনুষ্ঠানগুলিও মহিলারা শুধুমাত্র বিনোদনের জন্যই দেখেন ।
আর , মহিলারাও ক্রিকেট খেলা দেখেন । তবে তারা অন্যকে বিনিদিত করতে পারেন না । এদিকে পুূরুষরা সত্যিই এগিয়ে । কারন তারা খেলার আগে , পরে সোস্যালমিডিয়াতে , ব্লগে যে ধরনের বাকযুদ্ধ করেন সেগুলো পড়লে বিনোদিত হওয়া যা্য় । অথবা খেলা দেখতে দেখতে , যারা কোনোদিন পাড়া ক্রিকেট খেলেননি , তাদেরও বলতে শোনা যায় ---- ' ইশসস এই বলটায় সুইপ করা উচিত ছিল ' , ' আরে ওটা হুক করতে পারলি না ' ,' ফিল্ডিং সাজিয়েছে দেখো ! ' ' এই ক্যাচটা মিস করলি ! ' , , ' এদের কেনো সিলেক্ট করে !
সত্যি সিলেক্টটররা । তাঁরা যে ওনাকে চিনতেন না ।
এবারে মেয়েদের আরো কয়েকটি গুন থুড়ি বদগুণের কথা বলি --
মেয়েরা খুব হিংসুটে - একটা মেয়ে অন্য মেয়ের প্রশংসা শুনতে পারে না সে হিংসুটে বলে । একটা ছেলে যদি তার সহপাঠীকে বেশী নম্বর পেতে দেখে বা অফিস কলিগকে তার আগে প্রোমোশন পেতে দেখে , তাহলে ছেলেটির মনটা একটু খারাপ হয় মাত্র । এটাকে হিংসা বলা যায় না ।
মেয়েদের সন্দেহ বাতিক আছে --একটি ছেলে যদি তার গার্ল ফ্রেন্ড বা স্ত্রীর বন্ধুর সাথে একটু বেশী কথা বলে , তবে তার গার্ল ফ্রেন্ড বা স্ত্রী রেগে যায় তার সন্দেহ বাতিক আছে বলে । একই ভাবে গার্ল ফ্রেন্ড বা স্ত্রী যদি ছেলেটির বন্ধুর সাথে একটু বেশী কথা বলে তবে ছেলেটিও রেগে যায় । কিন্তু সেটা সন্দেহ বাতিকের জন্য নয় । মেয়েটি দুশ্চরিত্র বলে ।
মেয়েরা খুব লোভী -- প্রেমিকা , প্রেমিককে ছেড়ে ধনীপাত্রকে বিয়ে করে সে খুব লোভী বলে । প্রেমিক এক মুহূর্তে প্রেমিকাকে দূরে সরিয়ে বাড়ীর পছন্দ করা পাত্রীকে বিয়ে করে , সে খুব কর্তব্যপরায়ণ বলে ।
মেয়েরা সখ করে পন্ডশ্রম করে -- যে পুরুষ তাকে কোনোদিনও একগ্লাস জল পর্যন্ত খেতে দেয়নি , তার জন্যই কোনো মেয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা পরিশ্রম করে নতুন কিছু রান্নার চেষ্টা করে । আর পুরুষটি তা দেখেই বুঝে যায় যে সেটি একটি অখাদ্য । তাই বিনিময়ে বিদ্রুপ ছাড়া আর কিছু দিতে পারে না । তো কি হোলো ? মেয়েরা তো সখ করে পন্ডশ্রম করে ।
মেয়েরা মেয়েদের শত্রু --কিছু মেয়েরা তাদের ঘরে বা অফিসে মহিলা কর্মীদের সাথে খারাপ এমনকি অমানবিক ব্যবহার করে , মেয়েরা মেয়েদের শত্রু বলে । কিছু ছেলে যখন তাদের সহপাঠীকে র্যাগিং করে বা অফিসে পুরুষ কর্মীদের সাথে খারাপ এমনকি অমানবিক ব্যবহার তখন সেটা ছেলেরা ছেলেদের শত্রু বলে নয় । ঐ কিছু পুরুষই শুধু খারাপ তাই ।
এবারে আমার কয়েকজন প্রিয় লেখিকার কথা বলছি যাঁরা শুধু মেয়েদের মতো করে একপেশে দৃষ্টি দিয়ে নয় , এই সমাজের বাস্তব চিত্র ফুটিয়ে তুলেছিলেন তাঁদের লেখনীতে দিয়ে । তাঁদের সেই সম্ভার থেকে কয়েকটি উদাহরন এখানে দিচ্ছি ।
আশাপূর্ণা দেবী -
স্বয়ং রবিঠকুর তাঁকে বলেছিলেন — ‘আশাপূর্ণা তুমি সম্পূর্ণা’! তাঁর কলম চিরদিনের সত্যকে অদ্ভুতভাবে মিথ্যে প্রমান করতে পারে ।যেমন ধরুন ' মা ' মাত্রই তাঁকে অনেকে মানবী না ভেবে দেবী ভাবতে ভালোবাসে । কিন্তু তাঁর ‘ছিন্নমস্তা’ গল্পটি পড়লে গায়ে কাঁটা দেয় ।যেখানে নতুন যুবতী বউয়ের ছেলেকে ক্রমশ দখল করে নেওয়ার আক্রোশে একমাত্র সন্তানের মৃত্যুকামনা করে বসে বিধবা মা জয়াবতী। সেটিই ফলে গেলে কী ভয়ঙ্কর চাপা উল্লাসে আর নিষ্ঠুরতায় ‘পাখা হাতে করিয়া কল্পিত মাছি তাড়াইতে তাড়াইতে বলেন— খেতে পারছি না বললে চলবে কেন মা?... ভালো জিনিস খাওয়ার বরাত তো ঘুচিয়েছেন ভগবান, পোড়া বিধবার গুচ্ছির শাক-পাতা-ডাল-চচ্চড়ি না খেয়ে উপায় কি?’ এটাই বাস্তবতা । শাশুড়িরা ছেলের বৌদের নির্যাতন করার আগে মনে রাখেন না যে বৌ খারাপ থাকলে , ছেলেও খুব একটা সুখে থাকবে না ।
ইসমত চুঘতাই

উনিশশো তিরিশ-চল্লিশের দশক থেকে ফেনিল আবেগসর্বস্বতা ঝেড়ে ঘোর বাস্তব নিয়ে লেখার সূচনা হয় উর্দুতে। সে সময়েরই অগ্রগণ্যা চুঘতাই অথবা আর একটু জটিল, যিনি এলোমেলো করে দেন সদ্য তৈরি হওয়া নারীবাদী প্রেক্ষিতকে । নারী-পুরুষের সামাজিক সম্পর্ক আর ঘনিষ্ঠতাকে পড়তে গিয়ে , সম্পর্ক-প্রেম-কামনা কিছুই তখন না পড়া যায় চেনা নারীবাদী ছকে, না পড়া যায় প্রগতিশীল বামপন্থী শ্রেণি সম্পর্কের ছকে।চুঘতাইয়ের অনন্য মুনশিয়ানা এই যে, পিতৃতান্ত্রিক সমাজ দেখতে গিয়ে তিনি সরল দাগের আগ্রাসনকারী পুরুষ ও অত্যাচারিত নারীর ছক বসান না কোথাও। তীব্র প্রতিবাদের স্বর তাঁর লেখায় অনেক মনস্তাত্ত্বিক, অন্তর্ঘাতমূলক । ‘দিল কি দুনিয়া’ নভেলে কুদসিয়া বানো কচি বয়সেই স্বামী-পরিত্যক্তা। শেষে তার একটু গর্ববোধও হতে থাকে যে, এক মেমের জন্য তার স্বামী তাকে ছেড়েছেন। অর্থাৎ, দেশের রাজার সঙ্গে তার একটা সম্পর্ক রয়েছে কিছু। পাড়ার লোকেও সশ্রদ্ধ ভাবে তাকায়।
পরিশেষে বলি আমার অন্যতম প্রিয় কবি এলিজাবেথ ব্রাউনিং এর কথা ।

রবার্ট ব্রাউনিং এর মতো বিশ্ববন্দিত কবির স্ত্রী তিনি । তবু তাঁর কবিতার ছিল নিজস্ব ধরন ।তাঁর A Man's Requirements কবিতার কিছু অংশ এখানে দিচ্ছি যা আজও সমান প্রাসঙ্গিক -- I
Love me Sweet, with all thou art,
Feeling, thinking, seeing;
Love me in the lightest part,
Love me in full being.
.........................................।
Thus, if thou wilt prove me, Dear,
Woman's love no fable,
I will love thee -- half a year --
As a man is able.
আমি ভালো লিখি না । এই লেখায় প্রতিদিনের কিছু আটপৌড়ে কথা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি । যদি একজনও এই লেখা পড়েন , তাকে বলছি যে মেয়েরা কোনো আলাদা প্রজাতি নয় । ছেলে বা মেয়ে দুজনেই ভালো কাজ করতে পারে আবার জঘন্য অপরাধও করতে পারে ।
তাই দেবী হতে চাই না । অর্ধেক আকাশের ভিক্ষেও চাই না , শুধু জানাতে চাই পুরো আকাশটাই আমাদের ।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই মার্চ, ২০১৬ রাত ১০:৪৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




