somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

'আদিবাসী' ইস্যুর যৌক্তিক বয়ান

১১ ই আগস্ট, ২০১৫ সকাল ৯:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রতি বছর পাহাড়ি জনগোষ্ঠী বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে ৯ আগস্ট 'বিশ্ব আদিবাসী দিবস' পালনের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে আসছে। যদিও বাংলাদেশ সংবিধানের ২৩(ক) অনুচ্ছেদে বর্ণিত দেশের 'উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়' কথাগুলো রয়েছে তবু পার্বত্য চট্টগ্রামের বাসিন্দাদের অন্তরের তাগিদ ও দুর্বলতা 'আদিবাসী' শব্দের প্রতি। উল্লেখ্য, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে 'আদিবাসী' শব্দটি না থাকায় কয়েক বছর যাবৎ বিভিন্ন জেলা প্রশাসকের কাছে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো চিঠিতে 'বিশ্ব আদিবাসী দিবস' উদ্যাপনে সরকারের কোনো পর্যায়ের কর্মকর্তাকে সম্পৃক্ত না হওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। অন্যদিকে সংবিধানের 'উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়' শব্দগুলোর পরিবর্তে 'আদিবাসী ফোরাম'-এর দাবি এখানে 'আদিবাসী জাতিসমূহ' সংযুক্ত করা হোক।
পার্বত্য এলাকাবাসীর 'আদিবাসী' দাবির সপক্ষে অনেক যুক্তিও উপস্থাপন করা হচ্ছে। তবে সেখানকার জননিরাপত্তার অবস্থা এখন শোচনীয়। তিনটি অস্ত্রধারী গ্রুপ নিজেদের মধ্যে দলাদলি ও চাঁদাবাজিতে লিপ্ত। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কেউই সেই গ্রুপের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না। এমনকি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতেও মাসে মাসে চাঁদা দিতে হচ্ছে। অস্ত্রের মুখে অপহৃত হলে নগদ টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে আনতে হয়। নেতৃত্ব নিয়েও রয়েছে দ্বন্দ্ব-সংঘাত। ভোটের মাধ্যমে যোগ্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত না হওয়ায় সাধারণ মানুষকে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ভোটার লিস্ট নিয়েও রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। তিন পার্বত্য এলাকায় সেনাবাহিনী নানা উন্নয়নমূলক কাজে নিয়োজিত থাকলেও সেখানকার সন্ত্রাসী দলগুলোর কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধারে সক্ষম হয়নি তারা। সেখানকার অধিবাসীর ভাষ্য, নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে অস্ত্র উদ্ধারে এবং সন্ত্রাস নির্মূলে সফলতা নেই সেনাবাহিনীর। এ জন্য পার্বত্য এলাকার মানুষের নিরাপদে বেঁচে থাকা ও মানবতা অক্ষুণ্ন রাখা আজ কঠিন হয়ে পড়েছে।
অথচ চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসমুক্ত জনপদের প্রত্যাশায় বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষর করেন এবং তা বাস্তবায়নে সচেষ্ট আছেন। বিপরীত দিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সভাপতি জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু) লারমা প্রতি বছর নানা বক্তব্য ও মন্তব্যে অসহযোগিতার মনোভাব প্রকাশ করে আসছেন। তিনি 'আদিবাসী' পরিচয় নিয়েও বিভ্রান্ত। সন্তু লারমা সম্ভবত আইএলও কনভেনশন-১০৭-এর অনুচ্ছেদ ১-এর উপঅনুচ্ছেদ ১(খ) বর্ণিত 'আদিবাসী' সংজ্ঞাটি মনোযোগসহকারে পাঠ করেননি। সেখানে বলা হয়েছে, 'স্বাধীন দেশসমূহের আদিবাসী এবং ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীর সদস্যদের ক্ষেত্রে রাজ্য বিজয় কিংবা উপনিবেশ স্থাপনকালে এই দেশে কিংবা যে ভৌগোলিক ভূখ-ে দেশটি অবস্থিত সেখানে বসবাসকারী আদিবাসীদের উত্তরাধিকারী হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে 'আদিবাসী' বলে পরিগণিত এবং যারা, তাদের আইনসংগত মর্যাদা নির্বিশেষ নিজেদের জাতীয় আচার ও কৃষ্টির পরিবর্তে ওই সময়কার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আচার ব্যবহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ জীবনযাপন করে।' অন্যদিকে 'উপজাতি' সম্পর্কে আইএলও কনভেনশন-১০৭-এর অনুচ্ছেদ ১-এর উপঅনুচ্ছেদ ১(ক) অংশে বলা হয়েছে, 'স্বাধীন দেশসমূহের আদিবাসী এবং ট্রাইবাল জনগোষ্ঠীর সদস্যদের বেলায়, যাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা জাতীয় জনসমষ্টির অন্যান্য অংশের চেয়ে কম অগ্রসর এবং যাদের মর্যাদা সম্পূর্ণ কিংবা আংশিকভাবে তাদের নিজস্ব প্রথা কিংবা রীতি-নীতি অথবা বিশেষ আইন বা প্রবিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।' অর্থাৎ 'আদিবাসী' হলো 'সন অব দি সয়েল'। আর 'উপজাতি' হলো প্রধান জাতির অন্তর্ভুক্ত ক্ষুদ্র জাতি।
'আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র ২০০৭' অনুসারে তাদের ৪৬টি অধিকারের কথা লিপিবদ্ধ রয়েছে। এ ঘোষণাপত্রে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়নি বা সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত হয়নি। তা ছাড়া ঘোষণাপত্রের ওপর সব সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে সর্বসম্মত সমর্থন নেই। এ কারণে বাংলাদেশ আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক ঘোষণাপত্রের ওপর ভোট গ্রহণের সময় তারা ভোটদানে বিরত ছিল। তবে যে কোনো অনগ্রসর জাতিগোষ্ঠীর অধিকারের প্রতি সমর্থন রয়েছে বর্তমান সরকারের। সংবিধান অনুসারে সরকার প্রধান প্রধান মানবাধিকার চুক্তির প্রতি অনুগত এবং উপজাতিদের অধিকার সমর্থন করে আসছে। এ জন্য বলা হয়, 'আদিবাসী' শব্দটি সংবিধানে সংযোজিত হলে ২০০৭ সালের 'আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণাপত্র' মেনে নিতে হবে; যা হবে বাংলাদেশের জন্য আত্মঘাতী। কারণ ঘোষণাপত্রের অনুচ্ছেদ-৪-এ আছে : 'আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার চর্চার বেলায়, তাদের অভ্যন্তরীণ ও স্থানীয় বিষয়ের ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসন এবং স্বশাসিত সরকারের অধিকার রয়েছে ও তাদের স্বশাসনের কার্যাবলির জন্য অর্থায়নের পন্থা এবং উৎসের ক্ষেত্রেও অনুরূপ অধিকার রয়েছে।' অর্থাৎ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করলে ও পার্বত্য অঞ্চলে স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে স্বশাসিত আদিবাসী শাসক নিজেদের অর্থায়নের উৎস হিসেবে সেখানকার খনিজ, বনজ ও অন্যান্য সম্পদ নিজেদের বলে চিন্তা করত। আবার অনুচ্ছেদ-৩৬-এ আছে, 'আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর, বিশেষত যারা আন্তর্জাতিক সীমানা দ্বারা বিভক্ত হয়েছে, তাদের অন্য প্রান্তের নিজস্ব জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আধ্যাত্মিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক কার্যক্রমসহ যোগাযোগ সম্পর্ক ও সহযোগিতা বজায় রাখার ও উন্নয়নের অধিকার রয়েছে।' রাষ্ট্র এ অধিকার কার্যকর সহযোগিতা প্রদান ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে। ঘোষণাপত্রের এ নির্দেশ কোনো সরকারই মেনে নিতে পারবে না বলে মনে করা হয়। কারণ পাশের রাষ্ট্রের সঙ্গে রাজনৈতিক কার্যক্রম অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হবে। তা ছাড়া বাংলাদেশে পার্বত্য অঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকায় জঙ্গি তৎপরতা বৃদ্ধি পাবে; যা ক্রমেই সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে জাতীয় উন্নয়ন ব্যাহত করবে।
জাতিসংঘের ঘোষণাপত্রের শেষ অনুচ্ছেদ-৪৬-এ সবার মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখানোর কথা বলা হয়েছে এবং এ কাজটি গত মহাজোট সরকার সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে সম্পন্ন করেছে। এর আগে 'পার্বত্য শান্তিচুক্তি' অনুসারে ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র, মানবাধিকারের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, সমতা, বৈষম্যহীনতা, সুশাসন এবং সরল বিশ্বাসের মূলনীতি অনুসরণ করা হয়েছে। এ জন্য পার্বত্য শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন জরুরি। তাহলে 'আদিবাসী' বনাম 'উপজাতি' বিতর্ক থেকে আমরা মুক্ত হতে সক্ষম হব। সুত্র: Click This Link
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই আগস্ট, ২০১৫ সকাল ৯:৩১
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সাবধানের মার্ নেই

লিখেছেন ঢাকার লোক, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:৩১


নিউ ইয়র্ক থেকে ফিরার পথে নিউ আর্ক্ লিবার্টি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে যখন এরোপ্লেনে উঠে নির্দিষ্ট সীটের কাছে পৌঁছলাম দেখলাম এক প্রৌঢ় ভদ্রলোক জানালার পাশের সিটটাতে অলরেডি বসে আছেন। আইল ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

হারানো বিজ্ঞপ্তি

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:৩১



অত্যন্ত দুঃখ ও ভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানানো যাচ্ছে যে, গত প্রায় দুই বছর যাবৎ বিবেক, বুদ্ধি, জ্ঞান, বিচার ও বিবেচনা - এই পাঁচজনকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। একসময় তাঁরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মার্কিন মাটিতে ‘আত্মঘাতী ভুল’- নাকি বদলে যাচ্ছে হিসাব?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:২৫


মার্কিন মাটিতে ‘আত্মঘাতী ভুল’- নাকি বদলে যাচ্ছে হিসাব?

শেখ হাসিনা কি ফিরবেন?
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কখনো কখনো একটি বৈঠকের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে- কোন বৈঠকটি হলো, কোনটি হলো না এবং কোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

সংখ্যা গরিষ্ঠ মুসলিম হিসেবে গর্ব করার কিছু নেই......

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আমরা যারা আপাত দৃষ্টিতে হায়েনা নই কিন্তু নিরবে স্বচক্ষে হিন্দুদের সর্বনাশ দেখে যাচ্ছি তারা সবচেয়ে বেশি দায়ী। অথচ বাংলার হিন্দু, বাংলার খ্রীষ্টান, বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙ্গালী-এই বৈষম্যহীনতা... ...বাকিটুকু পড়ুন

অল্প একটু পাশে থেকো

লিখেছেন রানার ব্লগ, ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১০



আমাকে খুব বেশি কিছু দিতে হবে না,
এক মুঠো আকাশও নয়,
আচেনা কোনো বিকেলও নয়।

শুধু কখনো কখনো
আমার নির্জন ঘরের দরজায়
টোকা দিয়ে দাঁড়িয়ো, যেন বুঝতে পারি
ফুরিয়ে যাবার বেলা এখনো আসেনি ।

আমাকে প্রতিদিন মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×