আজ যত রাতই হোক পড়বই এই পণ নিয়ে বসেছি বেশ কিছু পাতা নিয়ে ( যে সব পাতায় কদিন শুধু চোখ বুলিয়ে গেছি, পড়া হয়নি ) বেশ রাত হয়ে গেছে, মন দিয়ে পড়ছি সঙ্গীতা, শ্রেয়া, কৌস্তুভ, জয়তী ও আরো সবার লেখা। শ্রেয়ার একটা চিঠি পড়ে এক পুরনো ঘটনা লিখেও ফেললাম, এমন সময়ে এসএমএস। নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে এক বন্ধুর বার্তা ।
পাশের ঘরে মেয়ে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে বন্ধুদের ফোন করার জন্যে, কিন্তু নেটওয়ার্ক জ্যাম, তাই সে বাধ্য হয়ে মন দিয়েছে পড়ার বইয়ে । বাইরে একের পর এক হাউই ছুটেছে আকাশের দিকে, সশব্দে। আলোয় আলোয় আলোকিত আকাশ, রাতের আকাশ।আবার এসএমএস, সায়ন্তন। সে একঝাঁক হাসিমুখ তারা পাঠিয়েছে আমার জানালার বাইরে , শুভেচ্ছাবার্তা দিয়ে ।
মেয়ের ফোন জ্যান্ত, বন্ধুরা সব শুভেচ্ছা বিনিময়ে ব্যাস্ত। মনে করার চেষ্টা করছিলাম আমার ছোটবেলার নতুন বছরের দিনের কথা,যা মনে পড়ছে সে সব পয়লা বৈশাখের স্মৃতি ।
একত্রিশে ডিসেম্বর কিংবা ফার্ষ্ট জানুয়ারি বলে আলাদা কিছু ছিল বলে এখন অন্তত কিছু মনে পড়ছেনা । হ্যাঁ। বাবার ব্যবসার সুত্রে তার বিদেশী ব্যবসায়ী বন্ধুদের কাছ থেকে কার্ড আসত আর আসত তাদের ক্যালেন্ডার। রঙ-বেরঙের ঝকঝকে, অপূর্ব সুন্দর সব ক্যালেন্ডার। বেশিরভাগই প্রাকৃতিক দৃশ্যের, কিছু কিছু থাকত মেয়েদের ছবি দেওয়া তাদের প্রোডাক্টের ছবি । নভেম্বর মাসেই সেসব কার্ড আর ক্যালেন্ডার এসে যেত, নতুন বছরে শুধু সেই ক্যালেন্ডার টাঙিয়ে দিতাম। কার্ডগুলো ও আমার দখলে আসত ।
ডিসেম্বরে বাত্সরিক পরীক্ষার পর স্কুল ছুটি থাকত ক'দিন, আর ছুটি মানেই দেশের বাড়িতে ঠাকুমা,দাদুর কাছে বেড়াতে যাওয়া । সেখানে ধোঁয়া ধোঁয়া শীত, উঠোনে কাটা ফসলের পাহাড়, সদ্য ঘরে ওঠা নতুন চালে সকালে চিতই, বিকেলে ভাপা পিঠে, আজ পুলি তো কাল ভর্তা-পিঠে ( শুটকির ভর্তা দিয়ে পিঠে) । পুকুরের হিম ঠান্ডা জলে ঠকঠক কাঁপুনি সহ স্নান, কাকিমার বকুনি, উঠোনের মিঠে রোদে বসে চুল শুকোতাম হাতভর্তি কুল নিয়ে । পাশের বাড়ির দাদী কে পটিয়ে তার গাছ থেকে পেড়ে আনা পাকা পাকা হলুদ হলুদ কুল। সন্ধ্যেবেলা খড়ের আগুনের পাশে গোল হয়ে বসে হাত সেঁকা আর কাজের বুয়া ( মাসি) দের কাছে গল্প শোনা, গফুর বাদশাহ আর বানেসা পরীর গল্প, কাঞ্চনমালার গল্প, রকমারি সব জ্বীনের গল্প, পরীদের গল্প, কাকে যেন জ্বীনে তুলে নিয়ে চলে গিয়েছিল সেই পরীস্থানে, সে কি করে ফিরে এলো, সেই গল্প। রাতে খাওয়ার পাট আমার ছিলনা, সন্ধ্যেবেলাতেই তো পিঠে খেয়ে রাতের খাওয়া হয়ে যেত, দাদীমা রাতের নামাজ , খাওয়া সেরে যখন ঘুমোতে আসতেন, আমি তখন লেপের তলায়, তার জন্যে অপেক্ষা করছি, সেই পরীদের দেশ থেকে ফিরে আসা মেয়েটির গল্প দাদীমাকে শোনাব বলে। রাতে কখখনো খোলা দরজা দিয়ে বাইরে তাকাতাম না, যদি জ্বীন কিংবা পরী দেখে ফেলি সেই ভয়ে। লেপের ভেতরে মুখ গুঁজে ঘুমোতাম, জ্বীন,পরী যদি ঘরে এসে ঢোকে, তাহলেও যেন দেখতে না হয়, কিন্তু একটা সান্ত্বনা ছিল, ওরা নাকি ঘরে ঢোকে না !
ডিসেম্বর আর জানুয়ারির হিসেব রাখতাম পরীক্ষা শেষ হলে দেশে যাব বলে ।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



