
প্রায় চার পাঁচ দিন যাবত ঘন বৃষ্টি হচ্ছে। এই বৃষ্টি থেমে যাবার বৃষ্টি না। নিকষ কালো অন্ধকার রাতকে আরোও অন্ধকার করে দিয়ে রাতভর বৃষ্টি হয়। তারপর ভোর সকাল থেকে শুরু হয় তুমুল বৃষ্টি। সারা দিন থেমে থেমে বৃষ্টি চলে। অবস্থা হয়েছে এমন, দিনের বেলাতেও কুপি হারিকেন ধরিয়ে রাখতে হয়। বৃষ্টি কাঁদা আর পানির কারণে আমাদের বাজারে যাওয়া বন্ধ। ছোট চাচার সাথে পুকুর আর দিঘী থেকে অতি সামান্য কিছু মাছ ধরি বাড়ি ঘরের রান্নার জন্য। সময় ১৯৬৯ সন। খুব সম্ভব এমনই জুলাই - আগস্ট মাস হবে হয়তো।
একদিন ভোর সকালে ঘুম ভাঙার পর থেকেই খুব মিষ্টি খেতে মন চাইছে। মনে হচ্ছে মিষ্টির চেয়ে ভালো কোনো খাদ্যদ্রব্য হয়তো এই পৃথিবীতে নেই - হতে পারেনা। হয়তো পৃথিবীতে কখনো ছিলোও না। সেই শিশুকালে মিষ্টির জন্য এতো মন খারাপ লাগতে লাগলো যা লিখে প্রকাশ করা যাবে না। দাদাজান দাদীজান খেজুরের গুড় দিয়ে চা খেতে পছন্দ করতেন। কিন্তু এই বৃষ্টিতে বাড়িতে বাজার সাজার সব বন্ধ। দাদাজান দাদীজান কি আমাকে এক টুকরো গুড় দিবেন? গুড় আছে কিনা তাও জানিনা! আমি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে মাথার উপর একটি এল্যুমিনিয়ামের বোল ছাতার মতো করে ধরে দাদাজানের ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাড়ালাম। আশ্চর্য দাদীজান কি মনের কথা পড়তে পারেন? দাদীজানের জন্য দাদাজানের বর্মা থেকে আনা চম্পাফুল কাঠের মনিহারি সিন্দুকের উপর বসতে বলে আমার ছোট্ট হাতে এক টুকরো খেজুরের গুড় দিলেন। দাদীজানের মনিহারি সিন্দুকের উপর বসে আশ্চর্য হয়ে খেজুরের গুড়ে কামড় দিচ্ছি আর প্রতিটি কামড়ে মনে হচ্ছে গুড়ের প্রতিটি দানায় দানায় মিশ্রিত আছে লক্ষ লক্ষ স্নেহ মায়া মমতা আর ভালোবাসা! - আমার জীবনের শ্রেষ্ট মিষ্টি, আমার জীবনের শ্রেষ্ট স্মৃতি। দাদীজান আমাকে আরোও আশ্চর্য ও হতবাক করে দিয়ে বললেন - এই সিন্দুকটি তোমার!
আত্মকথা: গ্রাম থেকে গ্রামান্তর, শহর থেকে শহরান্তর এমনকি বেঁচে থাকার জন্য ডাল ভাতের প্রয়োজনে যুদ্ধ বিগ্রহ দেশে দেশান্তরেও! কিন্তু সিন্দুক আজোও পুরোনো বাড়িতেই আছে। সঙ্গত কারণে গ্রামে এখন দুটি বাড়ি যার নাম যথাক্রমে নতুন বাড়ি আর পুরান বাড়ি। আমি এই সিন্দুক পুরান বাড়ি থেকে নতুন বাড়িতে আনার সাহস করি না। এই সিন্দুকের মালিকানা আমার নয় দাদীজানের। এই সিন্দুকের জীবন শুরু হয়েছে আমার দাদীজানের হাতে পুরান বাড়িতে। আমি কে তাঁকে স্থানান্তর করার? এই সিন্দুকে লেগে আছে দাদীজানের হাতের ছোঁয়া। দাদীজানের শত সহস্র স্মৃতিমাখা আনন্দ দুঃখ ভালোবাসা আর মায়া মমতার গল্প। থাকুক সে তাঁর নিজ স্থানে নিজের মতো। থাকুক অনন্তকাল তাঁর মতো।
ছবি: দাদীজানের স্মৃতিময় সিন্দুক। স্যামসাং এস সেভেন।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: সামহোয়্যারইন ব্লগ। নির্বাচিত পোষ্টে “উক্ত লেখাটি” স্থান দেওয়াতে সামহোয়্যারইন ব্লগ কর্তৃপক্ষকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২১ রাত ১০:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


