আধুনিক মালয়েশিয়ার জনক ও দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মাহাথির মোহাম্মদ বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে এসেছিলেন। তখন সাংবাদিকরা তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আপনি অল্প সময়ে মালয়েশিয়ার এত উন্নয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করলেন কিভাবে?’ উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘দেখুন যখন ভালো কাজ করবেন তখন আপনার পক্ষে কিছু লোক বাহবা দেবে; আবার যখন কোনো খারাপ কাজ করবেন তখনো কিছু লোক পাশে থাকে। আসলে এটা বড় কথা নয়; নৈতিকতার সঙ্গে দেশকে ভালোবেসে কাজ করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়াটাই মূল কথা।’ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনও সে রকম একটি বিষয়। একদিকে দেশের উন্নয়ন ও সংবিধান রক্ষার চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে জামায়াত-বিএনপি ও হেফাজতের নৃশংসতা। দশম সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মানুষ পুড়িয়ে মারা, ব্যাংকে হামলা, রাস্তার আইল্যান্ডের গাছ উপড়ে ফেলা এসব ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড হয়েছে।
গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারের বয়স ১৩ মাসেরও বেশি। এর মধ্যে ৬ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত অবরোধ-হরতালের সহিংসতায় মৃত্যুর সংখ্যা শতাধিক। আগুন ও ভাঙচুর হয়েছে ১১১৪টি যানবাহনে, রেলে নাশকতার ঘটনা ১২টি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি দেড়শ জনের মতো আর সারা দেশে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৬৫৪ জন। ঢাকার বাইরে কয়েকটি হাসপাতালে অসংখ্য রোগী আগুনে পুড়ে মৃত্যু শয্যায়; অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা। এদিকে বিএনপি নেত্রী এসব ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে বলছেন তথাকথিত গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলন। জনগণকে পুড়িয়ে মারার পাশাপাশি বাংলাদেশকে ইরাক, আফগানিস্তান, মিসর, ফিলিস্তিন কিংবা লিবিয়ার মতো একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার হীন চেষ্টা কাদের নির্দেশনায় করা হচ্ছে তা গবেষণার বিষয়! বাংলার মানুষ ১৯৫২ আর ১৯৭১ সালে যেমন পাকিস্তানিদের নৃশংসতা বরদাশত করেনি তেমনি ২০১৫ সালেও এ দেশের মানুষ এই নির্মমতা মেনে নেবে না বলে আমার বিশ্বাস।
আন্দোলন যদি জনগণের জন্য হয় তাহলে কেন তাদের পুড়িয়ে মারা হচ্ছে? খালেদা জিয়া, দয়া করে আর একজন মানুষকেও পুড়িয়ে মারবেন না, প্লিজ! বঙ্গবন্ধু যখন পূর্ব বাংলায় পাকিস্তানের শৃঙ্খল ভাঙার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন সেদিনও তিনি সাধারণ মানুষের যেন কষ্ট না হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখে কর্মসূচি দিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণে তিনি বলেছিলেন, ‘রেল, বাস ও রিকশা চলবে যাতে আমার মানুষের কষ্ট না হয়।’ সাধারণ মানুষের জীবনে যেন কোন ব্যাঘাত না ঘটে সেদিকে লক্ষ্য রেখে বঙ্গবন্ধু রাজনৈতিক কর্মসূচি দিতেন। পশ্চিমা গোষ্ঠীর ইশারায় একদল বিপথগামী সেনা অফিসার ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। এরপর খন্দকার মোশতাককে সরিয়ে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে বলেছিলেন, ‘আমি রাজনীতিবিদের কাছে রাজনীতি কঠিন করে তুলব।’ সেই এজেন্ডা আজো বাংলাদেশে সক্রিয়। এক-এগারো সৃষ্টিকারী বিএনপি ও তাদের দোসররা বর্তমানে আরেকটি এক-এগারো তৈরির চেষ্টায় ব্যস্ত; সঙ্গে তথাকথিত সুশীল নামধারীরা।
বর্তমানে স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী গুটিকয়েক রাজনৈতিক দল জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের নামে নিরীহ মানুষকে আগুনে ঝলসে দিচ্ছে। অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা করা ইসলাম কখনই সমর্থন করে না; বরং এ ধরনের হত্যাকাণ্ড বন্ধে ইসলাম সব সময় সোচ্চার এবং হত্যাকারীর জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তির বিধান। এ ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, হত্যার বদলে হত্যা ও পৃথিবীতে নৈরাজ্য সৃষ্টি করা ছাড়া যদি কেউ কাউকে হত্যা করে, তাহলে সে যেন সব মানুষকে হত্যা করল। আর যে ব্যক্তি কারো প্রাণ রক্ষা করেছেন, সে যেন সব মানুষের প্রাণ রক্ষা করল (সুরা মায়িদা-৩২)। আরেকটি বিষয় হলো, মানব মর্যাদা যেহেতু নরঘাতকদের প্রাপ্য নয়, তাই ইসলাম তাদের ব্যাপারে কোনো ছাড় দেয়নি বরং তাদের জন্য রেখেছে জাগতিক ও পারলৌকিক শাস্তি। জাগতিক শাস্তি হলো হত্যার বদলে হত্যা, অঙ্গের বদলে অঙ্গ (সুরা মায়িদাহ-৪৫)। পরকালীন শাস্তির ব্যাপারে ঘোষণা হলো- স্বেচ্ছায় জেনে-শুনে কোনো মানুষকে যে হত্যা করবে তার শাস্তি জাহান্নাম, সেখানে সে চিরকাল থাকবে, আল্লাহ তার প্রতি গজব নাজিল করবেন এবং তাকে লানত দেবেন। আল্লাহ তার জন্য মহা শাস্তি রেখেছেন (সুরা নিসা-৯৩)। যেভাবেই হত্যা করা হোক, তা যে কতটা মর্মান্তিক ভুক্তভোগী ছাড়া তা কেউ অনুধাবন করতে পারে না। ইসলামে বিষাক্ত সাপ, বিচ্ছু কিট-পতঙ্গ পর্যন্ত পুড়িয়ে মারা নিষেধ। নমরুদ ও তার দোসররা যখন হজরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সঙ্গে যুক্তিতর্কে হেরে গেল, তখন তারা ইব্রাহিম (আ.)কে আগুনে নিক্ষেপ করেছিল। কিন্তু রাখে আল্লাহ মারে কে! ইব্রাহিম (আ.)-এর জন্য উত্তপ্ত আগুন শান্তির আগুনে পরিণত হয়েছিল। পবিত্র কুরআনে আছে, আমি তাদের সরল পথ থেকে নিশ্চিতভাবে বিচ্যুত করব। তাদের অনেক আশা-ভরসা দেব এবং আদেশ করব; ফলে তারা চতুষ্পদ জন্তুর কান ছিঁড়ে ফেলবে এবং তাদের আদেশ করব যাতে তারা আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করবে (সুরা নিসা-১২৯)। আজকে ২০ দলীয় জোট গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষার কথা বলে পেট্রলবোমা মেরে মানুষ হত্যা করছে, বাদ যাচ্ছে না আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা। অর্থনীতি দিচ্ছে অচল করে। কোথায় মানবতা, গণতন্ত্র ও সংবিধান? ইসলামের দৃষ্টিতে এদের মানবতার শত্রু বলা যায়! তাই প্রধানমন্ত্রী আপনাকে ইস্পাতের মতো কঠিন হয়ে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে মানবতা ও ইসলামের শত্রু বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে।
গণতন্ত্রের আন্দোলনের নামে মানুষ পুড়িয়ে মারা, দেশের সম্পদ-অর্থনীতি ধ্বংসের তৎপরতা বন্ধ করতেই হবে। গণতন্ত্র সমুন্নত রাখতে হলে মানুষকে নিয়ে ভাবতে হবে। যারা আজ মানুষ পুড়িয়ে মারছে, তাদের ক্ষমা চাইতেই হবে- এমনটাই চাওয়া সাধারণ মানুষের!
http://www.bhorerkagoj.net/print-edition/2015/03/12/23108.php

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




