somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

টরেন্টোর চিঠি

২১ শে মার্চ, ২০০৯ ভোর ৪:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বিকেল হয়ে গেছে। ক্লাস শেষে বাসায় ফিরে বসে আছি একা একা। আজকে শুক্রবার। সপ্তাহের শেষ কর্মদিবস। পাঁচদিন কুকুরের মত কাজ করার পর শুক্রবারে এসে কানাডিয়ানডের মোটামুটি মাথা খারাপ হয়ে যায়। যার সাথেই দেখা হয়, তাকেই বলে, "খুব ভালো একটা উইকএন্ড কাটাও"। আমি যখন প্রথম প্রথম এটা শুনতাম, আমার কি যে হাসি পেত! উইকএন্ড নিয়ে এত উত্তেজিত হওয়ার কি আছে? এখন শুনতে শুনতে মোটামুটি অভ্যাস হয়ে গেছে। আমিও শুক্রবারে কারও সাথে দেখা হলে কথা-বার্তা শেষ হবার পর সব কয়টা দাঁত বের করে বিশাল একটা হাসি দিয়ে বলি, "খুব ভালো একটা উইকএন্ড কাটাও"।

হু, কিছু কিছু কায়দা-কানুন শিখেছি বটে। কিন্তু আসলেই কি পেরেছি কানাডার জীবনযাত্রার সাথে খাপ খাওয়াতে? মানুষের খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা অবশ্য অসাধারণ। আমাকেও অনেক কিছুই মানিয়ে নিতে হয়েছে। যে আমি দেশে থাকতে চুলা ধরাতে পারতাম না, সেই আমি এখন সপ্তাহে একদিন ভাত আর সবজি রাঁধি। এখানে অবশ্য চুলা ধরাতে হয় না। চুলাগুলো বিদ্যুৎ দিয়ে চলে। আর রান্না করা খাবারের স্বাদ কেমন হয়, সে ব্যাপারেও মন্তব্য করতে চাচ্ছি না। তবুও আম্মু নেই, আব্বু নেই, আমার ছোট বোন দুটো নেই, প্রিয় বন্ধুরা নেই -- তারপরও টিকে আছি। হ্যাঁ, টিকেই আছি। বেঁচে আছি মনে হয় বলা যায় না। দেশের জীবনটাকে খুব মিস করি। মধ্যে মধ্যে মনে হয় সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে দেশে উড়াল দেই। পর মুহূর্তেই বাস্তব জীবনে ফিরে আসি। মনে পড়ে - আমিতো পড়তে এসেছি... ...আমাকেতো পড়তে হবে। নিজেকে প্রবোধ দিতে দিতেই দেড়টা সেমিস্টার পার করে দিলাম। অপেক্ষায় আছি আগস্টের জন্য। থিসিস জমা দিলে বলতে পারব, আমি মাস্টার্স পাশ!

পড়ছি ইউনিভার্সিটি অফ টরেন্টোতে। গত বছর ঠিক এই সময়ে পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনার মত কীভাবে কীভাবে যেন কপালে স্কলারশিপটা জুটে গেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স কানাডার মত দেশে স্বীকৃতি পাবে কিনা - তা নিয়ে সংশয় ছিল অনেক। বেশিরভাগ ভালো ইউনিভার্সিটিই বলে দেশে মাস্টার্স করে তারপর দ্বিতীয় মাস্টার্সের জন্য আবেদন করতে। হয়তো আমার বিষয়টা মোটামুটি নতুন (উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ) আর টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার বিষয়ের বৈচিত্র্যের ওপর জোর দেয় বলেই স্কলারশিপটা জুটলো। মনে আছে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত আসবার সময় হলো, তখন ঘন্টায় ঘ্ন্টায় ইমেইল চেক করতাম। একদিন রাত চারটার সময় ঘুম ভাঙলো। অভ্যাসমত মোবাইল থেকে মেইলবাক্সে ঢুকলাম। দেখি ডিপার্টমেন্ট থেকে অ্যাডমিশন, ফেলোশিপ আর টিচিং অ্যাসিসস্ট্যান্টশিপের সিদ্ধান্ত জানিয়ে মেইল করেছে। বিশাল এক লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে সোজা দৌড় দিলাম আম্মু-আব্বুর ঘরে। রাত চারটার সময় লাফাতে লাফাতে ওদের ঘুম ভাঙিয়ে খবরটা দিলাম। তারপর ভেউ ভেউ করে কাঁদতে আরম্ভ করলাম!!!

আমি এখন টরেন্টোতে, আমার স্বপ্নের টরেন্টোতে। দিনের পর দিন কম্পিউটারে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবপেজ খুলে বসে থাকতাম, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে এখন আমার নিত্যদিনের আনাগোনা। সৃষ্টিকর্তাকে ঠিক কীভাবে ধন্যবাদ জানানো উচিত বুঝতে পারিনা!

এখানে গ্রাজুয়েট স্টুডেন্টদের জীবন অমানুষিক রকম ব্যস্ত। সপ্তাহে ৬০০-৭০০ পৃষ্ঠা করে পড়া দেয়। খুব কম দিনই ঠিক মত পড়ে শেষ করতে পারি। তার মধ্যে একদিন আবার আন্ডারগ্র্যাডের বাচ্চাদের (নিজে গ্র্যাড হয়ে এখন আন্ডারগ্র্যাডদের বাচ্চাই মনে হয়! হাঃ হাঃ হাঃ) টিউটোরিয়াল নিতে হয়। টিউটোরিয়াল নেয়াটা অবশ্য খুব উপভোগ করি। ছোটবেলা থেকেই আম্মুকে স্কুলে পড়াতে দেখতাম; নিজেও একসময় আম্মুর ছাত্রী ছিলাম। টিচার টিচার ভাবটা কেমন জানি রক্তে চলে এসেছে। আমি অবশ্য এখনও টিচার নই, আমাকে বরং টিচারের কম্পাউন্ডার বলা চলে। তারপরও বাচ্চাদের খাতা দেখে যখন গ্রেড বসাই, কী যে জটিল একটা ভাব আসে!!!

বাসা থেকে ক্লাস, ক্লাস থেকে বাসা, মাঝে একদিন টিউটোরিয়াল, উইকএন্ডে রান্না, কাপড় ধোওয়া আর বাজার - এই নিয়েই এখন আমার জীবন। কেমন যেন মেশিন-মেশিন একটা ভাব। এখানে অবশ্য সবাই একেকটা মেশিন। অন্তত আমার তাই মনে হয়। পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন কাপল খুঁজে পাওয়া যায় না। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়তো কাপলদের স্বর্গরাজ্য। কানাডিয়ানরা মনে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে শুধু নাক-মুখ গুঁজে পড়াশোনা করতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালের মত ছাত্র-ছাত্রীদের দল বেঁধে আড্ডাবাজি তেমন একটা চোখে পড়ে না। সায়েন্স আর ইঞ্জিনিয়ানিং ফ্যাকাল্টির অবস্থা কিছুটা ভালো। বিল্ডিংগুলোর কাছে গেলে হল্লাবাজির আওয়াজ পাওয়া যায়। ওখানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি। আন্তর্জাতিক স্টুডেন্ট মানে ইরানীয়, ভারতীয়, চীনা, কোরিয়ান আর অল্প কিছু বাংলাদেশি। এদের মধ্যে যন্ত্র ভাব কিছুটা কম। দলবদ্ধ আড্ডাবাজির হালকা-পাতলা স্বভাব আছে। কিন্তু আড্ডাবাজির শব্দ খুবই অদ্ভুত। একেকটা দল একেক ভাষায় কথা বলছে! চাইনিজ, কোরিয়ান, ফার্সি, হিন্দি, বাংলা, ইংরেজি - সবকিছু মিলে আমার কাছে আওয়াজটা শুনতে লাগে - "কিচিরমিচির কিচিরমিচির কিচির কিচির... ... ..."।

আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সবার জীবনই মোটামুটি এক সুরে বাঁধা। ওরা প্রায় সবাই নিজ দেশের মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। ভালো ছাত্র-ছাত্রী। মা-বাবার টাকা দিয়ে বিদেশে পড়তে পাঠানোর সামর্থ্য ছিল না। দিনের পর দিন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে মেইল করে, অধ্যাপকদের অনুরোধ করে অবশেষে টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কলারশিপ কপালে জুটেছে। তবে স্কলারশিপটা শুধু খেয়ে পড়ে কোনরকমে বেঁচে থাকার খরচটা যোগায়। ওরা চাইলেই প্লেনের টিকেট কেটে দেশে উড়াল দিতে পারে না। কম্পিউটারের স্ক্রিনের সামনে এমএসএন অথবা স্কাইপ খুলে বসে ওরা বড় বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বৈশ্বিক অর্থনীতির চলমাল ধ্বস ওদের পিএইচডিতে ফান্ড পাওয়ার সম্ভাবনার সামনে বিশাল এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন বসিয়ে দেয়। তারপরও ওরা নিজেকে নিয়ে, পরিবারকে নিয়ে, নিজের দেশকে নিয়ে খুব সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন দেখে। কেউ ভাবে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে গিয়ে আইটি বিপ্লবে যোগ দেবে, কেউ ভাবে বিদেশের বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়ে শুধু নিজেদের দেশের ছাত্র-ছাত্রীদেরকে বৃত্তি দিয়ে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে নিয়ে আসবে, কেউ ভাবে টাকা-পয়সা জমিয়ে দেশে শিল্প-কারখানা গড়ে তুলবে... ...

আমরা যাকে তৃতীয় বিশ্ব বলি, সেখান থেকে প্রচুর ছাত্র-ছাত্রী এভাবে এক বুক স্বপ্ন নিয়ে "প্রথম বিশ্বে" পড়তে আসে। দেশকে যারা পেছনে ফেলে আসে, তাদের বুকে দেশের জন্য একটা অন্যরকম ভালোবাসা তৈরি হয়। তারা যখন দেশকে নিয়ে কথা বলে, তখন তাদের চোখ চকচক করে, ঝকঝকে স্বপ্নগুলো দুচোখে ঝিলিক দিয়ে যায়। তারা সবাই বাইরের বিশ্বে নিজের দেশের প্রতিনিধি। তারা যখন ভালো রেজাল্ট করে, তখন নিজের আনন্দের চেয়ে নিজের দেশকে সবার সামনে প্রমাণ করতে পারার আনন্দে তাদের চোখে পানি চলে আসে।

দেশের কোন কোন মানুষ দেশ ছেড়ে বাইরে আসবার জন্য তাদের গায়ে "সুবিধাভোগী" লেবেল লাগিয়ে দেয়। তারা সেটা শুনে কষ্ট পায়। কিন্তু তারপরও তারা স্বপ্ন দেখে... ...নিজেকে নিয়ে... ...দেশকে নিয়ে... ...দেশের মানুষকে নিয়ে। তারা শপথ নেয় - একদিন তারা প্রমাণ করেই ছাড়বে যে দেশের ভৌগলিক সীমারেখার বাইরে আসা মানেই দেশকে ভুলে যাওয়া নয়।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে মার্চ, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৫০
১৩টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

অভিনব প্রতারনা - ডিজিটাল প্রতারক

লিখেছেন শোভন শামস, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:১৮



একটি সাম্প্রতিক সত্য ঘটনা।
মোবাইল ফোনে কল আসল, একটা গোয়েন্দা সংস্থার ছবি এবং পদবী সহ। এই নাম্বার সেভ করা না, আননোন নাম্বার। ফোন ধরলাম। বলল আপনার এই নাম্বার ব্যবহার করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আগে নিজেকে বদলে দিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:৪১



"আমার স্বামী সংসারের কুটোটাও নাড়ান না। যেখানকার জিনিস সেখানে রাখেন না। মুজা খুলে ছুঁড়ে যেখানে সেখানে ফেলে দেন। নিজেকে পরিষ্কার রাখতে বারবার ভুল করেন! এতো বছর বিবাহিত জীবন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×