somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং প্রাসঙ্গিক আইনের বিশ্লেষণ ( ২য় পর্ব ) ( যেকোন রাজাকার এবং রাজাকার সমর্থনকারীদের প্রতি ওপেন চ্যালেঞ্জ, পারলে যুক্তিগুলো খন্ডন করুন)

০৬ ই জানুয়ারি, ২০০৮ রাত ৮:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

(প্রকাশসত্ব সংরক্ষিত)

{আগের পর্বের পর.....}

এ বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই আমাদের সংবিধানের প্রথম সংশোধনী সমন্ধে। ১৯৭৩ সালের ১৫ জুলাই প্রথম সংশোধনী গৃহীত হয় এবং এটি রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পায় ১৭ জুলাই। এই প্রথম সংশোধনীর বিষয়বস্তু ছিল যুদ্ধাপরাধীসহ অন্যান্য গণবিরোধীদের বিচারের বিধান নিশ্চিত করা।

সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে ৪৭(৩) অনুচ্ছেদ অন্তভূক্ত করা হয়। এই অনুচ্ছেদটির দিকে দৃষ্টি দেযা যাক -

“ Notwithstanding anything contained in this Constitution, no law nor any provision thereof providing for detention , prosecution or punishment of any person, who is a member of any armed or defence or auxiliary forces or who is a prisoner of war, for genocide, crimes against humanity or war crimes and other crimes under international law shall be deemed void or unlawful, or ever to have become void or unlawful, on the ground that such law or provision of any such law is inconsistent with, or repugnent to, any of the provision of this Constitution.”

অর্থাৎ, “ এই সংবিধান যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও গণহত্যাজনিত অপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের অধীন অন্যান্য অপরাধের জন্য কোন সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য কিংবা যুদ্ধবন্দীকে আটক, ফৌজদারীতে সোপর্দ কিংবা দন্ডদান করিবার বিধান-সংবলিত কোন আইন বা আইনের বিধান এই সংবিধানের কোন বিধানের সহিত অসমঞ্জস্য বা তাহার পরিপন্থী, এই কারনে বাতিল বা বেআইনী বলিয়া হবে গণ্য হইবে না কিংবা কখনও বাতিল বা বেআইনী হইয়াছে বলিয়া গণ্য হইবে না।”

অসমঞ্জস্য বা পরিপন্থীর কথা কেন আসছে, সে বিষয়টি বুঝতে হলে আলোকপাত করতে হবে সংবিধানের কতিপয় বিধানের অপ্রযোজ্যতা শিরোনামে বিধিবদ্ধ ৪৭ (ক) (১) এবং ৪৭ (খ) (২) অনুচ্ছেদ।

৪৭ (ক) (১) - “ যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় বর্ণিত কোন আইন প্রযোজ্য নয়, সেই ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদ, ৩৫ অনুচ্ছেদের (১) ও (৩) দফা এবং ৪৪ অনুচ্ছেদের অধনি নিশ্চয়কৃত অধিকারসমূহ প্রযোজ্য হবে না।”

৪৭ (ক) (২) - “ এই সংবিধানে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা সত্ত্বেও যে ব্যক্তির ক্ষেত্রে এই সংবিধানের ৪৭ অনুচ্ছেদের (৩) দফায় বর্ণিত কোন আইন প্রযোজ্য হয়, এই সংবিধানের অধীন কোন প্রতিকারের জন্য সুপ্রীম কোর্টে আবেদন করিবার কোন অধিকার সেই ব্যক্তির থাকিবে না।”

এখন সংবিধানের ৩৫ (১) নং অনুচ্ছেদের দিকে লক্ষ্য করি -

“ অপরাধের দায়মুক্ত কার্যসংঘটনকালে বলবৎ ছিল এইরুপ আইন ভঙ্গ করিবার অপরাধ ব্যাতীত কোন ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত করা যাইবে না এবং অপরাধ সংঘটনকালে বলবৎ সেই আইনবলে যে দন্ড দেওয়া যাইতে পারিত, তাহাকে তাহার অধিক বা তাহা হইতে ভিন্ন দন্ড দেওয়া যাইবে না।”

অনুচ্ছেদ ৪৭ (৩) এর পর অনুচ্ছেদ ৩৫ (১) এর আলোচনা নিয়ে আসার কারণ হলো সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর অন্যতম উপলক্ষ্যই হলো এই ৩৫ (১) নং অনুচ্ছেদ। “ ex post facto” laws বলে আইনে একটা টার্ম রয়েছে।

Ex post facto law is one which, in its operation, (1) makes that criminal which was not so at the time the act was not so at the time the act was performed, or (2) which increases the punishment, or in short which in relation to the offence or its consequence, alters the situation of a party to his detriment or disadvantage.

আমাদের সংবিধানে ex post facto law সম্পর্কিত অনুচ্ছেদটি হলো ৩৫ (১)। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে কোন আইন যাতে ex post facto টার্মটির সঙ্গে বিরোধ না করে সেজন্যই সংবিধানে ৪৭ (৩) অনুচ্ছেদ যোগ করা হয়।

এবার ফিরে আসি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পর্কিত কার্যকরী আইন The International crimes (Tribunals) Act, 1973 প্রসঙ্গে। ১৯৭৩ সালের ২১ জুলাই জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয় এই আইন। আমরা লক্ষ্য করি ১৭ জুলাই সংবিধানের প্রথম সংশোধনী অনুমোদিত হওয়ার তিনদিন পরেই The International crimes (Tribunals) Act, 1973পাশ হয়। তারমানে সংবিধানের ৪৭ (৩) অনুচ্ছেদে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য যে আইনটির কথা বলা হয়েছিল The International crimes (Tribunals) Act, 1973 -ই হচ্ছে সেই আইন। অর্থাৎ এই আইনটি সংবিধানের অন্য কোন অনুচ্ছেদের সঙ্গে অসমঞ্জস্য বা পরিপন্থী হলেও বাতিল হবে না।

সুতরাং যারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে এর দোহাই দেখান তাদের জন্য মোক্ষম জবাব হচ্ছে বাংলাদেশের সংবিধানের ৪৭ (৩) অনুচ্ছেদ। এখানে একটি অজুহাতের জবাব দেয়া হলো। সংবিধানের চেয়ে বড় আইনতো বাংলাদেশে অন্য কোন আইন নয়।

আরেকটি অজুহাত হচ্ছে সিমলা চুক্তি। সিমলা চুক্তি সাক্ষরিত হয় ১৯৭২ সালের ২ জুলাই। এই চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধবন্দীদের বিনিময় হয়েছে। কিন্তু এই চুক্তিতে কোথাও বলা নাই যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে না।

এসবকিছুর পর আরেকটি বিষয় মনে করিয়ে দিতে চাই সংবিধান এই দেশের সর্বোচ্চ আইন। অন্য যেকোন আইনের সাথে অসামঞ্জস্য কিংবা পরিপন্থী হলে সংবিধানের আইন প্রাধান্য পাবে। সংবিধানের ৪৭ (৩) ধারায় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কথা বলা হয়েছে। এবং এই ধরার ভিত্তিতেই পরবর্তীতে The International crimes (Tribunals) Act, 1973 কার্যকর হয়। এই অ্যাক্টটি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে বলে, যার সমর্থনে রয়েছেবাংলাদেশের সংবিধানের একটি অনুচ্ছেদ। কোন ধরনের চুক্তি কিংবা আলোচনা নিশ্চয়ই সংবিধানের আইনের উপরে স্থান পেতে পারে না। তাহলে এটা স্বতঃসিদ্ধ যে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ক্ষেত্রে আইনগত কোন বাধা নেই।

প্রসঙ্গত একটা বিষয় উল্লেখ করতে চাই। সংবিধানের তৃতীয় ভাগের শিরোনাম মৌলিক অধিকার। এর অধীনে ২৬ নং থেকে ৪৭ (ক) নং অনুচ্ছেদ রয়েছে। রাষ্ট্রের কর্তব্য এই অনুচ্ছেদগুলো অবশ্যই কার্যকর করা। ৪৭ (৩) অনুচ্ছেদ মৌলিক অধিকার অংশে পড়ে। সংবিধানের ২য় ভাগে রয়েছে রাস্ট্র পরিচালনার মুলনীতি ডার অধীনে আছে ৮ থেকে ২৫ নং অনুচ্ছেদ। রাষ্ট্র পরিচালনার মুলনীতিগুলো আদালতের মাধ্যমে বলবৎযোগ্য নয়। কিন্তু মৌলিক অধিকার অংশের যেকোন অনুচ্ছেদের দাবি রাষ্ট্রের নাগরিক করতেই পারে। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে আমরা ৪৭ (৩) নং অনুচ্ছেদ কার্যকর এবং বাস্তবায়নের দাবি করতেই পারি। সুতরাং জোর গলায় বলতে পারি, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতেই হবে।

(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই জানুয়ারি, ২০০৮ রাত ৮:১৪
১৯টি মন্তব্য ২০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ভালোবেসে লিখেছি নাম

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ দুপুর ১২:৫৮









আকাশে রেখেছি সূর্যের স্বাক্ষর
আমার বুকের পাজরের ভাজে ভাজে
ভালোবেসে লিখেছি তোমারি নাম
ফোটায় ফোটায় রক্তের অক্ষর।

এক জীবন সময় যেন বড় অল্প
হাতে রেখে হাত মিটেনাতো সাধ
... ...বাকিটুকু পড়ুন

নীলাঞ্জনার সাথে

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ দুপুর ১:৪৩

ছবি :ইন্টারনেট


কেউ নিজের মতো অভিযোগ গঠন করলে (ঠুনকো)
বলি কী ,
তার ভেতরেই বদলানোর নেশা ,
হারিয়ে যাওয়ার নেশা।
ছেড়ে যেতে অভিনয় বেশ বেমানান,
এ যেন নাটক মঞ্চস্থ হওয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফেব্রুয়ারির শেষ সময়টা

লিখেছেন রোকসানা লেইস, ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ দুপুর ২:৪৮

ফেব্রুয়ারির এই শেষ সময় কয়েকটা বছর ভয়ানক সব ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশ । বিডিআর হত্যা কান্ড তার মধ্যে অন্যতম । রাত গভীরে অপেক্ষা করছিলাম, বইমেলায় খবর দেখার জন্য । তখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

একুশের নিহতদের খুন করেছে কারা?

লিখেছেন ইএম সেলিম আহমেদ, ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ বিকাল ৩:৩৪



মূল ঘটনায় যাওয়ার আগে একটি ভিন্ন ঘটনায় নজর দেই। ২৪ নভেম্বর যাত্রাবাড়ি, ১৯৭৪ সাল, ভয়ানক বিস্ফোরণ হয় একগুচ্ছ বোমার। বোমার নাম আলোচিত নিখিল বোমা। সে বোমার জনক নিখিল রঞ্জন... ...বাকিটুকু পড়ুন

গত ৯ বছরে সামুর পোষ্টের মান বেড়েছে, নাকি কমেছে?

লিখেছেন সোনাগাজী, ২৭ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ রাত ৮:১৮



আমার ধারণা, গত ৮/৯ বছরে সামুর পোষ্টের মান বেড়েছে, অপ্রয়োজনীয় পোষ্টের সংখ্যা কমেছে। সব পোষ্টেই কিছু একটা থাকে; তবে, পোষ্ট ভুল ধারণার বাহক হলে সমুহ বিপদ,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×