-সামিহা সুলতানা অনন্যা
আজ ২৬শে মার্চ, মহান স্বাধীনতা দিবস। বহু ত্যাগ ও লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন ছিল প্রকৃত অর্থে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদ উত্থানের জন্য সমগ্র জনগণের আন্দোলন। নারী ও পুরুষের মিলিত সংগ্রামেই অর্জিত স্বাধীনতা। নয় মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে অনেক নারীর অবদান ছিল প্রত্যÿ। অনেক নারী হাসপাতালগুলোতে সেবিকার দায়িত্ব পালন, মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অস্ত্র, গোলা বারুদ ও অন্যান্য রসদ সরবরাহ করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে সহযোগিতা করেছেন অনেকে।
বাগেরহাটের মেহেরুন্নেসা মীরা তেমনই একজন । তিনি কৃষক পরিবারের মেয়ে। মেহেরুন্নেসা মীরা প্রধানত মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পাহারা দেবার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। ক্যাম্পে তাকে নিয়মিত যোদ্ধাদের জন্য রান্নাবান্না, সেবা শুশ্রƒষা করতে হতো। অস্ত্রশস্ত্র সংরক্ষণ ছিল তার অন্তর্ভুক্ত। একদিন সাহসপুর ক্যাম্পে থাকাকালীন পাকসেনাদের সম্ভাব্য আক্রমণের আশংকায় সকলে চলে যায় অন্যত্র, মীরা একাই ছিলেন ক্যাম্প পাহারার দায়িত্বে । অল্পক্ষণের মধ্যেই পাকবাহিনী হামলা করতে পারে ভেবে মীরা সকল অস্ত্রশস্ত্র গোলাবারুদ নিয়ে বের হয়ে পড়েন ও বিলের মধ্যে নৌকায় লুকিয়ে থাকেন । একরাত ও একদিন বিলের মধ্যে কাটিয়ে দেন, পরে মুক্তিযোদ্ধরা এসে তাঁকে খুঁজে পান। তিনি ভিখারী বেশে আগে গিয়ে সম্ভাব্য অপারেশন স্থলের ভূমি বৈশিষ্ট্য জেনে আসতেন ও তার ভিত্তিতেই অপারেশন করা না করার সিদ্ধান্ত নেয়া হতো। একদিন বিষ্ণুপুর হাইস্কুলের উদ্দেশ্যে পুরো টিম রওনা হয়, আগে মীরা। পথে তারা রাজাকারদের মুখোমুখি হয়। খালের এপারে মুক্তিবাহিনী ওপারে রাজাকার বাহিনী । মীরা এগিয়ে গিয়ে সাঁকো সরিয়ে ফেলে নিজেকে ও পুরো দলকে রক্ষা করে।
এরকমই অপর দুই মুক্তিযোদ্ধা বীথিকা বিশ্বাস, শিশির কনা। তারা তাদের গ্রামে ক্যাপ্টেন বেগের সাথে দেখা করে যুদ্ধে অংশ গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করলে প্রথমে তিনি বলেন, তোমরা কি যুদ্ধ করবে? তারা বলেন যে মরতে হয় তো মরব, আমাদের দলে নিতেই হবে। পরে তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞা দেখে তাদের দলে নেন। মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে খুব সামান্য অস্ত্রশস্ত্র ছিল, বুলেট ছিল আরো কম। বীথিকা যেদিন বুলেটের অভাবে বেয়োনেট দিয়ে দু’জন দেশদ্রোহী রাজাকারকে মারলেন সেদিন দলের প্রথম শ্রেণীর যোদ্ধা হিসেবে সদস্য হলেন, অংশ নিলেন একের পর এক অপারেশনে।
এ সময় পশ্চিমবঙ্গের বশিরহাট মহকুমার টাকিতে ৯ নং সেক্টরের মূল হেড কোয়ার্টার ছিল । এখানে মেজর জলিলের নেতৃত্বে ক্যাম্প প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেখানে প্রায় শ’খানেক নারী গুপ্তচর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মেয়েরা নানা বেশ ধরে মিশে যেত রাজাকারদের সাথে ও তথ্য সংগ্রহ করত। মুক্তিযুদ্ধে আহতদের শুশ্রƒষা করতে বহু নারী অংশগ্রহণ করেছেন। সে সময় সালেহা খাতুন, সাজেদা চৌধুরী, ফরিদা আক্তার প্রমুখ নারীরা প্রাথমিক চিকিৎসার ট্রেনিং দিয়ে বহু নারীকে তার উপযোগী করে তুলতে সাহায্য করেছেন।
রাফিয়া আখতার ডলি মুক্তিযুদ্ধের সময় ময়মনসিংহ জেলার সীমানা পেরিয়ে ভারতের তুরা ক্যাম্পে আশ্রয় নেন। সেখানে তিনি অস্থায়ী সরকারের দেয়া দায়িত্বসমূহ পালন করেন। সেসব কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজসমূহে শিক্ষার্থীদের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে উদ্বুদ্ধ করা ও তাদের সহায়তায় বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরগুলোতে খাবার ও কাপড় যোগাড় করে দেয়া।
৭১-এর মার্চের শুরু থেকেই দলে দলে নারীরা রাইফেল চালানোর প্রশিক্ষণ নেয়া শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজ, গভ: ইন্টারমিডিয়েট কলেজের প্রচুর মেয়ে তাতে অংশগ্রহণ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে তাদের এই প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হতো। প্রশিক্ষণ শেষে তারা দৃঢ় পদক্ষেপে রাজপথ প্রদক্ষিণ করতেন । সেই ছবি জাতীয় জাদুঘর ও মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে আজও শোভা পাচ্ছে। সে সময় দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য কলাবাগানের মরিচা হাউসের সামনে দুই শতাধিক মহিলা ডামি রাইফেলস প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে।
বাঙালির মুক্তিযুদ্ধ সার্বিকভাবে এক স্বাধীন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কাব্যগাথা। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে ইংরেজি খবর পড়তেন পারভীন হোসেন ও নাসরীন আহমাদ শিলু- তবে ছদ্মনামে দেশের ভিতরের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের নিরাপত্তার কারণে ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। সময়ের প্রয়োজনে গানের শিল্পী হয়ে উঠলেন সংবাদ পাঠিকা। এ কাজে আরো অংশগ্রহণকারী সংগঠক ছিলেন কল্যাণী ঘোষ, উমা, স্বপ্না রায়, বুলবুল মহলান বীনা, অমিতা বসু, ফ্লোরা আহমেদ, ফেরদৌসী মজুমদার প্রমুখ।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে বাঙালি নারীরা যে অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছে এবং আত্মত্যাগ করেছে, তার সত্যিকার মূল্যায়ন আজো হয়নি। অমর বীরাঙ্গণাদের পবিত্র স্মৃতির উদ্দেশে নির্মিত হয়নি কোনো স্মৃতি¯Íম্ভ। এ বিষয়ে সরকারের মনোভাবের পরিবর্তন আসতেও সময় লাগে অনেক। ১৯৯৭ সালে এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গি সুস্পষ্ট হয়। জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতিতে প্রথমবারের মতো বলা হয়, “স্বাধীনতা যুদ্ধে পুরুষের পাশাপাশি নারীও অসামান্য অবদান রাখে”। স্বাধীনতার ৩৮ বছর পরও আমাদের প্রত্যাশা নতুন প্রজন্ম এ ইতিহাসগুলো নিয়ে গবেষণা করবে এবং আমাদের চেতনার সরণি জুড়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধে নারীর বীরত্বপূর্ণ অবদানকে তুলে ধরবে সমগ্র পৃথিবীর সামনে।
সংগ্রহে- ইত্তেফাক
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মার্চ, ২০০৯ দুপুর ১২:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


